• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৪ রমজান ১৪৪০

প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি কৃষি বাঁচিয়ে রাখবে ব্যাকটেরিয়া

ড. মো. হারুন-অর রশিদ ও মো. আবদুর রউফ

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭ (সাত) বিলিয়ন, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৫ (সাড়ে আট) বিলিয়ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বের প্রত্যাশিত বর্তমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আধুনিক শিল্পায়নের প্রভাবে সৃষ্ট পরিবেশের বির্পযয় উভয় সমস্যাকে বিবেচনা করলে এটা পরিষ্কার যে আগামী ১০-২০ বৎসরের মধ্যে বিশ্ববাসীকে খাদ্য জোগান দেয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আর এটা এমনই এক সমস্যা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বাড়তেই থাকবে। তাই পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এখনই প্রয়োজন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি/কৌশল উদ্ভাবন করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কাজ শুরু করা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের প্রভাবে পৃথিবীতে উৎপাদিত বর্জ্য শোষণ করার জন্য পৃথিবীর বায়ুমন্ডল, স্থলজ ও জলজ পরিবেশ যথেষ্ট নয়। ফল স্বরূপ বিষাক্ত ধাতু ও জৈব যৌগের মাধ্যমে আমাদের পরিবেশ ক্রমবর্ধমান হারে দূষিত হচ্ছে। তাই এই সমস্যার প্রকৃতি ও এর বিস্তৃতির মাত্রা স্বীকার করাই হচ্ছে সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ। কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক পন্থা যেমন রাসায়নিক সার, আগাছানাশক, কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহারের বিষয়ে পুনরায় চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন কারণ এরা ব্যয়বহুল ও পরিবেশে অনেক ক্ষতিকর পদার্থ উৎপন্ন করে; যা মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতি কর। তাই পরিবেশ দূষণ কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য কার্যকর জৈবিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সময়ের দাবি।

সাধারণভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তারকারী সমস্ত ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া (Plant growth promoting bacteria, PGPB)। এরা বিভিন্নভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন উদ্ভিদকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে সরাসরি উপকার করে অথবা উদ্ভিদের হরমোনের মাত্রা পরিবর্তন করে প্রতিকূল পরিবেশে উদ্ভিদকে টিকে থাকতে সাহায্য করে অথবা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বৃদ্ধিকে হ্রাস করে/নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে অথবা উদ্ভিদকে ক্ষতিকর ভারি ধাতব পদার্থের প্রভাব হতে রক্ষা করে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পরিবর্তিত পরিবেশে কৃষিকে টেকসই করতে দরকার উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার উন্নত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা।

নাইট্রোজেন সংবদ্ধন (Nitrogen fixation)

মাটিতে বসবাসকারী এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া লিগিউম ফসলের মূলে ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কান্ডের সঙ্গে নডিউল তৈরি করে বাতাসের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন সরবরাহ করতে পারে ফলে ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। সাধারণভাবে এদের বলা হয় রাইজোবিয়াম (Rhizobium) ব্যাকটেরিয়া। রাইজোবিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও মাটিতে মুক্তভাবে বসবাসকারী অনেক রকমের ব্যাকটেরিয়া যেমন- Azospirillum, Azotobacter, Frankia প্রভৃতি থাকে যারা বাতাসের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে গাছকে সরবরাহ করে থাকে। বিজ্ঞানীরা রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার জিনগত কাঠামো পরিবর্তনের জন্য নিরলসভাবে কাজে করে গেলেও নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়ার জিনগত কাঠামো পরিবর্তন করে উদ্ভিদের নাইট্রোজেন সংবন্ধনে খুব অল্প পরিমাণ সাফল্য পেয়েছেন। যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবর্তিত Rhizobium tropici ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেইন শিম গাছে ব্যবহার করে অব্যবহৃত গাছের তুলনায় ব্যবহৃত গাছে নডিউলের সংখ্যা ও গাছের ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে তবে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেইন মাটিতে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে নাই। নাইট্রোজিনেজ এনজাইমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিমোগ্লোবিন। বিজ্ঞানীরা Rhizobium etli স্ট্রেইনে গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার হিমোগ্লোবিন স্থানান্তর করে দেখেছেন যে, রূপান্তরিত R. etli স্ট্রেইনের শ্বসনের হার ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। রূপান্তরিত এই স্ট্রেইন দ্বারা শিম জাতীয় গাছে ইনোকুলেশন করে দেখা গেছে যে, এর নাইট্রোজনেজ এনজাইম কায্যকারিতা ৬৮% বৃদ্ধি পায় এবং পাতায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ ২৫-৩০% বৃদ্ধি পায় এবং বীজে নাইট্রোজেন বৃদ্ধি পায় ১৬%।

আয়রন সিকোয়েস্ট্রেশন (Ferrous sequestration) ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান বিভিন্ন ধাতব মৌলসমূহের মধ্যে আয়রনের অবস্থান চতুর্থ। স্বাভাবিক/শুকনো মাটিতে অধিকাংশ আয়রন, ফেরিক আয়ন (Fet+3) হিসেবে থাকে বিধায় ব্যাকটেরিয়া এবং উদ্ভিদের কেউই তা গ্রহণ করতে পারে না। অনুজীব ও উদ্ভিদ উভয়েরই উচ্চ পরিমাণ আয়রন প্রয়োজন থাকলেও উদ্ভিদের মূলাঞ্চল/রাইজেস্ফেয়ার থেকে এই আয়রন গ্রহণ করা খুবই কঠিন যখন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং উদ্ভিদ একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রাইজোস্ফেয়ার থেকে আয়রন গ্রহণ করতে চায়। আয়রন সীমিত মাটিতে বেঁচে থাকতে ব্যাকটেরিয়া স্বল্প আনবিক ওজন বিশিষ্ট বিশেষ ধরনের জৈব মলিকুল তথা সিডারোফর (Pseuderophore) উৎপন্ন করে এবং মেমব্রেন রিসেপটর সংশ্লেষণ করে। সিডারোফোরের প্রতি মাটিতে বিদ্যমান আয়রনের উচ্চ আসক্তি বিদ্যমান, যা মেমব্রেন রিসেপ্টরের (Membrane recptore) সঙ্গে বিক্রিয়া করে, সিডারোফোর কমপ্লেক্স তৈরি করে। ফলে অনুজীব সহজেই রাইজোস্ফেয়ার থেকে আয়রন গ্রহণ করতে পারে।

সিডারোফোর উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া ইনোকুল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার ও রেডিও লেভেল (Radio leveled) আয়রন ব্যবহার করে স্থাপিত সিডারোফোর উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার পরীক্ষণে দেখা গেছে যে, এরা আয়রনের ঘাটতিজনিত লক্ষণ কমিয়ে উদ্ভিদের আয়রন ও ক্লোরোফিলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। সিডারোফোর উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া একদিকে নিজের দেহের বৃদ্ধির জন্য অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে মূলাঞ্চলে নিজেদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং অপরদিকে উদ্ভিদকে অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে রূপান্তরিত ও স্বাভাবিক তামাক গাছ ব্যবহার করে দেখা গেছে যে, সিডারোফোর উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা পরিবর্তিত পরিবেশে উদ্ভিদ অধিক আয়রণ সংগ্রহ করে। ফলে ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদের রাইজোস্ফেয়ারের অনুজীবের সংখ্যা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।

ফাইটোহরমোনের মাত্রার পরিবর্তন

বিভিন্ন হরমোন উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নতি নিয়ন্ত্রণে এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উদ্ভিদ তার জীবদ্দশায় (Life time) এক বা একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা তার বৃদ্ধি ও উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করে যতক্ষণ না উদ্ভিদ প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম করতে পারে বা তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্বসন কৌশল/মেটাবলিজমকে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। উদ্ভিদ যখন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয় তখন তার অভ্যন্তরীণ ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবর্তন করে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন যে, উদ্ভিদ যখন তার ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের চেষ্টা করে তথন উদ্ভিদের মূলাঞ্চলে অবস্থিত অনুজীবসমূহ তাদের ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবর্তন করে। উদ্ভিদের হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনে সাহায্য করে উপকারী ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

ট্রিহেলোজ (Trihalose) উৎপাদন

ট্রিহেলোজ (Trihalose) প্রকৃতিতে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান একটি ডাই-স্যাকারাইড/কার্বোহাইডেট যাতে দুই অনু গ্লকোজ থাকে। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, উদ্ভিদ, পোকা এবং অমেরুদন্ডী প্রাণীতে ট্রিহেলোজ পাওয়া যায়। উচ্চমাত্রার ট্রিহেলোজ বিভিন্ন প্রাণীকে প্রতিকূল পরিবেশে যেমন উচ্চ তাপমাত্রা, উচ্চ লবণাক্ততা ও খড়ায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। ট্রিহেলোজ কোষকে শুষ্কতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কোষের ওপর জেলের আবরণ তৈরি করে কোষকে অতিরিক্ত খড়া, তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়া কিছু কিছু প্রোটিনকে ভেঙে যাওয়া ও জমাটবদ্ধ (degredation & aggregation) হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে বিধায় ট্রিহেলোজ উদ্ভিদকে উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে রূপান্তরিত Rhizobium etli strain যা অতিরিক্ত ট্রিহেলোজ উৎপাদনে সক্ষম তাদের শিম ফসলে ব্যবহার করে দেখা গেছে যে, পরিবর্তিত Rhizobium strain শিম ফসলে অধিক নডিউল তৈরি করে, নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে, অধিক বায়োমাস উৎপাদন করে এবং সর্বপুরি শিম গাছকে প্রতিকূল পরিবেশে তথা অতিরিক্ত খড়ায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। অনুরূপভাবে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে রূপান্তরিত Azospirillum brasilense ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেইন ভুট্টা ফসলে ব্যবহারের ফলে ভুট্টা অধিক খড়া সহনশীল হয় এবং অধিক ব্যায়োমাস উৎপন্ন করে থাকে।

