• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১ কার্তিক ১৪২৫, ৫ সফর ১৪৪০

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন

সতীর্থ রহমান

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

image

১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস- একথা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’ এর খবর আমরা অনেকেই জানি না। সুন্দরবনকে ভালোবাসেন এমন ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে বেসরকারিভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে। উপকূলীয় ৫টি জেলা ছাড়া রাজধানী ঢাকায়ও এ দিবসটি সগৌরবে পালিত হচ্ছে।

আভিধানিক অর্থে ‘বন’ হলো অরণ্য; জঙ্গল; কানন; কুঞ্জ; গহন; বিপিন। আমাদের জীবন অচল হয়ে পড়ত যদি গাছ না থাকত পৃথিবীর বুকে। বৃক্ষহীন এ পৃথিবী হতো ঊষর, ধূসর, নি®প্রাণ। পৃথিবীর বিশাল মরুময় প্রান্তরকে আর্দ্রতা ও সজীবতা দিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে অরণ্য ও গাছপালা। বৃক্ষই এই পৃথিবীকে সবুজে-শ্যামলে, ফুলে-ফলে অপরূপা বসুন্ধরায় পরিণত করেছে। যেখানে গাছপালা থাকে না সেখানে মরুভূমি হয়, আর মরুভভূমিতে জীবন থাকে না। প্রাকৃতিক উপায়ে আপনা হতে যখন ছোট বড় বৃক্ষলতা ও গাছপালা জন্মে বিস্তীর্ণ এলাকাকে আচ্ছাদিত করে ফেলে তখন সে বিস্তীর্ণ এলাকাকে আমরা বনভূমি বলি। যেমন সুন্দরবন। এই বনভূমি প্রকৃতির দান। অবশ্য প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে ওঠা বনভূমি ছাড়াও মানুষের প্রচেষ্টায় বিস্তৃত এলাকায় বৃক্ষ আচ্ছাদন গড়ে উঠতে দেখা যায়। এগুলোকে কৃত্রিম বন বা বাগান বলে। যেমন কক্সবাজারের রামুর রবার বন বা বাগান। বনভূমি হতে প্রাপ্ত সম্পদকে বনজ সম্পদ বলে। তাছাড়া বনভূমিতে বৃক্ষলতা ছাড়াও নানা জাতের কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখি বাস করে। বনে বৃক্ষলতা, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি মিলে বনজ পরিবেশ গড়ে উঠে। বাংলাদেশের বনভূমি হতে কাঠ, বাঁশ, বেত, ফলমূল, মধু, মোম ইত্যাদি পাওয়া যায়। বাগান মানে উদ্যান; যেখানে ফুল- ফলাদি উৎপন্ন হয়; উপবন। বাগান সম্পর্কে প-িত ব্যক্তিদের অমৃত বচন:১. শক্তিমান খোদা সর্বপ্রথম একটি বাগান স্থাপন করেন। আর বস্তুতপক্ষে বাগানই হচ্ছে মানবিক আনন্দের সবচেয়ে পবিত্র উৎস-বেকন। ২. খোদাকে খোঁজার সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে বাগানের মধ্যে তাকে খোঁজা, তুমি সেখানে তার জন্য মাটি খুঁড়ে তাকে খুঁজতে পার- জর্জ বার্নার্ড শ। ৩. যে বাগান ভালোবাসে, সে গৃহের সজীবতাকেও ভালোবাসেÑ কুপার।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পদও বটে। সুন্দরবন একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশীদার হতে পারায় গর্ববোধ করি। সুন্দরবনকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। এর পেছনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। রহস্যময় ও Interesting এই সুন্দরবন। বিরাট এলাকাজুড়ে আছে এ বন। এর আয়তন প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবন প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে। জোয়ার ভাটা না হলে সুন্দরবন বাঁচবে না। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার তিনদিন আগে ও পরে জোয়ার ভাটার পানি আসে। স্থানীয় ভাষায় একে বলে জুগার পানি। সুন্দরবনের গাছপালা মাতৃগর্ভে অঙ্কুরোদগম হয়। সুন্দরবনকে ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ বা লবণাক্ত জলাভূমির বনও বলা হয়। আমাদের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি রক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীর একক বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনের গুরুত্ব অপরিসীম। ম্যানগ্রোভ হলো একটি বিশেষ ধরনের বন। এ বন সৃষ্টি হয় নোনা ও মিঠা পানির মিলিত প্রবাহের এলাকায়। তবে সে পানির মাত্রা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকলেই এমন বন গড়ে উঠতে পারে। সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর। এ বনের গহিন নির্জন অরণ্যের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে সুন্দরী ও গোলপাতা গাছের সারি। সুন্দরী গোলপাতা ছাড়াও রয়েছে গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গরান ও আমুড় ইত্যাদি গাছ।

