• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪১

প্রসঙ্গ : এনআরসি (আসাম)

দেবাহুতি চক্রবর্তী

| ঢাকা , বুধবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আসামে আমি কোনদিন যাইনি। যে উনিশ লাখ মানুষের তালিকা নাগরিকপঞ্জিবহির্ভূত হিসেবে রাখা হয়েছে, তাদের কেউ আমার সরাসরি পরিচিত নয়। কিন্তু এই মুখগুলো যেন আমি চিনি। আমার জন্মের আগে থেকে অসহায়-বেদনার্ত এসব মুখের ছবি বারবার দেখেছি। প্রত্যক্ষ করেছি, করছি সারা জীবন।

মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, মানুষের জন্য রাষ্ট্র না রাষ্ট্রের জন্য মানুষ? উত্তর একই, মানুষের জন্যই রাষ্ট্র। আদিম অরণ্যবাসী জীবনে রাষ্ট্রের দরকার ছিল না মানুষের। মানুষের আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার বিবর্তনের পালায় ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশ, শ্রেুীবিভক্ত সমাজবিন্যাস, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার সব মিলিয়ে এক এক করে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের জন্ম। এ জন্মের আগে থেকেই জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি মানুষ ছুটে বেড়িয়েছে।

রাষ্ট্রের জন্মের পরেও এ যাযাবর বৃত্তি অব্যাহত থেকেছে বহু সময় ধরে। আধুনিক যুগের মানুষ বহু কারণে অনুকূল পরিবেশে স্থিত হতে চায়। উত্তরাধিকার পরম্পরায় বিশ্বাস করতে চায়, আমার দেশ, আমার মাটি, মানুষজন, গাছপালা, জীবজন্তু সব আমার, আমার একান্ত ভালোবাসার নিবিড় এক অনুভূতিতে জড়িত হতে চায়। আর তাই নির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে চায়। রাষ্ট্রের সঙ্গে দেয়া-নেয়ার নিবিড় সম্পর্কে নিজের অধিকার, মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু পৃথিবীর অনেক অনেক জায়গাতেই আজও তাড়া খেয়ে মানুষ ছুটছে। এর যেন বিরাম নেই। সমুদ্রে ভেসে আসা বালুতটে শিশু আরিয়ানের লাশ, মৃত বাবার বুকে মৃত শিশুকন্যার জড়াজড়ি করা লাশ বিশ্ববিবেককে ব্যথিত করে, অপরাধী করে। প্রায়ই সাগরে, মহাসাগরে এক দেশ হতে অন্যদেশে অভিবাসী ইচ্ছুক কত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আমাদের পীড়িত করে। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গর্বিত। কিন্তু চোরাপথে বেআইনি ভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে প্রায়ই কতজন জীবন হারাচ্ছে। ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে’ ছুটে বেড়ানোর এ এক বিষম আকর্ষণ। আকাক্সিক্ষত কোন রাষ্ট্রের ঠিকানা খুঁজে পেতে।

আসামে বহু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এ আদি অধিবাসীরাও কোন এক সময় বাইরে থেকে এসেছে। শোনা যায়, চীন-মায়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে এদের পূর্বসূরিদের আগমন ঘটে। সঠিক তথ্য জানা নেই, অনেকে বলেন, এদের জিনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের আদিবাসীদের জিনের মিল রয়েছে। আসামে তারা যখনই যেভাবে আসুক দীর্ঘ কয়েক শত বছরের তাদের স্বাধীনতা প্রথম বাধাপ্রাপ্ত হয় মোগল আমলে। ১৬৬২-১৬৭১ অবধি মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে বরফুকনের নেতৃত্বে মোগলরা পরাজিত হয়। এবং শোনা যায়, ভারতে মোগলদের এই প্রথম কোন যুদ্ধে পরাজয়। ইতিহাসের এত তথ্য আলোচ্য বিষয় নয়।

