• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭, ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বই পড়া ভারি মজা

জাকির হোসেন তপন

| ঢাকা , সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২০

কোন ক্লাসে পড়ি ঠিক মনে নেই, হয়তো ফোর বা ফাইভ। ছোট খালা একটি বই কিনে দিয়েছিলেন- ‘বই পড়া ভারি মজা’। ছোট ছোট প্রবন্ধের সংকলন, লেখকের নাম শামসুল হক। এটা আমার বাবার নামও বটে! তখনো বই পড়ার নেশা ধরেনি। বাসার আলমারিতে বইটা রাখা ছিল অনেক দিন। পড়ে শেষ করেছিলাম কবে মনে নেই। প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীনই কালচারাল অনুষ্ঠানের পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলাম ‘হাসু’, জসীম উদদীনের ছড়া বা কবিতার বই। সে সময়টাতে ৪-৫ বছরের মধ্যে আমাদের তিন ভাই বোনের পুরস্কারের বইয়ে আলমারির একটা তাক ভরে গিয়েছিল। কী দারুণ স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা সব বই! লেখক ছিলেন মোহাম্মদ নাসির আলী, আবদুল্লাহ আল মুতী, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, রিজিয়া রহমান, হাবিবুর রহমান, আতোয়ার রহমান, আবদার রশীদ, এখলাস উদ্দিন আহমেদ।

তারপরে এলো হুমায়ূন আহমেদের যুগ! হুমায়ূনে ভাসলাম অনেক দিন। ওই সময়ের মধ্যে তার লেখা সব বইই পড়েছি। মূলধারার পাশাপাশি একটু ভিন্নভাবে কার্যক্রম চলে সেবা প্রকাশনীর। ছোটরা সেদিকে বেশি একটা চোখ দিতাম না। মাসুদ রানা, কুয়াশা এসবের একটা বদনাম ছিল। যদিও আমাদের অনেক বন্ধুই সেসময় মাসুদ রানার নেশায় বুঁদ। আমার ভালো লাগত শিশু একাডেমি প্রকাশিত বইগুলো, এসব বইয়ের ইলাস্ট্রেশন, কভার, ছাপা ছিল দারুণ সুন্দর! শিশু একাডেমির কয়েকটি বই এখনো মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করে- কাছের মানুষ আপনজন, ম্যাকগ্র সাহেবের ব্যাঘ্র শিকার, আবুদের অ্যাডভেঞ্চার। এখন আর শিশু একাডেমি এমন শিশুতোষ আর চিত্তাকর্ষক সাহিত্য মূল্য সম্পন্ন বই বের করে কিনা জানি না। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে আমি প্রথম তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ি। জুল ভার্ন-এর বইগুলোর বাংলা সেবা প্রকাশনীর মতো এত ভালো আর কেউ করেছিল কিনা জানি না। শামসুদ্দিন নওয়াব (কাজী আনোয়ার হোসেনের ছদ্মনাম) অনুদিত ‘নোঙর ছেঁড়া’ পড়ে মনে মনে কতদিন সেই জনমানবহীন দ্বীপে বাস করা শুরু করেছি, যেখানে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে, বনের গাছ থেকে ফল পেড়ে খেতে হয়। এরিক মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট অনুবাদ করেছিলেন জাহিদ হাসান, কী যে ঝরঝরে আর সাবলীল লেখা। ভয়াল মহাযুদ্ধের বীভৎস কদর্য রূপের কিয়দংশ জেনে অবশ হয়ে ছিলাম অনেকদিন! এলো রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা সিরিজ... একরাশ মুগ্ধতা আর স্বপ্ন নিয়ে পড়তাম, রবিন-মুসাদের নানা অ্যাডভেঞ্চার। আরও ছিল রহস্য পত্রিকা।

