• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১

ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর স্মৃতি বিজড়িত গান্ধী আশ্রম

ড. মিহির কুমার রায়

| ঢাকা , শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

image

এ নামটির সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত নই। তবে যারা মানবতাবাদী শান্তির অন্বেষণে মানুষের জন্য কাজ করে থাকেন যাদের সংখ্যা একেবারেই সীমিত তারাই এই নামটির সঙ্গে পরিচিত। তিনি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। যার জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় কালুপুর গ্রামে। যিনি তার পিতা গান্ধীয়ান প্রথম চৌধুরী ও মাতা আশালতা চৌধুরীর এগারো সন্তানের মধ্যে দশম। মিস শ্রী চৌধুরী চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ষাটের দশকে। তার পিতার মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে এই উপমহাদেশের শান্তিবাদী নেতা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত অন্বিকা কালীগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে (বর্তমানে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট) যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে মহাত্ম গান্ধী সেখানে উপস্থিত হয়ে (চবধপব গরংংরড়হ ড়ভ গধযধঃসধ এধহফযর) নামে একটি কর্মসূচির সূচনা করেন এবং গ্রামে গ্রামে মানুষকে শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থানের কথা বোঝতে শুরু করেন অহিংস দর্শনের ভিত্তিতে। তিনি ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জয়াগ (বর্তমানে সোনাইমুড়ি উপজেলায় অবস্থিত) আসলে সব স্তরের গ্রামবাসী তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। সেই সময়ে এলাকার স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শ্রী হেমন্ত কুমার ঘোষ তার সব সম্পত্তি এই এলাকার উন্নয়নের জন্য মাহাত্মা গান্ধীর হাতে সমর্পণ করেন এবং অম্বিকা কালীগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এর শুভ সূচনা হয় এ সম্পদের হাত ধরে। ফলে গান্ধী গ্রুপ যা পরে গান্ধী মিশন নামে আত্মপ্রকাশ করে। যার অফিস জয়াগে স্থানান্তরিত হয়। এই গান্ধী গ্রুপ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রামে গ্রামে কাজ করতে থাকে যা ১৯৪৭ এর ভারত বিভক্তির আগ পর্যন্ত চলতে থাকে সুন্দর ভাবেই। কিন্তু একদিকে ভারত বিভক্তি অন্যদিকে আততায়ীর হাতে মহাত্মা গান্ধীর নিহত হওয়ার পর কয়েক জন ব্যতীত গান্ধীর অনুসারীরা নোয়াখালী ত্যাগ করতে শুরু করেন এবং পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণ গান্ধীবাদীদের দুর্দিন নেমে আসে এবং একে একে সবাই কারাবরণ করতে থাকেন যা সারা পাকিস্তান আমলেই বহমান ছিল। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল তথা ভূমিদুস্য বলে খ্যাত এলাকাবাসী এই ট্রাস্টের জমি দখল করতে শুরু করলে এই কর্মসূচি চালিয়ে নেয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় এবং শান্তি মিশনের দলনেতা শ্রী চারু চন্দ্র চৌধুুরীকে জেলে আটক করা হয় দীর্ঘ সময় ধরে এই আশ্রমের কার্য্যক্রমের জন্য যা ছিল খুবই হৃদয়বিদারক।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রী চারু চৌধুরী কারাগার থেকে মুক্তি পায় এবং আশ্রমের কাজ নতুন উদ্যমে সংগঠিত করা শুরু করে যার মধ্যে ছিল দখল হয়ে যাওয়া জমিসহ অন্যান্য সম্পত্তি পুনরুদ্ধার যা ছিল খুবই কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। তারপর বাংলাদেশ সরকার ২ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে একটি গেজেট জারির মাধ্যমে এ কর্মসূচিকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়া যেখানে এই (অসনরশধ কধষরমধহমধ ঈযধৎরঃধনষব ঞৎঁংঃ) নাম পরিবর্তন করে (এধহফযর অংৎধস ঞৎঁংঃ) করা হয়। এই ট্রাস্টে কার্যক্রমের পরিচালনার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। তারপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির সনাতনী যে ভাবধারা ছিল যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্থানীয় ভাবে পুনর্বাসিত করা তা থেকে সরে এসে উন্নয়ন ভাবনায় (বস্তুগত ও আত্মীক) গ্রামবাসীদের সংযুক্ত করা। বর্তমানে এই ট্রাস্টের পরিধি নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত যার আওতায় রয়েছে উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যতীত গ্রাম উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প, তিনটি স্কুল, একটি চিকিৎসা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, তিনটি তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র ও দুটি হস্তচালিত তাঁত কেন্দ্র। শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ১৯৬০ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সংসার ত্যাগীদের সংগঠন চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘের যোগদানের মাধ্যমে মানবতার সেবায় নিয়োজিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় অবস্থান করণে এবং শরণার্র্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। ১৯৭৯ সালে শ্রীমতি চৌধুরী আবার গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে ফিরে আসেন এবং তৎকালীন সচিব শ্রী চারু চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন জীবনের সবটুকু সময়ে মৃতু্যুর আগ পর্যন্ত। তিনি জায়গে ট্রাস্টের ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক ভাবে অবস্থান করতেন এবং অফিস ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে মাঠ কার্যক্রমের প্রকল্পগুলোও দিকভাল করতেন। এই সময়ে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের কর্মসূচিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা প্রসার, গ্রামীণ জনগণের আয়বর্ধকমূলক কাজ, কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষ, কুটির শিল্প, আম্বর চরকার মাধ্যমে খদি কাপড় তৈরি, দেশব্যাপী গান্ধী বাদ নীতি ও আদর্শ প্রচার, কুমিল্লায় অভয় আশ্রমের উন্নয়ন, নির্যাতিত মানুষদের আইনি সহায়তা, জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা এবং গবেষণা প্রকাশনা।

