• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ ১৪৪০

চাই মানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

খন্দকার মুনতাসীর মামুন

| ঢাকা , রোববার, ১১ আগস্ট ২০১৯

image

আমরা সবাই দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে চাই। শুধু মানুষ কেন, অন্যান্য জীবজন্তু, পশুপাখিও সুুুুস্থ পরিবেশ খুঁজে বেড়ায় বসবাস করার জন্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কারোরই কাম্য নয়; কিন্তু আদতেই কি আমরা সুস্থ পরিবেশে বাস করছি? প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকা। ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রতিদিন ১৪১৮ জন মানুষ বাড়ছে। বছরে যুক্ত হচ্ছে গড়ে পাঁচ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ। এত বেশি সংখ্যক মানুষ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা। কীভাবে চলছে ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা?

সাধারণত কোন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় সে এলাকার সব বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও অপসারণ। যে জায়গায় বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যে স্তূপাকারে জমা করা হয় তাকে বলা হয় ল্যান্ডফিল সাইট। একটি আদর্শ ল্যান্ডফিল সাইট নির্মাণে বেশকিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। ১৯৯১ সালে Environment Protection Agency (EPA), ল্যান্ডফিল সাইটের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশকিছু নীতিমালা প্রদান করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, একটি ল্যান্ডফিল সাইটের ৩০ মিটার দূরত্বের মধ্যে কোন জলাশয় থাকা যাবে না, ১৬০ মিটার দূরত্বের মধ্যে কোন খাবার পানির নলকূপ থাকা যাবে না এবং ৬৫ মিটার দূরত্বে কোন ঘরবাড়ি, স্কুল ও পার্ক থাকা যাবে না। যদিও ঢাকা শহরের দুটি ল্যান্ডফিল সাইট (মাতুয়াইল ও আমিনবাজার) এর একটিও এই নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হয়নি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে এরিয়া মেথড ও ট্রেঞ্চ মেথড। এরিয়া মেথড এ মাটির উপরে আবর্জনার স্তূপ জমা করে রাখা হয়। প্রতিদিন জমা করার পর এর ওপর মাটির আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। অন্যদিকে, ট্রেঞ্চ পদ্ধতিতে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে বর্জ্য জমা করে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ঢাকা শহরের ল্যান্ডফিল সাইটগুলোতে এরিয়া মেথড প্রয়োগ করা হলেও দিন শেষে এটাকে মাটি দিয়ে ঢাকার বদলে উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখা হয়।

বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা মতে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডাম্পিং হয় ৩ হাজার ৮শ’ মেট্রিক টন। অপর এক বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, প্রতিদিন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপাদিত হয় ৫ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। এছাড়া মেডিকেলসহ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে ১০৫০ এবং রাস্তাঘাট থেকে ৪শ’ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। প্রতিদিন নগরীতে মাথাপিছু উৎপাদিত হয় ৫৬০ গ্রাম বর্জ্য। উৎপাদিত বর্জ্যরে মধ্যে আছে প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ, ধাতু এবং জৈব বর্জ্য।

২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয় অধিকতর নাগরিকসেবা দেয়ার জন্য। কিন্তু সাত বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মান ভালো নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নেয়া বিভিন্ন প্রকল্পও রীতিমতো ধুঁকছে। ঢাকা শহরের প্রতি ১ হাজার স্থায়ী নাগরিকের জন্য একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। এই কর্মীরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য এনে ফেলছেন। অধিকাংশই রাস্তার ওপর, খোলামেলা, যেনতেনভাবে। পথচারী আর আশপাশের মানুষের জন্য যা দুঃসহ দুর্ভোগের কারণ। কাভার্ড ভ্যান থাকলেও, কোন কোন ক্ষেত্রে খোলা ট্রাকে করে এই বর্জ্য নেয়া হয় নির্ধারিত ল্যান্ডফিল্ডে। যেখানেও নেই নিরাপদ ব্যবস্থাপনা।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রধান সড়কের পাশে, আবাসিক এলাকার সড়কগুলোতে, এমনকি অভিজাত এলাকার সড়কে বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে যে, সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে সহাবস্থানেই থাকে বিভিন্ন রকম প্রাণনাশী মেডিক্যাল বর্জ্য। কাক, কুকুর, ইঁদুর, মশা, মাছি ও অন্যান্য প্রাণী এইসব বর্জ্য থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার খায়। এইসব প্রাণী আবার জীবাণু নিয়ে জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্নস্থানে বিচরণ করে। প্রায়শ অনেক দরিদ্র শিশুকে দেখা যায় যে মেডিক্যাল বর্জ্যরে কিছু উপকরণ যেমন সুই, স্যালাইনের বোতল ইত্যাদি খেলনার অনুষঙ্গ মনে করে বর্জ্য থেকে তুলে নিয়ে খেলা করে। এর ফলে সুস্থমানুষের মধ্যে এসব বিপজ্জনক উপকরণ থেকে জটিল এমন কি প্রাণঘাতী রোগের সঞ্চার হতে শুরু করে।