পাড়া-মহল্লায় লাইব্রেরি ছিল যেখান থেকে বই ভাড়ায় এনে পড়া যেত। আমাদের এলাকায় যে লাইব্রেরিটি ছিল সেখানে বেশিরভাগ সেবা প্রকাশনীর বইই ছিল। এক সময় আমার বন্ধু আজিম আর আমার ওই লাইব্রেরির সব বই পড়া শেষ হয়ে গেল! আমাদের তো আর সময় কাটে না। পড়ার মতো বই কোথায় পাই! বই ধার নেয়া তো ছিল খুবই কমন ব্যাপার। কে কোন বইটি নতুন কিনল, খবর পেলেই হলো। তখন মুক্তধারাই ছিল সবচেয়ে বড় আর দায়িত্বশীল প্রকাশক। পুরস্কার পাওয়া কিছু প্রবন্ধের বই আলমারিতে সযত্নে তোলা থাকলেও পড়া শেষ করেছিলাম অনেক পরে। ডা. লুৎফর রহমান, আহমদ ছফা, ইব্রাহীম খাঁ, জাফর ইকবালসহ আরও বেশ কয়েকজন লেখকের বই।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন পড়েছি- পূর্ব পশ্চিম, সেই সময়, পার্থিব, মানব জমিন, ফুড কনফারেন্স, কালবেলা, উত্তরাধিকার, কালপুরুষ, যাও পাখি, ক্রীতদাসের হাসি, দূরবীন, এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া, ন হন্যতে, নারী, এপার বাংলা ওপার বাংলা, কেরী সাহেবের মুনশী, শ্রীকান্ত, বঙ্কিম রচনাবলী, ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট, বেশ মোটাসোটা সব বই... এছাড়া বিভূতিভূষণ, রবীন্দ্রনাথের কিছু, মানিকের কিছু, বনফুলের কিছু, নজরুল, সুকান্ত তো ছিলই। বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে ফেরিওয়ালা হাতের উপর বই সাজিয়ে বিক্রি করত। সেখানে থাকত নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, জরাসন্ধ, ডেল কার্নেগী, যাযাবর, শরৎ চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ। এসব বইয়ে অনেক মুদ্রণ প্রমাদ থাকত অসংখ্য। বাঁধাইয়ে গণ্ডগোল, আর কিছু পৃষ্ঠা থাকত অনুপস্থিত! তবুও এই বইয়ের পাঠক ছিল, কাটতি ছিল। এভাবে ক্রমে পছন্দের লেখকদের তালিকায় অনেক নাম যুক্ত হল। বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক কিছু বইয়ের নাম নানা সূত্র থেকে জেনে নিয়ে পড়ার চেষ্টা ছিল। এভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্?, আবুল ফজল, বেগম রোকেয়া, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ লেখকদের কিছু লেখার সঙ্গে পরিচয়। খুব ভালো করেই মনে আছে হুমায়ূন আজাদের ‘নারী’ পড়ে অদ্ভুতভাবে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম বেশ কিছুদিন। একজন পুরুষ কিভাবে এত ভেতর থেকে নারীকে দেখতে পান, ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়েছি। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি পড়া শেষেও অদ্ভুত আচ্ছন্ন হওয়ার অনুভূতি হয়েছিল।

