• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৪ রমজান ১৪৪০

নারীদের সাংগঠনিক করে তুলতে হবে

সাঈদ চৌধুরী

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৫ মার্চ ২০১৯

নারীদের সক্ষমতা আমাদের দেশে আশানুরূপ হারে বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে বিচরণ, শিক্ষা অর্জন, উদ্যোক্তা হওয়ার মনোভাব, কৃষিকাজ সবজায়গায় নারীদের উপস্থিতি আশাজাগানিয়া। সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের পরও নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে, তাদের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, সংসারে হেয় করা হচ্ছে, দোষারোপ নারীদের দিকে বেশি যাচ্ছে, খাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করা হচ্ছে! বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রেও এখনও বড় ধরনের সাফল্য আনা যায়নি, সন্তান নেয়ার ব্যাপারে নারীদের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই কোন ভূমিকা রাখে না, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের পছন্দ ও অপছন্দকে গ্রহণ করা হয় না!

এ বিষয়গুলো সামগ্রিক অর্থে অনেক প্রভাব পড়লেও সামষ্টিক অর্জন দিয়ে সব বিষয়গুলোকে আসলে বিবেচনা না করা গেলেও ঘরে নারীদের বঞ্চনা কমার ক্ষেত্রে এখনও বঞ্চনা অনেক। সেদিন আমার খুব কাছের আত্মীয় একটি মেয়ের ভাগ্য বিন্যাস দেখলাম চোখের সামনে থেকে। মেয়েটি ভালোবেসে বিয়ে করেছে। যখন বিয়ে করে পরিবারের সবার কথাকে সে উপেক্ষা করে ছেলেটিকে বিয়ে করে। তখন মেয়েটিও জানতো ছেলেটি নেশায় আসক্ত! এখন যখন সন্তান এসেছে তাদের সংসারে তখনও কিন্তু শান্তি আসেনি। মেয়েটি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক কষ্ট করে। ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। ছোট্ট সন্তানটিকে নিয়ে দু-পরিবারের টানা-হেঁচড়া হয়, বিবাদে জড়িয়ে পড়ে একে অন্য থেকে দূরে থাকে, মেয়েটি কাঁদে আবার সংসার করে! এভাবেই চলছে, হয়ত

এভাবেই চলবে!

কিন্তু নারী হয়ে ওঠা এ মেয়েটি তার ইচ্ছেমতো চলার চেষ্টা করলেও দুই পরিবারের টানাপড়েনে তা কতটা পারবে বলে মনে করতে পারি আমরা? একদিকে দু-পরিবারের টানাপড়েন অন্যদিকে শিশুসন্তান, স্বামী এবং নিজের পড়াশোনা! সবগুলো বিষয়ই খুব জটিল রসায়নে আবৃত!

শুধু এ মেয়ের ক্ষেত্রে নয় আরও অনেক না পাওয়ার গল্প আছে। আমরা কিছুদিন আগে ক্যানসারে আক্রান্ত একজন ছেলের চিকিৎসা করিয়েছিলাম সমাজের কিছু মানুষ মিলে। ছেলেটির বয়স ২৪-২৬ বছরের মতো হবে। বাচ্চার বয়স ৩ বছর (প্রায়)। ছেলেটি ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছে। এখন ছোট্ট বাচ্চাটি যখন মায়ের কাছে থাকে তখন মা সন্তানের এ সম্পর্ক তো আগের মতোই আছে। এরই মধ্যে বিধবা বনে যাওয়া নারীর ওপর তার পরিবারের আকুতি তোমাকে আবার বিয়ে করতে হবে। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে মেয়েটির হয়ত আবার বিয়ে হয়েই যাবে। তখন এ শিশুসন্তানটি?

এ নারী কখনই কারও কাছে গিয়ে এ কথা বলতে পারবে না যে আমি বিয়ে করতে চাই না, অথবা এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই আমি আমার সন্তানকে নিয়েই বাঁচতে চাই কারণ তার নির্ভরতার জন্য কে বা কারা পাশে থাকবে এর কোন নিশ্চয়তা নেই!

হ্যাঁ, নারীদের জন্য অনেক কাজ হচ্ছে। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনেক সুবিধা দিচ্ছে, তার সঙ্গে আইনি সহায়তাও দেয়া হচ্ছে কিন্তু বঞ্চনার শিকার এ নারীরা কি পাচ্ছে সে সেবা বা সেবা পেতে হলে কি করতে হবে তা কি তারা জানছে?

এ রকম অনেক প্রশ্নের কিন্তু উত্তর নেই বা উত্তর দেয়ার জায়গা খুব কম। একটি উদাহরণ দেই আমাদের উপজেলার প্রশাসনের ব্যপারটি নিয়ে। আমাদের উপজেলা প্রশাসনের বেশিরভাগ নির্বাহী কর্মকর্তারাই নারী। এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা আকতার নারী উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। সংবাদ মাধ্যমও সহায়তা করে যাচ্ছে, সহায়ত করছে আইনশৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীও। তারপরও কিন্তু কোন কোন জায়গায় লুকিয়ে বাল্যবিয়ে হচ্ছে, কিছু কিছু জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে, হচ্ছে নারী নির্যাতন।

এর পেছনের কারণ হলো অপরাধ প্রবণতা ঘরেই সৃষ্টি হয়ে যাওয়া এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন তারা এগিয়ে গেলেও কেউ কেউ পেছনে পড়ে যাচ্ছে, বঞ্চনার শিকার হচ্ছে ও নির্যাতনের পরও মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে! হ্যাঁ, আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই এবং এ পদ্ধতিটিই হতে পারে নারী উন্নয়নে সরকারের সফলতার মূলমন্ত্র।

নারীদের এখন সাংগঠনিক করে তুলতে হবে। নারীরা যদি সংগঠিত থাকে তবে নারীদের মধ্যে নিজেদের জানার প্রয়োজনীয়তা, নিজেদের সুরক্ষার শক্তি ও তীক্ষèতা অর্জন করা ও নিজেদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ক্ষেত্রে দৃঢ়চেতা মনোভাবী হবে। এর নির্দিষ্ট প্রমাণও আছে। প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায় যে নারীদের আমরা অগ্রদূত ভাবি তারা সবাই সংগঠিত ছিলেন, তারা সবাই তথ্যের সঙ্গে ছিলেন, তারা সবাই একাগ্র ও স্বশিক্ষিত ছিলেন।

যদি আমরা বেগম রোকেয়াকে সামনে নিয়ে আসি তবে যা দেখব এর আগেও যারা নারীদের নিয়ে কাজ করেছেন তাদের মধ্যেও একই ধরনের প্রেরণা আমরা দেখতে পাই। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সহধর্মিণী অবলা বসুর উদাহরণটি সামনে নিয়ে আসতে পারি। তিনি বিধবাদের আর্থিক সাহায্যের জন্য ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠন মহিলাদের জন্য মুরলিধর মহাবিদ্যালয় এবং বিভিন্ন গ্রাম্য এলাকায় প্রায় ২০০টি বিদ্যালয় স্থাপন করে। এ সব বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে তিনি বিদ্যাসাগর বাণী ভবন, মহিলা শিল্প ভবন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখানে বিধবাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শিক্ষিত করা হতো। তার মানে তখনও সংগঠন চালিয়েই নারীদের তাদের অধিকার সম্পর্কে প্রথম সচেতন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এ জায়গাটিতেই আসলে পিছিয়ে পড়ছে নারী সমাজ।

নারী সমাজের দিকপাল যারাই রয়েছেন তাদের অনুসরণ করলেও সংগঠনের ব্যপারটিই প্রথম আসে। আর এতে সুফল হলো নারীরা যে কোন সময় যে কোন ধরনের বিপদে পড়লে সংগঠনের সবাই একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারবে। ফলে সহমর্মিতা যেমন বাড়বে তেমনি নারীদের শেয়ারিং ও কেয়ারিংয়ের জায়গাটিও বাড়বে।

গাজীপুরের শ্রীপুরে বাংলার মালালা খ্যাত একজন নারী সাহিদা আক্তার স্বর্ণা। তিনি নিজে নিজের বাল্যবিয়ে বন্ধ করে আলোকিত হন এবং তারপর বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। অনেক নারীকেই দেখেছি এখন তারাও স্বপ্ন দেখেন সামনে এগুনোর। আরেকজন শ্রীপুরের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মারজিয়া সরকার। তিনি নিয়োগ পেয়েই যুব সংগঠনগুলোকে নিয়ে ভাবনা শুরু করেন। নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিকে সংগঠনে নিয়ে আসেন এবং স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন নতুন দিনের।

জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। প্রাচীনতম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আওতায় নারী উন্নয়ন ভাবনায় যদি সামজের পিছিয়ে পড়া নারীদের সংগঠনের দিকে নিয়ে আসে তবে সেটাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমনি করে সব রাজনৈতিক দলগুলোই যদি নারী উন্নয়নে কাজ করতে চায় সেটাও নারীদের অধিকার রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ যুব সংগঠন জাতীয় যুব সংসদ বাংলাদেশের মতো সংগঠনগুলো যদি নারীদের সংঘবদ্ধ করে আগায় তবে এখানেও বড় সুফল আসতে পারে।

নারীদের সাংগঠনিক করা গেলে তারা তাদের জায়গায় সামর্থ্যবান হয়ে উঠবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের কথাগুলো বলার সক্ষমতা অর্জন ও সঠিক অধিকার প্রাপ্তিতে নিজের অবস্থান জানানোই বড় চ্যালেঞ্জ এখন। ঘরে বাইরে নারী সব জায়গায় সমানভাবে মূল্যায়িত হবে এটাই প্রত্যাশা। তবে এর জন্য যেমনি প্রয়োজন শিক্ষার তেমনি প্রয়োজন বাল্যবিয়ে বন্ধের, তেমনি প্রয়োজন সাংগঠনিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজন নিজেকে সক্ষমভাবে গড়ে তোলার প্রয়াস। সরকারের নজর এ কারণেই এখন নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠার দিকেই দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন নিচের সেøাগানটিও:

সংগঠিত হলে পড়েই

সম অধিকারে হাসবে নারী ...

আমার মাসহ সব নারীর প্রতি রইলো শ্রদ্ধা।

  • স্মরণ

    বহুমাত্রিক অবয়বে আরজ আলী মাতুব্বর

    শাহ আজিজ খোকন

    জ্ঞানকে জ্ঞান থেকে বিশ্লিষ্ট করা দুরূহ। আরজ আলী মাতুব্বরকে জ্ঞান-শিক্ষা-যুক্তি-দর্শন থেকে

  • স্মরণ

    বহুমাত্রিক অবয়বে আরজ আলী মাতুব্বর

    শাহ আজিজ খোকন

    জ্ঞানকে জ্ঞান থেকে বিশ্লিষ্ট করা দুরূহ। আরজ আলী মাতুব্বরকে জ্ঞান-শিক্ষা-যুক্তি-দর্শন থেকে

  • জন্ম শতবর্ষ

    মধুর ক্যান্টিনের মধু দা

    গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিকদের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। মধুর ক্যান্টিনের নাম হয় মধুদার নামানুসারে। মধুর ক্যান্টিনের