সুন্দরবনের মধু বিখ্যাত। বিভিন্ন ফুলের মৌসুমে বিভিন্ন মধু পাওয়া যায় সুন্দরবনে। যারা মধু সংগ্রহ করে তাদেরকে বলে মৌয়াল বা মৌয়ালি। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এরা দলবদ্ধ হয়ে নৌকায় করে জঙ্গলে যায়, মৌচাক ভেঙ্গে মধু সংগ্রহ করে। মধুর সন্ধান এক মজার ব্যাপার। মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু আহরণ করে কোন দিকে উড়ে যায় মৌয়ালিরা তা ভালো করে লক্ষ্য করে। এতে করে তারা মৌচাকের খোঁজ পায়। তবে এভাবে মধুর নেশায় মৌমাছির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় মৌয়ালিদের বাঘের পেটে যেতে হয়। সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে নানারকম পশুপাখি ও জীবজন্তু বসবাস করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, বন্যশুকর, সজারুসহ প্রায় ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এছাড়া নানারকম পাখি এ বনে বসবাস করে। এদের মধ্যে টিয়ে, ময়না, শালিক, শ্যামা, দোয়েল, ঘুঘু, বক, সারস, বুনোহাঁস ও বনমোরগ উল্লেখযোগ্য। পশু-পাখি ছাড়াও সুন্দরবনে জলে ও জঙ্গলে মিলে একশ কুড়ি প্রজাতির মাছ ও ৩৪ রকমের সরীসৃপ রয়েছে। মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য টেংরা, টোনা, পোয়া, টাটকিনি, বাঁশপাতা, লাটিয়া, ছুরি, লাক্কা প্রভৃতি। সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে রয়েছে কুমির, হাঙ্গর, সাপ, ব্যাঙ, গুইসাপ প্রভৃতি। এদের মধ্যে হাঙ্গর, কুমির ও সাপ খুবই হিংস্র। সুযোগ পেলেই এরা মানুষের ক্ষতি করে। তবে এগুলো আমাদের সম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এরা সহায়ক। এদের যখন-তখন মেরে ফেলা ঠিক নয়। বরং এরা যাতে নির্বিঘেœ বংশবিস্তার করতে পারে সে ব্যাপারে সকলের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। শীতে অসংখ্য অতিথি পাখির সমাগম হয় সুন্দরবনে। কারণ অবাধ বংশ বিস্তার ও নিরাপত্তার জন্য বনের নির্দিষ্ট এলাকা বন্য পশুপাখির নিরাপদ স্থান, যাকে ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পশুপাখি স্বাচ্ছন্দ্যে এ এলাকায় চলাফেরা করতে পারে। সুন্দরবন শুধু বনই নয়। এখানে রয়েছে অফুরন্ত বনজ ও প্রাণিজ সম্পদ। হাজার হাজার মানুষ বাঁচে এ সম্পদের ওপর নির্ভর করে। সম্পদে, প্রাচুর্যে ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ সুন্দরবন। এ বন আমাদের গৌরব।

এক সময় সুন্দরী ও পশুর গাছে সুন্দরবন ভরপুর ছিল। কিছুকাল আগে একবার দেখা দিয়েছিল সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ। সুন্দরবনে বাঘ ও সাপের আক্রমণ লেগে আছে। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার লোকদের চলতে হয়। সুন্দরবন উজাড় হচ্ছে, না চুরি হচ্ছে। মানুষ যত বাড়ছে, চাহিদাও তত বাড়ছে। মানুষের অভাব ও কর্মসংস্থানের জন্য সুন্দরবন চুরি হচ্ছে। ২০০৬ সালের তথ্যমতে, ৫০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে চলছে সুন্দরবন। এখানকার কিছু অসাধু বনকর্তা এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল বন ধ্বংসের জন্য দায়ী। ভূমিদস্যু ও জলদস্যুরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কাঠচোর ও চোরা শিকারিদের তৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সুন্দরবনের স্বার্থবিরোধী কাজ যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা দেখবেন বন বিভাগ। সুন্দরবন ধ্বংস হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। সুন্দরবনকে সুরক্ষার জন্য সৎ ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ করতে হবে। ব্যাপকহারে গণসচেতনতা বাড়ালে সুন্দরবন রক্ষা করা যাবে। এজন্য রেডিও, টিভি, সংবাদপত্রসহ র‌্যালি, আলোচনা সভা, নাটিকা ও জীবন্তিকা প্রচার করতে হবে। সুন্দরবন দিবসের এই প্রচেষ্টাকে সফল করার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ঘনীভূত করতে হবে।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস সমৃদ্ধ হোক। সুন্দরবনের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি হোক। সুন্দরবনকে ভালোবাসুন। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে আমাদের ভালোবাসার বিষয় হোক সুন্দরবন। সুন্দর মন ও বনের সৌন্দর্য দেখে কাটুক প্রতিদিন।