• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৩ সফর ১৪৪২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

ব্যাংকিং খাতের দৈন্যতা, মেরুদন্ডহীন অর্থনীতি

সাকিব আনোয়ার

| ঢাকা , শনিবার, ১৩ জুলাই ২০১৯

সাত বছর আগে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদমাধ্যম এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসে গেছে।’ মি. মুহিত আরও বলেছিলেন, ‘কালোটাকা থাকবেই। এটা মেনে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’ আজ ৭ বছর পর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আমরা সবাই জানি। কালোটাকার ব্যাপারে সরকারের অবস্থানও এ বাজেটে স্পষ্ট হয়েছে। দেশের অর্থমন্ত্রীর খেলাপি ঋণের ব্যাপারে এ রকম ঔদাসিন্য ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করেছে- বলাই বাহুল্য।

ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে, এমনকি বিশ্বেও অন্যতম শীর্ষে। সম্প্রতি সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ জন।

২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর থেকে অবলোপন করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ বাদেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোই অবলোপন করেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক অবলোপন করেছে ৮ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। অগ্রণী ব্যাংক অবলোপন করেছে ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংক করেছে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা এবং রূপালী অবলোপন করেছে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পেরে ১৯ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। এর বাইরে অন্যান্য ব্যাংক অবলোপন করেছে ২৯ হাজার ৮৭২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।

কিন্তু এটাও সঠিক অঙ্ক নয়। অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন একাডেমিক্যালি কাজ করছেন। তার হিসেব মতে অবলোপনকৃত ঋণ এবং আরও কিছু ঋণ যেগুলো আদৌ কখনও ফেরত পাওয়া যাবে না, সেগুলো হিসাব করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমপক্ষে তিন লাখ কোটি টাকা।

গত মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা যা ২০১৮ সাল শেষে ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। গত ১০ জানুয়ারি সব ব্যাংক মালিকের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘আজ থেকে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না।’ আর জানুয়ারি-মার্চ এ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ব্যাংকিং খাতের অবস্থার সঙ্গে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর চলমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে ব্যাংকিং খাত নিয়ে ভীতির সঞ্চার হওয়াই স্বাভাবিক।

দেশের প্রায় সব অর্থনীতিবিদ ব্যাংকের লুটপাটকে এই দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিছুদিন আগে ঋণখেলাপিদের জন্য মাত্র ২% ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুবিধা দেয়া হয়েছিল এবং সুদ ধার্য করা হয়েছিল মাত্র ৯ শতাংশ যা ১০ বছরে পরিশোধযোগ্য। অথচ ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার ১০ শতাংশের বেশি।

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য ২০১৫ সালে ঋণ পুনর্গঠনের নীতিমালা জারি করা হয়। যেসব শিল্প গ্রুপের ৫০০ কোটি টাকার ওপরে খেলাপিঋণ ছিল তাদের দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে এবং যেসব শিল্প গ্রুপের এক হাজার কোটি টাকার ওপরে খেলাপিঋণ ছিল তাদের এক শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়নের সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে শিল্পগুলোর লোকসান কাটিয়ে উঠবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রেখে আয় উপার্জনের মাধ্যমে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সুবিধা নিয়ে ওই সময় ১১টি শিল্পগ্রুপ ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। এর ফলে ওই সময় রাতারাতি খেলাপি ঋণ কমে যায়। কিন্তু পুনর্গঠনের সুবিধা নিয়ে এসব শিল্পগ্রুপ ঋণ নবায়ন করলেও পরে ওই সব খেলাপিঋণ যথাযথভাবে পরিশোধ করেনি। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক থাকা এবং পরপর তিন মেয়াদ অর্থাৎ ৯ বছর পদে থাকা ব্যাংকের বর্তমান বিপর্যয় তৈরি করার জন্য কাজ করেছে।

