• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বর্জ্যজীবী নারী ও শিশুরা

পারভীন সুলতানা কাকন

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

বাংলাদেশে বর্জ্যসংগ্রহ অত্যন্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি পেশা। সারাদেশে প্রায় ৪ লাখ বর্জ্যজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই এক লাখের ওপর বর্জ্যজীবী এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৪ লাখ লোক তাদের জীবন জীবিকা টিকিয়ে রেখে চলেছে, যাদের মধ্যে কেউ রয়েছে বর্জ্য সংগ্রহের কাজে, কেউ বর্জ্য আলাদা করার কাজে আবার কেউ বা রয়েছে এসব বিক্রয় করার কাজে। যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু।

বর্জ্যজীবী সমাজে যাদের পরিচয় ময়লা কুড়ানি নামে। শহরের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে ময়লা কুড়ানিরা। যারা রাস্তা, ডাস্টবিন বা বর্জ্য ডাম্পসাইট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ ও তা বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদেরই একজন ত্রিশোর্ধ হালিমা। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় স্বামী তাকে তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে। তালাকের পূর্বে দুটি সন্তান জন্ম দেয় সে। কিন্তু সংসারের হাল ধরতে তাকে বেছে নিতে হয় নিকৃষ্ট এ কাজটি। ভোর থেকে সন্ধ্যা সারাদিন চলে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ। বর্জ্য বিক্রয় করেই চলে তার সংসার। কখনও খাবার জোটে দু’বেলা কখনও একবেলা।

তিন সন্তানের জননী চল্লিশোর্ধ্ব রোকসানা বেগম। স্বামী মাদকসেবী। সাত সদস্যের সংসারে উপার্জনক্ষম বলতে রোকসানা, বর্জ্য সংগ্রহকারী। দুই ছেলে এক মেয়েকেও এ কাজে লাগিয়ে চলছে তাদের সংসার। একটি বর্জ্যজীবী শিশু দিনে প্রায় ১শ’ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা উপার্জন করে থাকে।

হালিমা, রোকসানার মতো এমন অনেক বর্জ্যজীবীর গল্প রয়েছে যারা খেয়ে না খেয়ে কিছু উপার্জনের আশায় নিরন্তর ছুটছে বর্জ্য সংগ্রহের কাজে। কিন্তু তারা হয়ত একবারও ভেবে দেখছে না ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে তাদের ভাগ্যে। ডাম্পিংসাইটে ট্রাকে করে বর্জ্য ফেলার পর ক্ষতিকর বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, পঁচাবাসী, গৃহস্থালীর বর্জ্য, মানুষ ও পশুর মলমূত্র সব মিলিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। বর্জ্য সংগ্রহ করতে যারা ডাম্পিংসাইটে কাজ করে তারা জখম হচ্ছে বিভিন্নভাবে। ফেলে দেয়া দূষিত এসব পদার্থগুলো থেকে প্রায়শই আক্রান্ত হচ্ছে আমাশয়, ডায়রিয়া, ব্যাকটেরিয়াজনিত বিভিন্ন রোগ, হেপাটাইটিস ও চমর্রোগসহ বিভিন্ন রোগে।

ডাম্পিংসাইট থেকে ফেরার পর শিশুরা দীর্ঘক্ষণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে সেখানেই হাত না ধুয়ে সেরে নিচ্ছে তাদের দুপুরের খাবার। ফলে ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব ও মাথা ঘোরাসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রচন্ড দুর্গন্ধের মধ্যে কাজ করে তারা সব সময় ভুগছে গ্যাস্ট্রিকে। ফেলে দেয়া সুঁই, ব্লেড, সিরিঞ্জ দিয়ে প্রতিনিয়ত জখম হচ্ছে বর্জ্যজীবীরা। অনেক সময় তারা বর্জ্যবাহী ট্রাক ও লেভেলিং মেশিন বা বুলডোজার দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এতে অনেক শিশুর অঙ্গহানীর মতো ঘটনাও ঘটছে।

বর্জ্য সংগ্রহের সময় তারা সবসময়ই নুয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করে। এতে তারা মেরুদন্ড ও ঘাড়ের সমস্যায় ভোগে। পঁচা দুর্গন্ধের মধ্যে কাজ করায় বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরাসহ এক ধরনের অস্বস্তিতে ভোগে। ফলে একদিন কাজ করলে তিন দিন বিশ্রাম নিতে হয় তাদের। শুধু তাই নয়, খালি পায়ে কাজ করে বলে চর্মরোগ লেগেই থাকে এসব বর্জ্যজীবী মানুষের। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম এন হুদা বলেছেন, দীর্ঘক্ষণ বর্জ্য সংগ্রহের কাজে যারা সর্বদা নিয়োজিত থাকছে তারা সবসময়ই কোন না কোন চর্মরোগ, একজিমা, চুলকানি, ফুসকুড়ি, দাদ ও ফাঙ্গাস জাতীয় চর্মরোগে ভুগছে। তাই দেরি না করে এদের ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন এ বিশেষজ্ঞ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় দেড় লাখ দরিদ্র মানুষ ফেলে দেয়া বর্জ্যসামগ্রী পুনর্ব্যবহার করে থাকে যার মূল্য বছরে প্রায় এক হাজার ৭১ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক সংস্থা উইমেন ইন ইনফরমাল এমপ্লয়মেন্ট গ্লোবালাইজিং অ্যান্ড অর্গানাইজিং এর মতে, বর্জ্য সংগ্রহকারীরা জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবেশ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে থাকে। তবে তারা সর্বদাই নিম্নশ্রেণীর সামাজিক মর্যাদা লাভের পাশাপাশি নিম্নœমানের জীবনযাপন করে থাকে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য হচ্ছে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কল্যাণকর পরিস্থিতি, যা শুধু শারীরিক সুস্থতা বা অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা মানব উন্নয়ন সূচকের একটি অন্যতম মাপকাঠি। তাই প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুস্বাস্থ্যের সুযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও সবচেয়ে বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি-৩ বাস্তবায়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা বস্তি বা ফুটপাতে বসবাস করে, তারা স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত। এতে প্রতিনিয়তই বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে অনগ্রসর এ জনগোষ্ঠী। এ থেকে পরিত্রাণে কঠোর মনিটরিং এবং শিশুবান্ধব কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি।

বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘোষণা ও চুক্তিনামায় অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। এর মধ্যে রয়েছে সবার জন্য স্বাস্থ্য বিষয়ক আলমা আতা ঘোষণা, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, শিশু অধিকার সনদ। বাংলাদেশ এসব চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এছাড়াও বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়েও দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৬ তে বলা হয়েছে, শিশু শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং ১৮ বছরের নিচে সকল শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখতে ও যৌন নির্যাতন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০২১ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি বৃহৎ রূপকল্প। এই রূপকল্পের অধীনে জনগণ তথা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে দেশের খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে শতকরা ৮৫ ভাগ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিশ্চিত করা হবে। সেইসঙ্গে সংক্রামক রোগ নির্মূল করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা ও পয়ঃনিষ্কাষণ সুবিধা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক, বয়স্ক, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী জনগণের অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ এর অন্যতম মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্জ্যজীবীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের সংবিধান, স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ ও জাতীয় নগরস্বাস্থ্য কৌশল ২০১৪ এর আওতায় নগরের বর্জ্যজীবী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার অধিকার বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্জ্যব্যবস্থাপনা, বিশেষত কঠিনবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা এবং এ সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন জরুরি। বর্জ্যজীবীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবিকা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি আইনী কাঠামো প্রস্তুত করা দরকার। বাংলাদেশে পৃথকভাবে তিনটি পাত্রে পচনশীল অপচনশীল এবং পুনর্চক্রায়নযোগ্য এবং ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলার নিয়ম বাস্তবায়নে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

বর্জ্যজীবীদের জন্য শীঘ্রই সরকারের বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কমর্সূচি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তবেই নিশ্চিত হবে প্রাপ্তবয়স্ক বর্জ্যজীবী ও তাদের সন্তানদের মানবাধিকার, পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)