• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ২৩ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা

দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক অকুতোভয় সৈনিক

শামসুল ইসলাম সহিদ

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

image

আজ ৮ নভেম্বর শুক্রবার উত্থান একাদশী। তিথি অনুযায়ী এশিয়া খ্যাত কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার ১২৩তম জন্মজয়ন্তী। ১৮৯৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকার অদূরে সাভারের কাছুরে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লৌহজং নদীর তীরঘেঁষা মির্জাপুর গ্রামে। মাতার নাম কুমুদিনী সাহা, পিতার নাম দেবেন্দ্র নাথ সাহা।

দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির এশিয়া খ্যাত কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। দেশ বিভাগের পর এ দেশ থেকে অনেক হিন্দু পরিবার চলে গেছে ভারতে। রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন ব্যতিক্রম। ঘনিষ্ঠজনরা তাকে দেশত্যাগের পরামর্শ দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে অবস্থান তার জীবনের জন্য ঝুঁকি জেনেও তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে দেশে অবস্থান করেছেন। এটি তার দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। আর্তমানবতার সেবার উদ্দেশ্যে একেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তার সেই দেশপ্রেম এবং মানবসেবার একটুও কমতি হয়নি। একমাত্র সক্ষম ছেলে ভবানি প্রসাদ সাহা রবিসহ জীবন উৎসর্গ করে রণদা প্রসাদ সাহা প্রমাণ করেন এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মুক্তির জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে পারেন।

একেবারে শূন্য হাতে শুরু করে জীবন সংগ্রামে সফলতা লাভ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার মনে হলেও কারো জীবনে তা অর্জিত হয়েছে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর অদম্য সাহসিকতা ও ধৈর্য নিয়ে সামনের দিকে পথ চলে। বলা যায়, জিরো থেকে হিরো। ঠিক এমনই একজন হিরোর গল্প লিখা প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশে। কোন সিনেমা কিংবা নাটকের নয়, তিনি হলেন জীবন সংগ্রামে জয়ী এক সফল হিরো। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে শিশুকালেই পিতামাতা হারিয়ে অশিক্ষার অন্ধকারে শূন্য হাতে জীবন সংগ্রাম শুরু এই মহামনীষীর।

জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো। আর এই কর্মই মানুষকে মানুষের মাঝে স্মরণীয় করে রাখে। দেশের মানুষ এখনো মনে রেখেছে দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া শিক্ষার আলোবঞ্চিত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহাকে তার কর্মের গুণে। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেন তার জীবন সংগ্রামের পথচলা। আমদের দেশে সামজিক কর্মকা-ে অনন্য অবদানের জন্য হাতেগোনা যে কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন তাদের মধ্যে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা অন্যতম। অথচ তার নিজ এলাকা মির্জাপুরবাসীসহ অনেকের কাছেই কষ্টদায়ক যে, জাতীয়ভাবে এই মহান ব্যক্তিকে এখনো স্মরণ করা হচ্ছে না। তবে আমরা কিন্তু আশাবাদী।

মাত্র সাত বৎসর বয়সে দারিদ্র্যতার জন্য টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় তার মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন ভবিষ্যতে তিনি হতদরিদ্র চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করবেন। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা দেবেন্দ্রে নাথ সাহা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দারিদ্র্যের কঠোর কশাঘাত ও সৎ মায়ের অবহেলা ও অনাদারে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকেন রণদা। অভাবের তাড়নায় মানুষের বাড়িতে খাবার চেয়েও খেয়েছেন তিনি। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য দিনমজুরের কাজ থেকে শুরু করে অনেক ধরনের কাজই তিনি করেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তিনি কলকাতা পাড়ি জমান। সেখানে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগদান করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্বগাথা ভূমিকার জন্য বিভিন্ন মহলে প্রশংসা অর্জন করেন। পরিচয় হয় জর্জ ভি’র সঙ্গে। তার মাধ্যমে তিনি রেলওয়ে বিভাগে টিটি হিসেবে চাকরি নেন। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি চাকরিটি হারান। ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতাতে ছোট আকারে লবণ ও কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসা থেকেই ধীরে ধীরে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। তিনি বেঙ্গল রিভার নামে একটি জাহাজ ক্রয় করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লাতে তিনটি পাওয়ার হাউস ক্রয় করেন। নারায়ণগঞ্জে জর্জ এন্ডারসন কোম্পানির পাটের বেল তৈরি করেন। পরবর্তীতে তিনি লেদার ব্যবসা শুরু করেন। এভাবে তিনি জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ এলাকা মির্জাপুরে ফিরে আসেন। সদা আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত আরপি সাহা ছেলেবেলার সংকল্পের কথা স্মরণ করে ১৯৩৮ সালে তিনি মির্জাপুর গ্রামের লৌহজং নদীর তীর ঘেঁষে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন; যা পরবর্তীতে ৭৫০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ‘কুমুদিনী হাসপাতালে’ রূপ নেয়। দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিজে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হলেও নারীশিক্ষার জন্য তিনি ১৯৪২ সালে মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতেশ্বরী হোমস। তাছাড়াও টাঙ্গাইলে কুমুদিনী কলেজ, মানিকগঞ্জে পিতার নামে দেবেন্দ্র নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ মির্জাপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। জীবন সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা পেয়ে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হলেও তিনি ভোগবিলাসে ব্যয় করেননি। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। তার জীবনের অর্জিত সব অর্থ তিনি উইল করে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল।

তিনি ছিলেন প্রখ্যাত লোক হিতৈষী মানবতাবাদী ও দানবীর। সংস্কৃতির দিকেও তার ছিল বড় ঝোঁক। তিনি প্রায়শই আনন্দ নিকেতনে আয়োজন করতেন যাত্রাপালাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। যাতে তিনি নিজেও অনেক সময় অভিনয় করতেন।

১৩৫০ বঙ্গাব্দের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় তিনি লঙ্গরখানা খুলেন। হাজার হাজার দরিদ্র লোক সেখানে প্রতিদিন খাবার গ্রহণ করত।

মহান এ ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ মে তার একমাত্র সক্ষম ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা রবিসহ তাকে এ দেশের দোসরদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ মেলেনি।

পরবর্তীতে তার একমাত্র পৌত্র রাজীব প্রসাদ সাহা কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে রণদা প্রসাদ সাহার অসমাপ্ত কাজগুলো শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মির্জাপুরে কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ, কুমুদিনী হ্যান্ডি ক্র্যাফট প্রতিষ্ঠা করেন।

আজ শুক্রবার উত্থান একাদশীতে তার ১২৩তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে মির্জাপুর গ্রামবাসী এবং কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা সভা, রণদার প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য, সঙ্গীত, রচনা প্রতিযোগিতা। সকাল ৭টায় রণদা প্রসাদ সাহার মির্জাপুরের গ্রামের বাড়িতে প্রার্থনা সভা এবং তার প্রতিকৃতিতে গ্রামবাসীর পুস্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু হবে। দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান চলবে।