• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭, ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ ‘মাস্টার থেকে মহানায়ক’

ইসমাইল মাহমুদ

| ঢাকা , বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯

image

১৯৫৩ সালের কথা। পরিচালক নির্মল দে’র বাংলা ছবি ‘সাড়ে ৭৪’ মুক্তি পেল। মুক্তির পর কমেডি ধাঁচের এ ছবিটি নিয়ে সবার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস। তৎকালীন সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নামি-দামি সব তারকার মেলা ছবিটিতে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় নতুন এক জুটি। ছবিপ্রেমিরা তুলসী চক্রবর্তী আর মলিনা দেবীতে মজে যান। তাদের দাবি ছবিটিতে হিরো-হিরোইন তো তুলসী-মলিনা জুটি। মুক্তিপ্রাপ্ত সাড়ে ৭৪ ভারতীয় চলচ্চিত্রের বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিল। সুপার-ডুপার হিট ছবিটি ব্যবসার শীর্ষে টানা আট সপ্তাহ। সাদা-কালো ‘সাড়ে ৭৪’-এর মাধ্যমে নতুন জুটির যে ইনিংস শুরু হয়েছিল তাতেই হল বাংলা ছবির এক রঙিন ইতিহাস। তুলসী চরিত্রে অভিনয় করে উত্তম কুমার পেলেন অবিশ্বাস্য সাফল্য। এরপরের গল্প আরও সমৃদ্ধ। এক সময় উত্তম কুমার নায়ক থেকে হয়ে গেলেন মহানায়ক। অনাবিল হাসি, অকৃত্রিম চাহনি আর অভিনয়গুণে উত্তম আজও বাঙালির চেতনায় জীবন্ত এক নাম।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তার জন্ম। জন্মের পর পরিবার তার নাম দেয় অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়। মা চপলা দেবী। তাদের ছিল অভাব-অনটনের সংসার। গিরিশ মুখোপাধ্যায় রোডের একটিমাত্র ঘরে তাদের পরিবারের বসবাস। বাবা ছিলেন সামান্য বেতনের শ্রমজীবী। বাবার সামান্য বেতনে সংসার চলছে না। উপায় না দেখে উপার্জনে নেমে পড়লেন বাড়ির বড় ছেলে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি গান শিখতেন। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শুরু করলেন গানের শিক্ষকতা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান শেখাতেন তিনি। অল্পদিনেই কলকাতার নামকরা গানের শিক্ষক হয়ে ওঠেন অরুণ। এক সময় গাঙ্গুলি বাড়ির মেয়ে গৌরী দেবীকে গান শেখানের কাজের প্রস্তাব পেলেন। যেখানে একজন শিক্ষার্থীকে গান শিখিয়ে অরুণ মাসে বেতন পেতেন ২০-২৫ টাকা, সেখানে গৌরী দেবীকে গান শেখানের বিনিময়ে বেতন পান মাসে ৭৫ টাকা। পারিবারিকভাবে তার পরিবারের সঙ্গে গাঙ্গুলি বাড়ির চেনাজানা অনেক আগের। তবে গানের শিক্ষকতা করতে এসে এক সময় হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যান অরুণ আর গৌরী। তাদের প্রেম পরিণয় লাভ করে ১৯৫০ সালের ১ জুন। এদিন অরুণের স্ত্রীরূপে তার ঘরে এলেন গৌরী দেবী।