বিষয় হচ্ছে, এ আসাম রাজ্যে বাঙালিদের বসবাস সেও বহু পুরাতন কাহিনী। আর আসামবাসীর ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন সেও বহু পুরনো হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলেও এ জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার জেরে বহু দাঙ্গা-বিবাদ হয়েছে। আসামের আদি জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব ভারত সরকারের। ’৫২-তে বাংলা ভাষার জন্য ঢাকার রাজপথ লাল হয়েছে। এই বাংলাভাষার জন্য ষাটের দশকের শুরুতে প্রথম নারী শহীদ কমলা ভট্টাচার্যসহ এগারোজন প্রাণ দেন আসামের শিলচরে। আজ শহীদ স্টেশন হিসেবে এখানকার স্টেশনের নামকরণ সবাই মেনে নিয়েছে। ’৭২ সালেও বিজন চক্রবর্তী শহীদ হন আসামে বাংলাভাষার জন্য। কখনও বিরোধ, কখনও মেলামেশার মাঝ দিয়ে আসামে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠীর বসবাস সবাই সহজ করে নিয়েছে।

প্রশ্ন এসেছে ’৭১ পরবর্তী সময়ে সরকারি ভাষায় বর্ডুত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে। ১৯৫১ সালে প্রথম ভারতে নাগরিকপঞ্জি গঠনের নীতিমালা হয়। এরপর কংগ্রেস ও বিভিন্ন সরকারের আমলে নীতিমালা তৈরির চেষ্টা হয়। সর্বশেষ প্রচেষ্টা শুরু হয় ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের একটি নির্দেশের আলোকে। আসামে এই আগস্টের শেষে যা আলোর মুখ দেখে। প্রকাশিত এই তালিকায় ১৯ লাখ মানুষের নাগরিক বৈধতা নেই। যার মধ্যে ১১ লাখ বাঙালি হিন্দু, মানে বাংলাদেশ থেকে আশ্রয় নেয়া, ৬ লাখ মুসলিম, যার মধ্যে রোহিঙ্গা ও বাঙালি দুইই আছে, বাকি দুই লাখ নেপাল, ভুটান ও অন্যান্য অঞ্চলের। মূলত বাঙালি এখানে প্রধান শিকার। আমি জাতিগত ভাবে অন্ধ নই। কিন্তু কোন একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠী বারবার তাড়িত হয়ে বেড়াবে এটাও কাম্য নয়। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীন যে কোন মানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ভারত সরকার এই মুহূর্তে সবাইকে বিদেশি বলছে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বেশ কিছু মানুষকে কারাবন্দী করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কারাবন্দী করা হোক বা না হোক, এই মানুষগুলোর সামনে সব ভারতবর্ষই এখন কারাগার। তাদের অধিকতর প্রমাণের সুযোগ দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। উচ্চতর আদালত অবধি যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অধিকাংশ হিন্দুর রয়েছে। বিচারের নামে কালক্ষেপণ আর ক্ষেত্রবিশেষে প্রহসন। ’৬৪-’৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় নির্বিচারে হিন্দুদের সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। নাম বদল করে স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে যা অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। ২০১২ তে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের সুফল পেতে সারা দেশে ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়। এইসব ট্রাইব্যুনালের অধিকাংশই এখন গাধার নাকের ডগায় মুলার মতো ঝুলছে। অর্ধশত বছর ধরে এই একটি আইন বাঙালি হিন্দুর নীরবে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করার জন্য যথেষ্ট বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ভারতের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমার প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই। কিন্তু সন্দেহের অবকাশ যথেষ্ট রয়েছে।

এ লাখো লাখো মানুষের কতজনের সামর্থ্য রয়েছে বিচারের দোরগোড়ায় যাওয়ার, কতজন উচ্চতর আদালত অবধি যেতে পারবেন, বিচার শেষে কতজন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন, যারা না পাবেন তারা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে থাকবেন কী থাকবেন না, অন্যান্য নাগরিক অধিকারের কতটুকু তারা পাবেন, কিছুই যদি না পান তবে তারা কি কারাবন্দী থাকবেন, নাকি বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের সীমান্তের কাঁটাতারে তারা ফেলানী হিসেবে ঝুলতে থাকবেনÑ এসব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা থাকার কথা নয়। দেশে দেশে নানাভাবে মানুষকে রাষ্ট্রহীন করার যে খেলা চলছে, এ যেন তারই একটা অংশ। ভাসমান জনগোষ্ঠী হিসেবে বেঁচে থাকার যে মর্মান্তিক যন্ত্রণা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। প্রশ্ন আসতে পারে, ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় জনবহুল রাষ্ট্র। বছরের পর বছর অবৈধ অনুপ্রবেশ নানাভাবে ভারতের জন্য উদ্বেগ ও বিপজ্জনক। তাহলে, এক অনুপ্রবেশ রুখতে হবে। দুই, প্রমাডুত অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দিতে হবে। যুক্তি হিসেবে যত সহজ, বাস্তব তত সহজ নয়। কোন পরিসংখ্যান না জেনেই বলতে পারি, শুধু আসাম নয় এমনভাবে খুঁজতে গেলে ভারতের এমন কোন রাজ্য নেই, যেখানে এমন তালিকা তৈরি করা যাবে না। দেশব্যাপী এ অভিযান নিয়ে ব্যস্ত থাকলে বাইরের শত্রুর সঙ্গে ঘরের শত্রুর আঁতাত ঘটা অধিকতর সহজ হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবাংলা এসব এলাকায় বাঙালি হিন্দুর সংখ্যাই বেশি। কারণ এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। যা অস্বীকার কেউ করতে পারবে না। ’৭১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট কালে বহু দরিদ্র শ্রেুীর মুসলিম সাধারণ শ্রমজীবী হিসেবে ভারতে যায় এবং ভারতের প্রত্যন্ত রাজ্য সমূহেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। এবং একসময় ঘরবাড়ি নির্মাণে নিজেদের ভারতের স্থায়ী নাগরিক হিসেবে মনে করে। সেই সুযোগ বিভিন্ন সরকারের আমলে তারাও পেয়েছে। এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সেই জায়গায় নেই। দরিদ্র মুসলিম পরিবার শ্রমজীবী হিসেবে ভারতের থেকে দেশেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এখন বিত্তশালী পরিবারের কেউ কেউ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ তাগিদে ভারতে সহায়-সম্পদ সংগ্রহে ইচ্ছুক হলেও হতে পারে। আমার ঠিক জানা নেই। কিন্তু বাংলাদেশি হিন্দুদের বিষয়টি আলাদা। দেশে চিরকালই তারা মানসিক ভাবে পরবাসী। ’৭৫ পরবর্তী সময় থেকে রাষ্ট্র এই পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকায় রয়েছে। নতুন প্রজন্মের হিন্দু ছেলে মেয়ে এখন পারতপক্ষে ভারতমুখী হতে আগ্রহী নয়। তারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু, যে সব পরিবারের পক্ষে অন্যত্র স্থানান্তর সম্ভব হচ্ছে না বিপদে পড়েই তারা ভারতমুখী হচ্ছে। এই দায় ভারত আর নেবে কেন?

বাঙালি হিন্দুদের অব্যাহত এই দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রসঙ্গে সহজ ভাবে যে কথাটা মনে আসে, ‘এ আমার, এ তোমার পাপ।’ অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে অগ্রদূতের প্রথম সারিতে থাকে বাংলা আর পাঞ্জাব। কত কত জীবনের আত্মবলিদানে সমৃদ্ধ এই ইতিহাস। অথচ ব্রিটিশ তার নিজের স্বার্থে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের শাসন ক্ষমতার ভাগাভাগির লিপ্সা সম্পন্ন করলো নির্মম ভাবে এক কালির আঁচড়ে। বাংলা আর পাঞ্জাবের অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ আর নির্লজ্জতম অধ্যায়। ’৪৬-এর কলকাতা আর নোয়াখালীর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় রক্তের হোলিখেলা অবিভক্ত ভারতের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের চরমতম রূপ। ৪৭ এ বৃটিশ পতাকা নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাঞ্জাবের রক্তবন্যা ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করে। জনবিনিময়ের মাঝ দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের শেকড় উপড়ে দ্বিখন্ডিত পাঞ্জাবে অনেকটাই স্থায়ী স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে উভয় সরকার উদ্যোগ নেয় এবং সফল হয়। কিন্তু দ্বিখন্ডিত বাংলার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কোন মাথাব্যথা তেমন ছিল না। দেশভাগ পরবর্তী এই ভূখন্ডে যত দাঙ্গা হয়েছে তা একতরফা। হিন্দুরা মার খেয়ে এবং হজম করে সর্বস্ব খুইয়ে গ্রোতের মতো দেশ ছেড়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে এই পরিস্থিতি রোধে এক ধরণের উপেক্ষা দেখা যায়। ৪৬ এবং ৫০ এর দাঙ্গার বিভীষিকা নিয়ে বেশ কিছু মুসলিম এপারে চলে আসে। তারাও কোন সুখকর স্মৃতি সঙ্গে আনেনি। ’৫১-এ নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির বদৌলতে স্বেচ্ছায় সম্পত্তি বিনিময়ের মাধ্যমেও অনেক মুসলিম এপার বাংলায় আসে। কিন্তু সেই সংখ্যা হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া থেকে অনেক কম। পূর্ব বাংলার হিন্দুরা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেই বেশি আশ্রয় নেয়। ক্ষেত্রবিশেষে তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। দেশবিভাগের ক’বছরের মধ্যেই দাঙ্গা হাঙ্গামা যাই হোক ভারতীয় মুসলিমরা দেশত্যাগ বন্ধ করে। ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সম্পত্তি ভোগ দখলের অধিকার মুসলিম সম্প্রদায় কোনদিনই হারায়নি। এমনকি দেশত্যাগী বহু মুসলিম পরিবার অদ্যাবধি ভারতে তাদের পারিবারিক জমির মালিকানা শরিকদের মাধ্যমে রক্ষা করে। ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষেত্রবিশেষে বৈষম্য বা বঞ্চিত এই বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক ভাবে রাষ্ট্র তার সমমর্যাদা কেড়ে নেয়নি। নিজের দেশ ছাড়ার প্রবণতা সেক্ষেত্রে অনেক কম। এদিকে পাকিস্তান আমলে ’৬৪ অবধি একতরফা বিভিন্ন দাঙ্গায় হিন্দুরা ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়। পরবর্তী পাক-ভারত যুদ্ধের পর শত্রু সম্পত্তি আইন অদ্যাবধি ভিন্ন নামে বলবৎ রেখে স্লো পয়জনিংয়ের মতো হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্যতা সৃষ্টি করা হয়। পাঞ্জাবের মতো দ্বিখন্ডিত বাংলার সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী না হওয়ার কারণে ভারতকে রিফিউজির বোঝা সত্তর বছর ধরে বহন করতে হচ্ছে। মনে রাখা দরকার দেশের ঘরবাড়ি সব ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলো ভারতে কোন সাদর সংবর্ধনা পায়নি। সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর রক্ত, ঘাম আর অশ্রুতে জড়ানো প্রতিদিনের তাড়া খাওয়া ইতিহাস। ভারত সরকার এ দায় কখনই এড়াতে পারবে না। ’৪৭-এর দেশভাগের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের অবিমৃষ্যকারিতার খেসারত দিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। আসামের নাগরিকপঞ্জির তালিকা বহির্ভূত সিংহভাগ মানুষ এর মধ্যেই পড়ে। বিদেশি হিসেবে এদের বাংলাদেশ সীমান্ত পার করা খুব সহজ বিষয় নয়। বাংলাদেশ কখনই এই লাখ লাখ মানুষের দায়িত্ব নতুন করে নেবে না। সেক্ষেত্রেও এই মানুষগুলো বলির পাঁঠা হবে।

ইতোমধ্যে এ দেশ রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে এক সংকটজনক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। অন্যদিকে ভারত সরকারের এ এনআরসি দেশের ওপর দূরবর্তী এক অঘোষিত চাপ। বাংলাদেশ সরকারের ভাবার সময় এসেছে দেশের বর্তমান সংখ্যালঘু দেড় দুই কোটি মানুষ কোন অবস্থাতেই যাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য না হয় এমন নাগরিক নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উল্লেখযোগ্য উৎসবগুলো পালনে যে নিরাপত্তা দেয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র নিজে নানাভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ লালন করছে। সেখান থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, সেই পথ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দু মুসলমানের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আজও অনেক বেশি। আত্মীয় বলতে এখনও প্রতিবেশী হিন্দু মুসলিম পরষ্পরকে জানে। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে।

পাকিস্তান তো বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে জঙ্গি মদদদাতা রাষ্ট্র হিসেবে। এখন বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়কেই তাই মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করা এবং রাষ্ট্রহীন করার অমানবিকতা রোধে আন্তরিক হতে হবে।

চোখের সামনে আবার ভাসছে সেই ১৯ লাখ আর তাদের সঙ্গে ভাগ্য জড়ানো আরও অনেক অসহায় বেদনার্ত মানুষের মুখ। কী ভীষণ অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা আর উদ্বেগ যন্ত্রণা নিয়ে এদের জীবনযাপন শুরু হলো আনুষ্ঠানিক ভাবে! তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ৬০ বছরের যে নারী আত্মহত্যা করলেন, সেই মৃত্যুর দায় কে নেবে? ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিনের পরিবার যে নাগরিক হির্ভূত তালিকায় জায়গা পেল তার লজ্জা কে বহন করবে? মানুষের নাগরিক অধিকার আর সম্মান হারানো মানুষগুলো দীর্ঘ সময় বিপন্নবোধে আচ্ছন্ন না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখার আবশ্যকতা ভারতের নিজস্ব। এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এর সঙ্গে ভারত সরকারের বহুবিধ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। যা আমার উপলব্ধি করা সহজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবনা থেকে বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন মনে করি। আর, আমাদের মতো সাধারণের কাছে ঘুরেফিরে সেই একই কথা। একসময় মানুষের জীবনে রাষ্ট্র অপরিহার্য ছিল না। আজ একুশ শতকের বিশ্বায়নের যুগ। ভিসামুক্ত আন্দোলন কমবেশি আওয়াজ তুলছে। কোন মানুষ কোন দেশে অপরাধী বা সন্ত্রাসী প্রমাণিত না হলে তার মানবাধিকার রক্ষা যে কোন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভারত একাত্তরে এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে প্রশংসিত হয়েছে। এখন লাখ লাখ মানুষকে ভারত থেকে বিতাড়িত করা আদৌ সম্ভব কি? যদি না হয়, তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষময় করে তোলার ফল শুভ হতে পারে না। এ বিপর্যস্ত মানুষগুলোই যে কোন সময় আমাজনের রেইন ফরেস্টের মতো দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত এক অভিন্ন সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। তা রক্ষার দায় দুই দেশের। সময় উত্তর দেবে। এখন শুধু অপেক্ষাÑ ‘সব একসঙ্গে ঘুরে আসে স্মৃতির স্রোতে /অল্প আলোয় বসে থাকা পথ ভিখারি /যা ছিল আর যা আছে দুই পাথর ঠুকে/জ্বালিয়ে নেয় প্রতিদিনের পুনর্বাসন।’ (শঙ্খ ঘোষ)।