আমি ২০০৭ সালে পরিবারসহ গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের কর্মসূচিগুলো দেখার জন্য গিয়েছিলাম যা এর আগে কখনও যাইনি। সেখানকার কর্মকর্তারা আমার পরিচায় জেনে আমাকে আদর আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং সেখানকার সচিব শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তখন সকাল ৮টা ৩০ মিঃ এবং আমার জন্য সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করা হলো তাদের অতিথিশালায় যা অত্যন্ত পরিপাটি। আমার কাছে মনে হলো সেখানকার প্রতিটি কর্মীই যেন একটি আদর্শ অনুসরণ করার মতো যা এর আগে কখনও দেখিনি। তারপর শ্রীমতি ঝর্ণা ধারার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথোপকথন শুরু হলো এবং তিনি জানতে চাইলেন আমার এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহের ব্যাকুলতা কেন। আমি উনাকে বলেছিলাম এমন একটি প্রতিষ্ঠানে আমি চাকরি করি যার প্রতিষ্ঠাতা গান্ধী দর্শনের অনুসারী ছিলেন এবং তার শিক্ষাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে দেখার জন্য এই আশ্রমের কার্যক্রম। তারপর আশ্রমের জাদুঘরে আসলাম যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালে শুধু শান্তির অহিংসার বাণী নিদর্শনস্বরূপ যা এই আশ্রমের মাঝখানে তিনটা রুম অবস্থিত। এ জাদুঘরে মহাত্মা গান্ধীর ১২০টির মতো ফটো, বিভিন্ন চিঠিপত্র, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ও অন্যান্য ডকুমেন্ট রয়েছে। গৌতম পাল এই জাদুঘরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি তৈরি করেছিলেন যা এ ঘরের একটি ব্যতিক্রম আকর্ষণ। তাছাড়াও গান্ধীজীর নোয়াখালীতে অবস্থান কালে তার ব্যবহৃত কাপড় চোপড় রয়েছে এবং আরও আছে তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করার পর সৎকারের ছাই ভষ্ম। তারপর এই ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প যেমন দুগ্ধবতী গাভী পালার খামার, মৎস্য খামার, আম্বর চরকা, তাঁতের কাপড় তৈরির কারখানা, শস্য খামার উৎপাদন ইত্যাদি দেখলাম। আরও জানতে পারলাম ট্রাস্টেও চতুর্দিকে গ্রামগুলোতে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকল্প এবং আশ্রমে তাদের আয় বর্ধনমূলক কাছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারপর শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী এ আশ্রমের পরিচালনায় বেশ কিছু সম্যসার কথা তুলে ধরলেন যার মধ্যে কতগুলো স্থানীয়, কতগুলো নীতিনির্ধারণী ও কতগুলো প্রশাসনিক। তখন এ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য এবং উনার মৃতুর পর তদীয় তনয় দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আরও বললেন, স্থানীয় জমিজমা সংক্রান্ত বেশ কিছু বিরোধ রয়েছে যা মোকাবিলা করার জন্য একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ দরকার। তাছাড়াও কুমিল্লা শহরে অবস্থিত গান্ধী আশ্রমের বেশ সম্পদ রয়েছে যেগুলো রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেগুলো রক্ষাকল্পে আমি কিভাবে তাদের সাহ্যয্য করতে পারি।

