• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

প্লাস্টিক : স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক

সোনিয়া আক্তার

| ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

সুস্থ দেহে, সুস্থ মন- কথাটির সাথে আমরা সকলে পরিচিত। আর স্বাস্থ্যই দিনদিন মারাত্মক পরিণতির দিকে ধেয়ে চলছে অত্যধিক প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে। প্লাস্টিক বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ আবিষ্কার, যা আমাদের জীবনে অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। প্লাস্টিককে পৃথিবীর অন্যতম বহুমুখী উপকরণ বলা হয়ে থাকে। প্লাস্টিক আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে বিজ্ঞান মানুষকে অনেক কিছুউপহার দিয়েছে, যা আমাদের জীবনকে করেছে সহজতর। কিন্তু বিজ্ঞানের আশীর্বাদ আমাদের সুবিবেচনার অভাবে পরিণত হয়েছে অভিশাপে। প্লাস্টিক বর্জ্য হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।

১৯৭০ সালে প্লাস্টিকের খ্যাতি বাড়ার সাথে সাথেই ১৯৮০ সালে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়ে যায়। প্লাস্টিক একটি বিশেষ টার্গেটে পরিণত হয়েছিল কারণ প্লাস্টিক সৃষ্ট পণ্য নিষ্পত্তিযোগ্য হওয়ার পরেও এটি পরিবেশে চিরকাল স্থায়ী হয়। প্লাস্টিক হলো পলিমার জাতীয় পদার্থ যা সিন্থেটিক বা অর্ধ সিন্থেটিক জৈব যৌগ দ্বারা তৈরি। সাধারণত প্লাস্টিক উচ্চ আণবিক ভরের জৈব পলিমার, তবে এতে অন্যান্য পদার্থও থাকে। পলিমারাইজেশন এবং পলিকনডেনসেশনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপাদান যেমনঃ সেলোলোজ, কোল, ন্যাচারাল গ্যাস, সল্ট এবং ক্রুড অয়েল থেকে প্লাস্টিক তৈরি করা হয়।

বর্তমান সময়ে প্লাস্টিক বজ্য পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। আমাদের দৈনন্দিনকার জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে আমাদের মনে হয় প্লাস্টিক দ্রব্য ছাড়া জীবনযাপন অসম্ভব। অধিকাংশ জিনিসপত্র যেমন- প্লেট, গ্লাস, জগ, বাটি, টেবিল, চেয়ার এমনকি আলমারিও তৈরি হয় প্লাস্টিক দিয়ে। প্লাস্টিকের অত্যধিক ব্যবহার আমাদের পরিবেশের ওপরে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তা অনেকের উপলব্ধির বাইরে। প্লাস্টিক দূষণ বলতে বোঝায় পরিবেশ কর্তৃক প্লাস্টিক পদার্থের আহরণ; যা পরবর্তীতে বন্যপ্রাণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, এমনকি মানবজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক দূষণকে আকারের ওপর ভিত্তি করে তিনভাগে ভাগ করা হয়, যেমন- মাইক্রো, মেসো, ম্যাক্রো বর্জ্য। ৫ মিমি পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্যকে মাইক্রোবর্জ্য বলা হয়। এ বর্জ্য নারডল নামেও পরিচিত যা থেকে নতুন প্লাস্টিক পণ্য তেরি করা যায়। ২০ মিমি আকারের চেয়ে দীর্ঘ হলে তাকে ম্যাক্রোবর্জ্য বলা হয়। প্লাস্টিক মুদি থলে হচ্ছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এ ধরনের বর্জ্য প্রায়শই সমুদ্রের পানিতে পাওয়া যায়, যা সামুদ্রিক জীবের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষায় প্রবহমান পানিতে প্রচুর পরিমাণে ভাসমান প্লাস্টিক, পলিব্যাগ, পানি ও জুসের বোতল নদ-নদীর দু’পাড়ে আটকা পড়ে স্থানীয় পরিবেশে দূষণ ঘটাচ্ছে। প্লাঙ্কটন জাতীয় ছোট ছোট প্লাস্টিক কণাকে খাদ্য ভেবে জলজ প্রাণী ভক্ষণ করে। অনেক প্রাণী কণাগুলোকে হজম করতে না পেরে মারা যায়। আবার কিছু মৃত ও রোগাক্রান্ত মাছ জেলেদের জালে আটকা পড়ে। আর এভাবে মাছের মাধ্যমে চক্রের আবর্তে প্লাস্টিক কণা আমাদের পেটের ভিতরে ঢুকে যায়; ফলে নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হয় মানুষ এবং অন্যান্য জীবজন্তু। যেসব প্লাস্টিক ক্লোরিন নামক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে; যা ভূগর্ভস্থ পানি ও ভূপৃষ্ঠীয় পানির সাথে মিশে যায়। অতঃপর এ পানি গ্রহণের সাথে সাথে তা আমাদের খাদ্যচক্রে ঢুকে পড়ে। আর এভাবে পানি পান করার সময় প্রতিনিয়ত আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। প্লাস্টিক এমন এক ধরনের পদার্থ যা পরিবেশে পচতে অথবা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে অনেক সময় লাগে।

