• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, ৭ রবিউল সানি ১৪৪০

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের উন্নয়ন

সংবাদ :
  • মো. আবদুর রহমান

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশ প্রধানত পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীবাহিত পলিমাটি দ্বারা গঠিত পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। দ্রুত বর্ধনশীল এ ব-দ্বীপ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীশাসিত এ দেশের ভূমিরূপ, ভৌগোলিক অবস্থান, পানিসম্পদ, ভূ-প্রতিবেশ প্রভৃতি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নদী ও তার প্লাবন ভূমি এ দেশের ৮০ শতাংশ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা দিনকে দিন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কারণে উন্নয়নমূলক কর্মকা- বাস্তবায়ন, পানির গুণগতমান ধরে রাখা এবং নগরে জলাবদ্ধতা নিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে; যা টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। স্থিতাবস্থা পরিস্থিতিতে ২০৫০ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ দেশেটির অতিরিক্ত ১৪ শতাংশ এলাকা প্রবল বন্যায় প্লাবিত হবে এবং উপকূলীয় জেলায় ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ স্থানচ্যুত হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকার ১০০ বছর মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এটি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বা ডেল্টা প্লান-২১০০ নামে পরিচিত। এ পরিকল্পনার আওতায় বন্যা, নদীভাঙন, নদীশাসন ও ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সমস্যা মোকাবেলায় ৯টি নদী, খাল ও জলাধার ব্যবস্থাপনায় পলি অপসারণসহ নদী ড্রেজিংয়ে ৬টি, পাহাড়ি এলাকায় ৫টি এবং মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় ১২টি প্রকল্প, কম দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় ১৫টি প্রকল্পসহ বিরাজমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রথম পর্যায়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছয়টি এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এগুলো হলোÑ ১) উপকূলীয় অঞ্চল, ২) বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, ৩) হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা, ৪) পার্বত্য চট্টগ্রাম, ৫) নদীবিধৌত অঞ্চল ও ৬) নগর এলাকা। পানি, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির টেকসই ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং চরম দারিদ্র্য দূরীকরণসহ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকৃতির আচরণের ফলে পানি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়, যা প্রায়ই অনুমান করা সম্ভব হয় না। এজন্য একটি সুস্পষ্ট রূপকল্প এবং কতিপয় সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনাতে প্রাথমিকভাবে একুশ শতকের শেষের দিকে বাংলাদেশ ব-দ্বীপের সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তারিত রূপকল্প প্রণয়নের চেষ্টা নেয়া হয়েছে

নেদারল্যান্ডসের ডেল্টা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সহায়তায় পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এটি প্রণয়ন করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক পরিকল্পনা। পৃথিবীর কোথাও এত দীর্ঘ পরিকল্পনা হয়নি। বাংলাদেশে এটিই প্রথম। পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় পানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা হবে। এছাড়া হট স্পটে যেসব ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো মোকাবেলা করা হবে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং পরবর্তীতে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করা হবে। ফলে নতুন ভূমি পাওয়া যাবে। নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে নদী ভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জানা যায়, ব-দ্বীপ পরিকল্পনার আওতায় প্রথম পর্যায়ে ২০১৮-২০৩০ সাল পর্যন্ত মোট ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এ অর্থ সরকারি, বেসরকারি, উন্নয়ন সহযোগী এবং জলবায়ু তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট খরচের ৮০ শতাংশের জোগান আসবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। বাস্তবায়ন ব্যয় মেটাতে গঠন করা হবে একটি ডেল্টা তহবিল। এর পাশাপাশি ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা নলেজ ব্যাংক।

দেশের পানি সম্পদ নিয়ে ১০০ বছর মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে সহায়তা করেছে নেদারল্যান্ডস। এ পরিকল্পনায় পানি সম্পদ, ভূমি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভূ-প্রতিবেশ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব-দ্বীপ ভূমিতে প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার প্রচেষ্টা রয়েছে পরিকল্পনায়। এতে সমন্বিত নীতি উন্নয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় ২০১৮ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে ২৩টি প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ করা হবে ৮৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। বরেন্দ্র এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৯টি প্রকল্পের আওতায় বিনিয়োগ হবে ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৬টি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য ৮টি প্রকল্পের অনুকূলে ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। নদী এবং মোহনা অঞ্চলে ৭টি প্রকল্পের অনুকূলে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা এবং নগরাঞ্চলের জন্য ১২টি প্রকল্পের অনুকূলে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বস্তুত ব-দ্বীপ পরিকল্পনা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ও সামষ্টিক পরিকল্পনা, যা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকৃতির আচরণের ফলে পানি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়, যা প্রায়ই অনুমান করা সম্ভব হয় না। এজন্য একটি সুস্পষ্ট রূপকল্প এবং কতিপয় সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনাতে প্রাথমিকভাবে একুশ শতকের শেষের দিকে বাংলাদেশ ব-দ্বীপের সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তারিত রূপকল্প প্রণয়নের চেষ্টা নেয়া হয়েছে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাপরিকল্পনা, যা সমন্বিত, সার্বজনীন ও বাস্তবতার নিরিখে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। দেশের স্থিতিশীল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি হবে ভবিষ্যতের কার্যকরি দীর্ঘমেয়াদি গাইড লাইন। জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়নের সতেরোটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হলে ব-দ্বীপ পরিকল্পনার উদ্যোগ সফলভাবে পরিচালিত করা একান্ত আবশ্যক।

[লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা]