• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ ১৪৪০

প্রতিবাদের নাম রাফি

সামসুজ্জামান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

image

অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে ফেনীর সোনাগাজী দাখিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। অষ্টাদশী সুন্দরী এ মেয়েটির কি অপরাধে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়ে নির্মম যন্ত্রণা ভোগ করে চলে যেতে হলো। শিক্ষক আমাদের শিক্ষা গুরু, শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তার মাধ্যমে। পিতৃতুল্য সম্মান পান তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। সমাজে শিক্ষকের রয়েছে আলাদা সম্মান। রাফির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান মানুষরূপী হায়েনার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থে রাজি না হওয়ায় তাকে অকালে প্রাণ দিতে হল। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার কুকর্মের যে বিশাল খতিয়ান বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে তা দেখলে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। ওই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মার্কেট থেকে মাসে যে ২০০০০০/- টাকা ভাড়া আদায় হতো সেই টাকা মওলানা বেশধারী অধ্যক্ষ, নেতা এবং মাসেলম্যানদের দিয়ে তার চেয়ার ঠিক রেখেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জামাতের একজন প্রথমসারির নেতা হলেও সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের ২ জন নেতাকে কৌশলে ম্যানেজ করে তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ৩৯০০০০০/- টাকা আত্মসাৎ এবং যৌন হয়রানির কারণে কয়েকবার কারাভোগের পরও ওই চেয়ারে তিনি কিভাবে আসীন ছিলেন তা এখন পরিষ্কার। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ থেকে আগাম প্রশ্ন দেয়ার লোভ দেখিয়ে তিনি কত মেয়ের সর্বনাশ করেছেন তা প্রকৃত তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে। মামলাটি টিআইবিতে স্থানান্তর করা হলেও কতদূর গড়াবে তা নিয়ে জনমনে যেমব সংশয় আছে তেমনি একটি আলোর শিখাও দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে।

রাফিকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা নূর হোসেনকে দিয়ে প্রশাসনিক ভবনে দোতলায় নির্জন কক্ষে ডেকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। এমনকি জোরপূর্বক রাফির শরীরের স্পর্শকাতর কয়েক জায়গায় হাতও দেয়। রাফি এ নিয়ে থানায় মামলা করায় জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ বুঝতে পারেন প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠবে। যে কথা রাফি তার দুই বান্ধবীকে উদ্দেশ করে লিখেছে- ‘আমার আত্মহত্যার প্রথম সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, আমি শেষপর্যন্ত না দেখে ছাড়ব না।’ প্রতিবাদের আভাস পেয়ে প্রতিবাদকারীকেই চিরবিদায় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অধ্যক্ষ। জেলখানায় বসেই তার কয়েকজন পালিত ছাত্রী এবং সাগরিদের মাধ্যমে তাকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয়। রাফিকে আগুনে পোড়ালে যে সারা দেশে আগুন ছড়িয়ে পড়বে মূর্খ অধ্যক্ষ তা বুঝতে পারেনি। এ ষড়যন্ত্র হয় ওসির সঙ্গে পরামর্শ করেই। ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে রাফির দায়ের করা মামলা যদি গুরুত্বসহকারে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন আমলে নিতেন তাহলে হয়তো এমন নৃশংস ঘটনা ঘটত না। বরং ওসি সাহেব রাফিকে তার অফিসে তলব করে তার কথোপকথন রেকর্ড করেন। এক যুবতী মেয়ে তার অসম্মানের গ্লানি সইতে না পেরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে যখন উত্তর দিচ্ছে তখন ওসি কান্না থামানোর জন্য রাফিকে ধমকও দেন।

জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ সিরাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টাকা দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাসহ ওসি এবং মাসেলম্যানদের ম্যানেজ করে তার অপকর্ম চালিয়ে যেতেন। শিবির নিয়ন্ত্রিত ওই প্রতিষ্ঠানটি এতটাই তার কব্জায় ছিল যে, তাকে গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে তার মুক্তির দাবিতে শিবির ক্যাডাররা মাঠে নেমে গিয়েছিল।

আমাদের দেশের মেয়েরা বিভিন্নভাবে নিগৃহীত। শিক্ষাঙ্গন ছিল তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু সেখানেই যখন তারা নিরাপদ নয়, তাহলে যাবে কোথায়? তাহলে কি তাদের শিক্ষাও বন্ধ করে দিতে হবে? রাফির মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ আজ উত্তাল। অধ্যক্ষ সিরাজ এবং তার সহযোগীদের ফাঁসির দাবিতে মিটিং, মিছিল, মানববন্ধন হয়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে হাইকোর্ট কোন রুল দেয়নি। তবে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছে প্রয়োজনে তারা হস্তক্ষেপ করবেন।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই- সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী, কুমিল্লার তনু এবং দক্ষিণবঙ্গের ১২ সম্পাদক এবং সাংবাদিকের হত্যার রহস্য দীর্ঘ দু’দশকেও আলোর মুখ দেখেনি। রাফি হত্যা মামলার মূল আসামিসহ সহযোগী সবার মৃত্যুদন্ড আমাদের কাম্য। আশা করি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে বিচারকাজ যেন সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় কেঁচো খুড়তে সাপ বেরোবে নিঃসন্দেহে। সেই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত মাদ্রাসাগুলোতে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের আমলে শিবিরনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতেও অবাক লাগে। তারপরও জামায়াতের নেতা বসে আছে সেই প্রতিষ্ঠানের বড় চেয়ারটিতে। আর অপকর্ম চাপা দিতে সরকারদলীয় নেতাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করছে। সোনাগাজী থানার ওসির সাহস কোন পর্যায়ে গেছে যে, তিনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাদীর কথাবার্তা ভিডিও করেছেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

কয়েকজন বান্ধবী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের কথা বললে রাফি বলেছিল- ‘আমি এ জঘন্য কাজের প্রতিবাদ করবই, তাতে যদি আমার মৃত্যু হয় তাতেও আমার কোন কষ্ট থাকবে না, তবে এর শেষ পরিণতি আমি দেখব।’ শেষ পরিণতি রাফি দেখে যেতে না পারলেও তার মৃত্যুর প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষের ঢল আর চোখের অশ্রু বৃথা যাবে না। তার আত্মা শান্তিতেই থাকবে।

রাফি মরে গিয়ে প্রমাণ রেখে গেল যে, সে মরে নাই। আর আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষা দিয়ে গেল, আমাদের সমাজে প্রতিবাদ কত নির্মম।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

মোবা- ০১৭১২-৯৯৮২৫৫

shamsuzzaman07@gmail.com