প্লাস্টিক থেকে মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিগুলি তাদের মনোমেরিক বিল্ডিং ব্লক যেমন- বিসফেনলে তথা বিপিএ এবং তাদের অ্যাডিটিভস তথা প্লাস্টিকাইজারস থেকেও হতে পারে। প্লাস্টিকের মধ্যে লুকানো কয়েক ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে যার মধ্যে বিসফেনল-এ বা বিপিএ এবং ফ্লেটলেটস ও থ্যালেট অন্যতম। বিসফেনল-এ সবচেয়ে পরিচিত পলিকার্বোনেট প্লাস্টিকের মনোমেরিক বিল্ডিং ব্লক। ১৮৯১ সালে প্রথম এটি সংশ্লেষিত করা হয় এবং অন্যান্য প্লাস্টিক যেমন- পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসিতে ঘন ঘন সংযোজন করা হয়। ২০০৩ সালে বিশ্বে বিপিএর বার্ষিক উৎপাদন ছিল ২.২ মিলিয়ন ম্যাট্রিক টন। কিছু মনোমার শিথিল হওয়ার কারণে পলিমারাইজেশনের সময় বিপিএর অণুগুলো সময়ের সাথে সাথে মুক্তি পেতে পারে পানীয় ও খাবারের পাত্রে। লিচিং প্রক্রিয়ায় পাত্র বারবার ধোয়ার কারণে দ্রুত ত্বরান্বিত হয় এবং যখন এতে এসিড ও ক্ষারজাতীয় পদার্থ জমা হয় যা পলিমার অনুকে ভেঙ্গে দেয়।

প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির সময় পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর জন্য যে নানা ধরনের জৈব ও অজৈব অ্যাডিটিভ যেমন- কালার্যাগন্ট, প্লাস্টিসাইজার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্টেবিলাইজার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় যা মানবদেহের জন্য বিষাক্ত বলে বিবেচিত হয়। প্লাস্টিক ক্যারি ব্যাগের রঙ গাঢ় করার জন্য কালার্যাসন্ট বা পিগমেন্ট জাতীয় যে অ্যাজোডাইস ব্যবহার করা হয় তা ক্যান্সার রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। তাছাড়া পিগমেন্টে ক্যাডমিয়ামের মতো ভারি ধাতু থাকে যা স্বাস্থ্যের ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করে। কমমাত্রায় ক্যাডমিয়াম গ্রহণ করার ফলে হার্ট এনলার্জমেন্ট বা বমি ভাব হতে পারে। প্লাস্টিসাইজারও এক ধরনের জৈব এস্টার যা লিচিংয়ের ফলে খাদ্যদ্রব্যে মিশে যেতে পারে। এটি কারসিনোজেনিক তথা ক্যান্সার রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

প্লাস্টিকের মধ্যে যে রাসায়নিক উপাদানগুলো যোগ করা হয়ে থাকে তা মানবদেহ কর্তৃক শোষিত হয়। এর মধ্যে কয়েকটি যৌগ হরমোন পরিবর্তন করতে বা অন্যান্য সম্ভাব্য মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে দেখা গেছে। প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার হাইপার অ্যাকটিভ থেকে শুরু করে হাঁপানি, চর্মরোগ, কিডনি রোগ এবং অটিজমের মতো মারাত্মক রোগের কারণ। প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান করা আমাদের নিত্যদিনকার অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অগোচরেই এর ব্যবহার আমাদের নানাবিধ ক্ষতি করে চলেছে। পানি বেশিক্ষণ বোতলে রেখে দিলে তাতে যে জীবাণুর জন্ম নেয় তা আমাদের সমস্ত অঙ্গেরই ক্ষতি করে।