প্রতিদিন ঝাড়ু দেয়ার কথা থাকলেও পরিষ্কার করা হয় না রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক। নিয়মিত সরানো হয় না সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানের ময়লাও। তাই রাস্তার মোড়ে মোড়ে জমছে ময়লার স্তূপ। সবই যেন মশার আঁতুড়ঘর। সিটি করপোরেশনের মাঠকর্মীরা বলছেন, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটে এই দশা। সংকট সমাধানে তৎপরতা নেই নগর প্রশাসনের।

বর্তমানে বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতে খোলা বা কাঁচা বাজার ব্যবস্থা বিলীন হয়ে গেলেও, ঢাকা শহরের সর্বত্র এমনকি তথাকথিত অভিজাত এলাকা যথা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরায় কাঁচাবাজার বসতে দেখা যায়। সেই বাজারের সামনে ডাস্টবিন অথবা রাস্তায় বাজারের বর্জ্য জমা হয়ে পড়ে থাকা দৈনন্দিন চিত্র। এই সব কাঁচাবাজারের মধ্যে অহরহই পশুপাখি জবাই হয়ে থাকে। এই সব পশুপাখির রক্ত ও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে বাজারের সামনে ডাস্টবিন অথবা রাস্তায়। এর আশপাশেই আবার অনেক খাবারের দোকান থাকে। এইসব খাদ্য যে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই খাবারের মাধ্যমে যে মানুষ নানা রোগ-জীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে না তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

মেডিক্যাল বর্জ্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্যরে বাইরেও আছে গৃহস্থালির বর্জ্য। সেটিকে যদি বাদও দেই, তাহলে শুধু মেডিক্যাল বর্জ্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্যই আমাদের পরিবেশকে ভয়ানক দূষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাতে জীবন হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটময়।

বিশ্বব্যাপী আধুনিক শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরকে স্বাস্থ্যকর ও পরিছন্ন রাখা হয়। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে সিটি করপোরেশন অথবা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হওয়া উচিত না। আমরা যারা শহরে বাস করছি, তারা কিন্তু নাগরিকসেবা পাওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনকে কর দিচ্ছি। এর বিনিময়ে আমরা মানসম্পন্ন সেবা চাইতেই পারি। আমরা এ আশা করতেই পারি যে, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের জন্যস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের পর পশুর বর্জ্য সরিয়ে ফেলার কাজটা নিয়ে উভয় সিটি করপোরেশনের বেশ তোড়জোড় চলে এবং কাজটি ঠিকঠাক মতো সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তারা নগরবাসীর বাহবা নেয়ার সুযোগ খোঁজে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কোন বিশেষ উপলক্ষের বিষয় নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হয় নিয়মিতভাবে, প্রতিদিন।

সব সময় শহর পরিচ্ছন্ন না হওয়ার জন্য স্বল্প বাজেট ও জনবলের অভাবকে দায়ী করা হয়। তাই যদি হবে তাহলে প্রথমে করণীয় হচ্ছে সিটি করপোরেশনের বাজেট ও লোকবল বাড়ানো। আর সেটা করা যদি সম্ভব না হয় তাহলে বেসরকারিভাবে বাসাবাড়ি থেকে যেভাবে টাকার বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহ করা হচ্ছে, একইভাবে রাস্তাঘাট, অলিগলি পরিষ্কারের কাজটিও বেসরকারিভাবে করা যেতে পারে। ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ফির বিনিময়ে এটা করা যেতেই পারে। শহরটা তো অন্তত পরিষ্কার থাকবে। তবে এই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার অছিলায় যাতে আবার কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য না হয়, সেটাও দেখতে হবে।

তবে নগর অপরিচ্ছন্ন থাকার সব দায় সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর না দিয়ে নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। আমরা নগরবাসী সবাই কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি? আমরা নোংরা করি বলেই নগরটা নোংরা হয়। আমাদের অনেকের স্বভাব হচ্ছে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা। আইসক্রিম খেয়ে বা চিপস খেয়ে প্যাকেটটা আমরা অনেকে রাস্তাতেই ফেলি। ক’টা টাকা বাঁচানোর জন্য বাসার বর্জ্য ময়লা সংগ্রহকারীদের কাছে না দিয়ে রাস্তার মোড়ে ফেলছি। আমাদের এসব বাজে স্বভাবের বদল না হলে শহর নোংরাই থাকবে। উন্নত দেশগুলোতে বাসাবাড়ি বা রাস্তাঘাট নোংরা করলে মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানা করা হয়। আমাদের দেশেও সে রকম জরিমানার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তবেই যদি স্বভাব বদলায়।

লেখক : সাংবাদিক

Suva.muntasir@gmail.com