তিন মাস যদি কোন খেলাপি থাকে তাহলে তাকে খেলাপি ঋণ বলা হবে। এটিই বিশ্বের নিয়ম। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে তিন মাস নয়, ৯ মাস যদি খেলাপি থাকে তাহলে সেটা খেলাপি ঋণ হবে। এটার মাধ্যমে কিছুদিন পরে সরকার কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের অনুপাত কম দেখাতে পারবে।

খেলাপি ঋণ কম দেখাতে ব্যাংকগুলোতে ঋণ অবলোপনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের ঋণ অবলোপন ছিল ২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। গত ৫ বছরে জনতা ব্যাংকের ঋণ অবলোপন বেড়েছে ২ হাজার ২৭২ কোটি টাকা অর্থাৎ ১২০ শতাংশ। গত ৫ বছরে অগ্রণী ব্যাংক ঋণ অবলোপন করেছে ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। ২০১৩ সাল শেষে এই ব্যাংকটির জমানো ঋণ অবলোপন ছিল ৩ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ অবলোপনকৃত ঋণ বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ। ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংকের ঋণ অবলোপন ছিল ৩ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই সময়ে ব্যাংকটি ঋণ অবলোপন করেছে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা যা শতকরা হিসাবে ১৫৮ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেও খেলাপি ঋণকে কাগজে-কলমে কম দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং ২০১৮ সালে ২০ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়।

ব্যাংকের রেগুলেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্রমাগত নিষ্ক্রিয় করে ফেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ এবং বিএবি ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন নজিরবিহীনভাবে বিএবির সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ডেকে নিয়ে গিয়ে আড়াই শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স কমানো, এক শতাংশ সিআরআর কমানোসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের অনুমোদন নেয়া হয়। ব্যাংক মালিকরা নানা সুবিধা নেয়ার পর ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেয়া আর ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ায় অঙ্গীকার করেছিল যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এবং ভবিষ্যতেও না হওয়ারই আশঙ্কা, কিন্তু ব্যাংক মালিকরা সরকার ও জনগণকে ধোকা দিয়ে নিজেদের সুবিধা সবটুকু নিয়ে নিয়েছে।

আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংক একটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এটি এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান; যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে পুঁজি গড়ে তোলে এবং সেই পুঁজি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে বিনিয়োগে সাহায্য করে। দেশ-বিদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সচল ও কার্যকর রাখতে এর ভূমিকা অপরিসীম। ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়, লেনদেন ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি। অর্থনীতিতে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও আমাদের দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে ধুঁকছে।

চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে যখন সারা বিশ্বে এই হার নিম্নমুখী, যা ২০১৭ সালে ৩.৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ শেষে এ হার ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশে ঠেকেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী কিছু দেশের খেলাপি ঋণের হার নেপাল-১.৭%, ভিয়েতনাম-০.৯%, শ্রীলঙ্কা-৩.৪%, পাকিস্তান-৮.২%, ভারত-৯.৩%।

সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা সরাসরি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বেসিক ও জনতা ব্যাংক এক সময় সবচেয়ে ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে এখন দুটি ব্যাংকের অবস্থাই শোচনীয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মতে, এই তিন ব্যাংকের নাজুক অবস্থা পুরো ব্যাংক খাতের জন্যই উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, ‘এসব ব্যাংকে এক সময় সুশাসন ছিল। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদে বাজে লোকদের বসানোর কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়েছে।’ এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘একজন বাজে লোককে চেয়ারম্যান করার খেসারত দিচ্ছে বেসিক ব্যাংক। আর সুশাসন না থাকায় জনতা ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে।’