বর্তমানে গান্ধী আশ্রমের জায়গাগুলোতে ছাত্রাবাস তৈরি করে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে যারা এ সম্পদ রক্ষা করার প্রধান শক্তি। তারপর আমার জন্য মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করা হলো পুকুরের মাছ, সবজি ইত্যাদি দিয়ে দোতলায় অফিস হলের পাশে সেখানে সব স্টাফসহ শ্রী মতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী অংশগ্রহণ করলেন যা একটি বিশেষ ধরনের আয়োজন। সার্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনায় মনে হলো, এই আশ্রমের কর্মী যাদের সিংহভাগ মহিলা বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত ভিন্ন জগতের মানুষ। যাদের মনে চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই শুধু দান করে যাওয়া ছাড়া। এখন আমাদের ভোগবাদী সমাজের যেখানে এককেন্দ্রিকতাই মুখ্য বিষয় সেখানে আদর্শিক শান্তির বাণী দিয়ে অহিংস আন্দোলনে শরিক করানো মানুষ কোথা থেকে আসবে যা এই ধরনের প্রতিষ্ঠান চালানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ কি নয়? আমি শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী কে প্রশ্ন করলাম গান্ধীবাদী অহিংসনীতির অনুসারী আপনার অবর্তমানে সেই জায়গায় কে প্রতিস্থাপন হবেন তা নিয়ে আপনার ভাবনা কি? উত্তর দিলেন বড় কঠিন প্রশ্ন এবং এর উত্তর সময়ই বলে দেবে এই কারনে যে গৃহত্যাগী সংসার ত্যাগী যে শুধু বৌদ্ধ ভিক্ষু কিংবা রামকৃষ্ণ মিশনকেন্দ্রিক কিছু ফিলানহ্রৃপিক সংগঠনের দেখা যায় যা এই আশ্রমের কতটুকু সফল হবে? আমার কথাই সত্যি হলো এবং এই খ্যাতিনামা গান্ধীয়ান শান্তিকর্মী গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ২৭ জুন ২০১৯ তারিখে বৃহস্পতিবার সকালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের পরিচালক নব কুমার রাহা শ্রী মতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর ইচ্ছামতো তার মরদেহ গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। এই মহিয়সী রমণী তার জীবন দশায় আন্তর্জাতিক বাজাজ পুরস্কার ১৯৯৮, শান্তি পুরস্কার-ওল্ড ওয়েস্ট বেরি বিশ্ববিদ্যালয় আমেরিকা-২০০০, অনন্যা-২০০১, দুর্বার নেটওয়ার্ক ২০০৩, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট বিভাগ হতে ২০০৬, সাদা মনের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি ২০০৭, শ্রী চৈতন্য পুরস্কার-২০১০, কীর্তিমতি নারী ২০১০, রনবীর সিংহ গান্ধী স্মৃতি পান্তিসদ ভাবনা পুরস্কার-২০১১, ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার-২০১৩, বেগম রোকেয়া পুরস্কার ২০১৩, একুশে পদক ২০১৫ ও ডেইলি স্টার কর্তৃক সম্মাননা ২০১৬ পদক লাভ করেন।

তার মৃত্যুতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

[লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি ও সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি, ঢাকা}