প্লাস্টিক দূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নারী ও শিশুরা। বিপিএ নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য দায়ী যেমন, ডিম্বাশয়ের ক্রোমোসোমাল ক্ষতি, শুক্রাণু প্রক্রিয়াকরণ হ্রাস, দ্রুত বয়ঃসন্ধি, ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাকুলার ডিজঅর্ডার, স্থুলত্ব, জেনেটিক পরিবর্তন, বধিরতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস, আলসার ইত্যাদি। এছাড়াও বিপিএ বেস্ট ক্যান্সার, হৃদরোগ, প্রস্টেটের ঝুঁকি বাড়ায় এবং বিপাকীয় ব্যাধির সূচনা ঘটায়। এছাড়া বারবার ব্যবহারে প্লাস্টিক বোতলে ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে যা অনেক ধরনের ক্ষতিকর রোগ সৃষ্টির কারণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১ আউন্স পলিইথিলিন তৈরি করতে ৫ আউন্স কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। তাহলে দেখা গেল, আমরা যে পরিমাণ প্লাস্টিক দ্রব্য উৎপাদন করছি তার থেকে বেশি পরিমাণে দূষিত পদার্থ বাতাসে নির্গত করছি। আর এসব পদার্থ মূলত গ্রিনহাউস ইফেক্টের জন্য দায়ী। যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া আমাদের স্কিন ডিজিজের জন্য দায়ী।

জনসংখ্যার স্বতন্ত্র স্তর থেকে শুরু করে, প্লাস্টিকের বিষাক্ততা প্রকৃতির সর্বজনীন একটি বিশাল সমস্যা। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিকগুলো না জেনে এমনকি জেনেও আমরা এর ব্যবহার চালিয়েই যাচ্ছি। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকার, আইন প্রণয়ন সংস্থা এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে প্লাস্টিকের টেকসই উৎপাদন, ব্যবহার এবং নিষ্পত্তিকরণের জন্য জোরালো প্রচারণা চালাতে হবে। প্লাস্টিক ব্যবহার করার পর তা যত্রতত্র না ফেলে পুর্নব্যবহার করার দিকে নজর দিতে হবে।

উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পারবো যে, তারা কিভাবে প্লাস্টিক বর্জ্যরে নিখুঁত ব্যবহার করে। জাপানিরা এক বিশেষ স্থানে প্লাস্টিক দ্রব্য স্টোর করে এবং তাদের মিউনিসিপ্যালিটি সপ্তাহের এক বিশেষ দিনে তা কালেক্ট করে। তারপর তারা সেটা ফার্নেসে পুড়ায় অথবা রিসাইকেল করে। ইউরোপ, আমেরিকা জৈব যৌগ মিশিয়ে বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল পলিথিন তৈরি করছে। আমাদেরকেও পচনশীল প্লাস্টিক ও পলিথিন তৈরি করতে হবে যা সহজে মাটির সাথে মিশে যায়। এছাড়াও পলিথিন এর পরিবর্তে পাটের ব্যাগের ব্যবহার চালু করতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার যাতে আমাদের স্বাস্থ্যের এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে শুধু আমাদের সচেতন হলেই চলবে না, বৈশ্বিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তা না হলে প্লাস্টিক দূষণ একদিন আমাদের পুরো মানবজাতির জন্য মহাপ্রলয় বয়ে আনবে।

[লেখক : শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়]

soniasonia56735@gmail.com

  • করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রভাব

    আবু আফজাল সালেহ

    সবচেয়ে নেতিবাচক বিষয় হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মূলত অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থার গোড়াতেই আঘাত

  • মুজিব শতবর্ষ

    মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

    প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছেন, এবারের সংগ্রাম একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার

  • গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু

    রাজশাহী, ৮ই আগস্ট। আওয়ামী লীগের সূত্রে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, বিগত ১ লা আগস্ট বিরাট হট্টগোলের মধ্য দিয়া নাটোর মহাকুমা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পরিসমাপ্তি ঘটে।