২০০৯ সালের আগে সরকারি খাতে ‘মডেল ব্যাংক’ মনে করা হতো বেসিক ব্যাংককে। এর খেলাপি ঋণ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এখন ভয়ানক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০০৯ সালে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে সরকার সমর্থক ব্যক্তিদের বসানোর পর থেকে দুর্নীতির শুরু। ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সহায়তায় ব্যাংকটি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৪ বছর পর পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়। সেই পদক্ষেপও কার্যকর হয়নি। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটিকে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে সরকার। এরপরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি সংকট কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে। খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকে একসময় সুশাসন ছিল। কিন্তু শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটাকে নষ্ট করা হলো। তিনি যখন ব্যাংকটিকে ধ্বংস করতে লাগলেন, তখনও যদি তাকে সরিয়ে দেয়া হতো, তাহলেও ব্যাংকটি বেঁচে যেত।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই বছর আগেও জনতার পরিস্থিতি বেশ ভালো ছিল। ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা যা বর্তমানে ২১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘ব্যাংকটির খেলাপি বেড়ে যাওয়ার পেছনে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলা বড় ভূমিকা রাখছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকার খেলাপিদেরই বেশি পছন্দ করে। খেলাপিদের মদত দেয়ার কারণেই খেলাপির পরিমাণ বেড়ে গেছে। যাদের কারণে খারাপ লোকজন ঋণ পেল, তাদের যদি শাস্তি হতো, তাহলে ব্যাংকটি এত খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তো না।’

খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য যখন দেশের সব অর্থনীতিবীদ বারবার তাগিদ দিচ্ছেন, তখন রাষ্ট্র যন্ত্র কি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে তা বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়। যে ব্যাংকটি সংকটে থাকা অন্য ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করত সেই ব্যাংকটি এখন নিজেই চরম সংকটে। ২০১৬ সালের পর থেকে এই সংকটের শুরু। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ এখন ইসলামী ব্যাংকে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ব্যাংকটিতে খেলাপি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গত মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের সবচেয়ে লাভজনক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকে ২০১৬ সালে মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হয়। সরকারের হস্তক্ষেপে ইসলামী ব্যাংকের কর্তৃত্ব চলে যায় এস আলম গ্রুপের হাতে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। পর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোস্তফা আনোয়ারকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে। পদত্যাগে বাধ্য করা হয় তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে। এরপর থেকে বিভিন্ন সূচকে অবনতি হতে থাকে ব্যাংকটির।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতির শুরু সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের আমলে। সে সময়ে বিদেশি দাতারা শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা নামের দুটি উন্নয়ন ব্যাংক সৃষ্টি করে এর মাধ্যমে ব্যক্তি খাত বিকাশের জন্য উদার ঋণদানের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিল। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন উভয় প্রকার ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অনেক বছর আগে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ অর্থনীতি সমিতির আমন্ত্রণে ঢাকা এসেছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যদি সুশাসন কায়েমে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি খাত উভয়ই ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাধান কী? তিনি অনেক ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এমন প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে।’ দুর্ভাগ্যের বিষয় ব্যাংকিং খাতের এই মহামারীর পরেও আমরা বিগত প্রায় তিন দশকে এমন কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। অনেক আলোচনার পরেও সরকার কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বা নিচ্ছে না সেই বিষয়টিও ভেবে দেখা জরুরি। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা সবাই জানি যে শীর্ষ খেলাপিরা প্রায় সবাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। এক্ষেত্রে সংকট সমাধানে সরকারের স্বদিচ্ছা কতখানি - তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে ৩০০ শীর্ষ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেছে। ৫ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ আছে এরকম আরও ১৪,৬১৭ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সরকার এ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আদায়কৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং আদায় কৃতদের তালিকা ভবিষ্যতে প্রকাশ করবে বলে আমরা আশা করি। অতি শিগগিরই ব্যাংক কমিশনকে তাদের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং তাদের/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আইনের সংশোধনীও দরকার। লোন প্রদানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদন্ডসমূহ মেনে চলা উচিত। আর সবচেয়ে বেশি জরুরি বিষয়টি হচ্ছে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে রাখা।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকিং খাতকে আগে বাঁচাতে হবে। নতুবা দেশের অর্থনীতি মেরুদন্ডহীন পড়বে।

mnsaqeeb@gmail.com