এন্ট্রিফ্রিজ (anti-frezze) প্রোটিন উৎপাদন

সর্বজন স্বীকৃত যে, সঠিকবাবে কার্যকর হওয়ার জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেইনকে সব পরিবেশে টিকে থাকতে হবে এবং বংশবিস্তারে সক্ষম হতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা ও উত্তপ্ত আবহাওয়ায় কিছু কিছু প্যাথোজেনিক ছত্রাক মারাত্মক ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠে বিশেষত যখন মাটির তাপমাত্রা খুব কম থাকে। এ সব আবহাওয়ায় ঠান্ডা সহনশীল উপকারী স্ট্রেইন ছত্রাকজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে কিছু কিছু উপকারী স্ট্রেইনের সন্ধান পেয়েছেন যারা নিম্ন তাপে এন্ট্রিফ্রিজ প্রোটিন তৈরি করতে পারে। ব্যাকটেরিয়া এন্ট্রিফ্রিজ প্রোটিন ব্যাকটেরিয়াল মেমব্রেনের বাহিরের দিকে স্বচ্ছ দানাদার লেয়ার তৈরি করতে পারে ফলে ব্যাকটেরিয়া তার বাহিরের মেমব্রেনকে পরিবেশের অতি নিম্ন তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে নিজেরা টিকে থাকতে পারে ও উদ্ভিদকে প্রতিকূল পরিবেশে বিশেষত নিম্ন তাপে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।

দূষিত মাটি পুনরুদ্ধার

বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতব পদার্থ যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম, মারকারি, ক্রোমিয়াম, ইউরেনিয়াম, আর্সেনিক প্রভৃতি উদ্ভিদের ব্যবহারের জন্য উপকারী নয়। কিন্তু এ সব ধাতব পদার্থ যখন মাটিতে জমা হয় তখন এরা উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণে বাধা দেয় এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় এনজাইমের কার্যকারিতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। ভারী ধাতব বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। তাই মাটি থেকে এ সব ভারী ধাতব পদার্থ অপসারণ করা অতীব জরুরি। বিভিন্ন ধরনের অনুজীব এ সমস্ত ক্ষতিকর ভারি ধাতব পদার্থকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে তাদের দৈহিক বৃদ্ধি এবং উন্নতি ঘটায়। অনুজীবের দেহে বিশেষ ধরনের এনজাইম বিদ্যামান থাকায় এরা বিভিন্ন দূষিত পদার্থকে ধ্বংস করতে পারে এবং নিজেদের দেহের হোমিওস্টাসিস (Homeostasis) ধরে রাখতে পারে। অনুজীব ক্ষতিকর ভারী ধাতব পদার্থকে শোষণ করতে পারে, প্রয়োজনে ভারি ধাতব পদার্থকে জারিত এবং বিজারিত করে ধ্বংস করতে পারে। ফলে অনুজীব দূষিত মাটি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ব্যাকটেরিয়ার বাণিজ্যিক ব্যবহার

উদ্ভিদ ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যকার কার্যকারিতার কৌশল সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত থাকলেও কিছু কিছু প্রজাতির ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেইন দীর্ঘকাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইনগুলো Agrobacterium, Azospirillum, Azotobacter, Bacillus, Pseudomonas, Streptomyces, Rhizobium, Cyanobacteria, Serratia entomophilia, Streptomyces griseoviridis, Streptomyces spp., Streptomyces lydicus and varios Rhizobia spp. প্রভৃতি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞানিরা মনে করেন, উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার সর্বাধিক বাণিজ্যিকীকরণের জন্য কিছু সমস্যার দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। যেমন- উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইনের কার্যকারিতা ও ব্যবহারিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে। বিভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড (Genetically modified) স্ট্রেইন পরিবেশে উন্মুক্ত করা বিষয়ে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সাধারণ ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। সব পরিবেশে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে এমন ব্যাকটেরিয়ার উপকারী স্ট্রেইনগুলো নির্বাচন করতে হবে এবং উদ্ভিদে প্রয়োগ করার জন্য আরও কার্যকর উপায় উদ্ভাবন করা প্রয়োজন।

উপসংহারে বলা যায়, পরিবর্তিত পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাকটেরিয়ার উপকারী স্ট্রেইনকে কৃষি উৎপাদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করার সময় এসেছে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে এ সব ব্যাকটেরিয়া আশানুরূপভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে এবং এদের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আশা করা যাচ্ছে যে, ব্যাকটেরিয়ার উপকারী স্ট্রেইন অদূরভবিষ্যৎ প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং পরিবেশ দূষণকারী বিভিন্ন উপাদান শোষণ ও ধ্বংস করার কৌশল তথা রেমিডিয়েশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা দেবে।