ছোটবেলা থেকেই অরুণ ছিলেন প্রচন্ড থিয়েটার অনুরাগী। গানের শিক্ষকতার পাশাপাশি রূপালী পর্দার ঝোঁক তার ক্রমেই বেড়ে চলল। এক সময় ‘মায়াডোর’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেলেন অরুণ। ১৯৪৭ সালে এ ছবিতে এক্সট্রা চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি সম্মানী পেলেন দৈনিক মাত্র পাঁচ সিকি। কিন্তু তার প্রথম অভিনীত ছবি ‘মায়াডোর’ মুক্তি পেল না। ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে নায়ক অসিতবরণের বাল্যকালের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলেন অরুণ। কিন্তু তিনি দর্শকদের মনে স্থান করে নিতে পারেননি। ১৯৪৯ সালে মুক্তি পেল তার অভিনীত ছবি ‘কামনা’। এ ছবিটিও সুপার ফ্লপ। তারপরের দুই ছবি ‘মর্যাদা’ ও ‘ওরে যাত্রী’ ছবিও সুপার-ডুপার ফ্লপ। বাংলা ছবিতে কোন চরিত্রেই তিনি আসন করে নিতে পারবেন না এমন মন্তব্য পরিচালক-প্রযোজকদের। একের পর এক ছবি সুপার ফ্লপ হওয়ায় পরিচালকরা তাকে নিয়ে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করলেন। অরুণের হাতে তখনও ‘সহযাত্রী’ ও ‘নষ্টনীড়’ নামের দুটি ছবি। এ দুটি ছবিতে তিনি মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করলেন। কিন্তু এগুলোর ফলও আগের তিনটির মতোই। দর্শকদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠলেন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বা ‘এফএমজি’ বলে। নামটা রটে গেলে সিনেমাপাড়ায়। খবরের পাতায় এফএমজি নিয়ে খবরও ছাপা হলো। অসফলতার ধারাবাহিকতা চলছিলই। এর মধ্যে সরোজ মুখোপাধ্যায় ফ্লপ মাস্টার জেনারেলের প্রতি আস্থা রাখলেন। তিনি তাঁর ছবি ‘মর্যাদা’-তে নায়ক বানালেন অরুণকে। তবে পরিচালক অরুণকে দিলেন এক শর্ত। তা হলো তার নাম পরিবর্তন করে অরূপ কুমার করতে হবে। করা হলোও তাই। কিন্তু এতেও কাজ হলো না। পরবর্তীতে সরোজ মুখোপাধ্যায় আবারও বাজি ধরলেন অরুণকে (অরূপ) নিয়ে। তিনি ফ্লপ মাস্টারকে নিলেন তারই ‘সহযাত্রী’ ছবিতে। এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অরূপ বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যালের সঙ্গে। শুটিংয়ের ফাঁকে এক আড্ডায় পাহাড়ি সান্যাল হঠাৎ বলে বসলেন- ‘তুমি অরুণ বা অরূপ নও হে, তুমি যে উত্তম, উত্তম কুমার।’ তার পরামর্শে নাম পাল্টে হয়ে গেলেন উত্তম কুমার। নাম বদলের প্রথম ছবি ‘সহযাত্রী’-তে তার ললাটে সাফল্য ধরা দিল না। ১৯৫১ সালে ‘সঞ্জীবনী’ ছবিটিও ফ্লপ হল। ‘বসু পরিবার’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় নয়, ছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। ছবিটি বেশ ভালো চলল। অভিনয়ের জন্য এই প্রথমবারের মতো সর্বত্র প্রশংসিত হলেন উত্তম কুমার।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয়ের আগপর্যন্ত উত্তম ছয় বছরে মোট নয়টি ছবিতে অভিনয় করেন। একেক ছবিতে একেক নায়িকার সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি অভিনয় করেন। এই ৯ নায়িকা হলেনÑ মায়া মুখোপাধ্যায়, ছবি রায়, মনীষা দেবী, করবী গুপ্ত, ভারতী দেবী, সনিন্দা দেবী, সন্ধ্যা রানী, মঞ্জু দে ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। এই ৯ নায়িকার মধ্যে আটজনই ছিলেন বয়সের দিক থেকে উত্তমের চেয়ে বড়। ছোট ছিলেন একমাত্র সাবিত্রী। আটজনকেই উত্তম সম্বোধন করতেন ‘দিদি’ বলে। সে সময়ে অনেকেই ধারণা করেন বয়সে বড় নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয় করায় উত্তমের শুরুর কেরিয়ার সুপার ফ্লপ হয়েছিল। একের পর এক ছবি ফ্লপ হলেও দমে যাননি উত্তম কুমার। নিজেকে নিয়ে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সহযোগিতা পেয়েছেন পরিচালকদের। ছবি ফ্লপ করার পরও তার ওপর আস্থা হারাননি পরিচালক-প্রযোজকরা। তাকে সুযোগ দিয়েই গেছেন। ১৯৫৩ সালে তার অভিনীত ‘সাড়ে ৭৪’ সুপার-ডুপার হিট হওয়ার পর উত্তমকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ১৯৫৪ সালে পরিচালকরা ধর্ণা দিতে থাকেন তার বাড়িতে। এ বছর মোট ১৪টি ছবি মুক্তি পায় তার। এর মধ্যে ৭টি ছবিতেই তার নায়িকা সুচিত্রা। ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা উত্তম কুমার তার জীবদ্দশায় ৩৩ বছরে অভিনয় করেন বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ’ ছবিতে। তার প্রথম ছবিতে নায়িকা ছিলেন মায়া মুখোপাধ্যায়, আর সর্বশেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে নায়িকা মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। প্রায় আড়াইশ’ ছবিতে তার বিপরীতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন সর্বমোট ৪৬ জন। তবে ১৯৫৩ সালে ‘ওরা থাকে ওধারে’ ছবিতে তাঁর বিপরীতে প্রথম নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা। এরপর উত্তম-সুচিত্রা জুটি পাকাপাকিভাবে দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেয়। এ জুটি এখনও বাংলা ছবির কীংবদন্তিতুল্য। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি উত্তম-সুচিত্রা জুটির মোট ৩১টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। এ জুটির সর্বশেষ ছবি ‘প্রিয় বান্ধবী’। রূপালি পর্দার বাইরে তাদের সম্পর্ক কি শুধু পেশাগত নাকি বন্ধুত্বের নাকি অন্যকিছু- তা এখনও রহস্যাবৃত। সুচিত্রা সেনের জীবনের শেষ ছবি হতে পারত উত্তমের সঙ্গে; এমনকি উত্তমেরও শেষ ছবি হতে পারত সুচিত্রার সঙ্গে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এ জুটির জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাবস্থায় ১৯৬২ সালের পর থেকে তারা একসঙ্গে ছবি করা কমিয়ে দেন। তখন তাদের মধ্যে মান-অভিমানের পালা চলছিল তা নিশ্চিত। একপর্যায়ে সুচিত্রা সিনেমার জগৎ ছেড়ে চলে গেলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, তাও এক চিরকালীন রহস্য। অপরদিকে ১৯৬৩ সালে উত্তম গৌরী দেবীকে ছেড়ে দিয়ে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই অর্থাৎ মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে।

[লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক]

ismail.press2019@gmail.com