ভালো বই, সুন্দর বই দেখলে কিনতে ইচ্ছে করে, অনেক সময় কিনেও ফেলি, তবে শেষ হয়না। কোনটার ৫% কোনটার ২০% পড়ার পরে অনেক বই অপেক্ষায় আছে বইয়ের তাকে। একটা সময় অনেক বই কিনলাম সংগীত বিষয়ক-রবি শংকরের রাগ অনুরাগ, মান্না দের জীবনের জলসাঘর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু, আব্বাস উদ্দীনের দিনলিপি, রেবা মুহুরির ঠুমরী ও বাইজী ইত্যাদি। একপর্যায়ে এসে বই পড়া কমে এলো। আগে বই ছিল ঘুমের মহৌষধ, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়া। স্মার্ট ফোন আসক্তি মানুষকে কী দিল আর কত কী নিল কে জানে! অনেকের জীবন থেকেই স্বাস্থ্যকর ঘুম যে কেড়েছে তা নিশ্চিত। ধৈর্য কেড়ে নিয়েছে তা ও সত্যি। বড় মোটা বই মুগ্ধতায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার কথা এখন ক’জন ভাবতে পারে! অনেকে হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন যে বই পড়ার অপর নাম সময়ের অপচয়! একটিও ক্লাসিক সাহিত্য না পড়েও অনেকেই জীবনে পেয়ে গেছেন প্রতিষ্ঠা, হয়েছেন ব্যাংকার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল। দীর্ঘদিন আর কোন বই একটানে পড়া হয়নি। অনেকদিন পর আবার পুরনো নেশা ধরালো মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ইতিবৃত্তে চন্ডাল জীবন। কী সাংঘাতিক, রোমাঞ্চকর, আর বিস্ময়কর জীবন সংগ্রামকে মনোরঞ্জন ব্যাপারী মেলে ধরেছেন পাঠকের সামনে! এই বইটা আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন অজগরের হাঁ, আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তিতে একের পর এক পৃষ্ঠা পেরিয়ে যাচ্ছি। বিস্ময়কর সব ঘটনার যেন প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকছি! আমার বিস্ময়ের কোন সীমা থাকছে না, যখন ভাবছি লেখক একজন প্রথাগত শিক্ষিত নন! তিনি জেলখানায় আরেকজন কয়েদির চেষ্টা আর উৎসাহে লেখাপড়া শিখেছেন! নিম্নবর্ণের পরিবারে জন্মানোর অনিচ্ছাকৃত ‘অপরাধের’ শাস্তি পেয়েছেন সারা জীবনভর। অনাহারে, অপমানে তার প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখেছেন চোখের সামনে! জীবিকার তাড়নায় করেননি এমন কোন তুচ্ছ পেশাই অবশিষ্ট নেই। রিকশা চালাতে গিয়ে একদিন যাত্রী মহাশ্বেতা দেবীকে ‘জিজীবিষা’ শব্দের অর্থ জিগ্যেস না করলে হয়তো এই মাপের লেখক হয়ে ওঠাই হতো না কখনো। এখন তিনিই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের এই মুহূর্তের সব চাইতে আলোচিত নাম। অনেক গুলি লোভনীয় পুরস্কার ইতিমধ্যে তিনি পেয়েছেন। ঢাকা লিটফেস্টের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী, যার পিতা বরিশালের সন্তান, দেশভাগের কুৎসিত প্রভাবে বাধ্য হয়েছিলেন জন্মভূমি ত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে। ‘রিফিউজি’ ট্যাগ সঙ্গে নিয়ে জীবন বাঁচানোর নির্মমতম ক্ষমতাধর অন্যায়ের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে হয়েছে। মনোরঞ্জনের এই আখ্যান কেবল তার নিজের জীবনের বর্ণনা নয়। হিন্দু সমাজের অমানবিক, হৃদয়হীন জাতিভেদ প্রথা, সমাজের অসঙ্গতি, রাজনীতির নামে শোষণ- এ দেশের চিরসাথী। মনোরঞ্জন এসবকেই উলঙ্গ করে ছেড়েছেন ‘ভদ্রলোকদের’ চোখের সামনে। ধন্যবাদ শ্রী ব্যাপারী, আপনার মাধ্যমেই ফেরা হলো বইয়ের জগতে।

[লেখক : খ্যাতনামা উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত, সংগীত শিল্পী ও সংগঠক]

  • প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিতকরণে

    মো. আখতার হোসেন আজাদ

    মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী একার পক্ষে উৎপাদন সম্ভব নয়। কোন কিছুর

  • গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু

    অদ্য শেখ মুজিবরের ঢাকা প্রত্যাবর্তন বিমান বন্দরে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের আয়োজন (নিজস্ব বার্তা পরিবেশক) পূর্ব পাকিস্তান

  • মুজিব শতবর্ষ

    মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

    ১১ ফেব্রুয়ারি ন্যায়বিচার ছাড়া কাউকে শাস্তি দেয়া উচিত হবে না -মওলানা ভাসানী ঢাকা। আজ মওলানা