• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১ ফাল্গুন ১৪২৪, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

চলছে রাজনীতির বর্ণহীন অধ্যায়

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঘটে গেল রাজনীতির অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করল আদালত। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গত ওয়ান ইলেভেনের সরকার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। প্রায় এক যুগ মামলাটির কার্যক্রম চলার পর নিম্ন আদালত রায় প্রদান করল। তবে আরও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে মামলাটির রায়টি কার্যকর করার জন্য। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে তাই রায়টির যথার্থতা নির্ণীত হতে আরও সময় লাগবে। বিচারিক কার্যক্রমের নানা অসুবিধার করণে অনেক মামলা বিচারধীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য মামলা দিনের পর দিন বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে থাকায় সাধারণ বিচার প্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। খালেদা জিয়ার মামলাটিরও দীর্ঘদিন বিচারিক কার্য সম্পন্ন হওয়ার পর নিম্ন আদালতের একটি বিশেষ এজলাসে রায়টি ঘোষিত হয়। আদালত কারাদ- ঘোষণা করার পর, বিষয়টি নিয়ে দেশের সকল মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মামলাটির রায় এবং পুরো মামলাটিকে রাজনৈতিককরণ করার চেষ্টা মামলা দায়ের করার পর থেকে শুরু হয়েছে। আর রাজনীতিকরণ চেষ্টার ক্রীড়নক শুধু বিএনপি নয় এর ক্রীড়নকের ভূমিকায় সরকারি দলকেও দেখা যায়। বিএনপি দায়ী করছেন এর পেছনে সরকারি দলের হাত রয়েছে আর সরকারি দল বলছে তাদের হাত নেই, এ ধরনের তর্কের কারণে বিষয়টি সম্পর্কে জনগণের মাঝে রাজনৈতিকদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণের জন্ম নিলো। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগ স্বাধীন। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিচার বিভাগ যে স্বাধীন সেই বিষয়টি কতটা মানেন বা মানলেন তা বোঝা যায় এই রায়কে কেন্দ্র করে তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে যুক্তি তর্কের মধ্যমে। আসলে দেশের প্রধান দুই দলই বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করার চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের আচরণে বিচার বিভাগকেও রাজনৈতিক দলের কাতারে ফেলানোর একটি প্রয়াস চলেছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা জাতির জন্য একটি অশনি সংকেত। রায়ের পর আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতারা নিজেদের যে রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই সে বিষয়ে সাফাই গাইতে শুরু করলেন। তারা বলতে লাগলেন যে, এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের হাত নেই। এ ধরনের কথাটা যেভাবেই যে কোন রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারা বলেন না কেন এতে করে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। বেগম খালেদা জিয়ার মামলার মুল বিষয়টি হলো খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে অর্থ আত্মসাৎ করে, আর এটা ছিল দায়ের করা মামলাটির মূল অভিযোগ। তাই এই অভিযোগটা থেকে মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মুক্ত করাটাই শ্রেয়। মামলাটির মুল উপাদানকে আড়াল করার জন্য দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়, তাহলে বুঝতে হবে দোষারোপের রাজনীতির পেছনে অন্য উদ্দেশ রয়েছে।

এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের সরকারের আমলে তাহলে আওয়ামী লীগের কিছু নেতৃবৃন্দ উল্লিখিত মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করে নিজেদের কাঁধে দোষ নিতে চান কেন? দেশের নির্বাহী বিভাগ পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আর বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বাধীন বিভাগ এই বিভাগটিকে বার বার হীন প্রচেষ্টায় নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন করার যে প্রচেষ্টা রয়েছে তাতে গনতান্ত্রিক রাজনীতি অনুশীলনের পথটাও রুদ্ধ হবে অচিরে। এই রায়ের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল, সাধারণ জনগণ এ ধরনের ধাপ্পবাজি রাজনীতির সঙ্গে নেই। বিএনপি বর্তমান সরকারকে এই মামলার রায়ের প্রভাবক হিসাবে আখ্যা দিয়ে জনগণকে কাছে টানার চেষ্টা করেছেন তবে তাদের চেষ্টাটা ব্যর্থ হয়েছে। দেশের জনগণ খুব ভালো করে জানেন যে, মামলাটি এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত। মামলার রায়টি যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদার প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়েছে এ রকম কোন বিষয় সৃষ্টি করে জনগণের মনে তেমন একটা দাগ কাটতে পারেনি বিএনপি। তাছাড়া আরেকটি বিষয় উল্লিখ করার মতো তাহলো, রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করার রাজনৈতিক শক্তি এবং কমিটমেন্ট বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে নেই। যেমনটি দেখা গেছে এরশাদের রায়ের পর জাতীয় পার্টিতে। কারণ এই দল দুটির জন্ম সামরিক ব্যারাকে। যারা এই দল দুটিতে রাজনীতি করেন তারাও সকলেই দলভুক্ত হয়েছিলেন ক্ষমতার মোহে। দল দুটির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখার চাহিদাকে কেন্দ্র করে। গণমানুষের কল্যাণ বা চাহিদার নিরিখে এই রাজনৈতিক দল দুটির সৃষ্টি হয় নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্ম গণমানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার আদায়কে কেন্দ্র করে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে এদেশকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত করেছেন। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক কর্মকা- বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সঙ্গে অসাদৃশ্যপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটি দায়ের করেছে ওয়ান ইলেভেনের সরকার, তাই এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকতে হবে কেন? আওয়ামী লীগের সৃষ্টি আর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা গণভিত্তি ছিল। আজও লাখ লাখ মানুষের মনে রয়েছে বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর সেই দলটি যদি বিচার বিভাগ কর্তৃক কোন রায়কে কেন্দ্র করে রাস্তায় অবস্থান নেয় তা অনেকটাই দৃষ্টি কটু। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র এখন দেশটি কোন পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ না যে, তার বিচার বিভাগকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে? বর্তমানে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের ভুঁইফোড় নেতাদের কার্যক্রমে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলটি নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছে জনসম্মুখে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো ছিল মানুষের চাহিদাভিত্তিক তা পূরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করতেন। তাই ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলার মানুষের আকাক্সক্ষা বঙ্গবন্ধু বুঝতেন আর বঙ্গবন্ধু কি কর্মসূচি নিতে পারেন তা সাধারণ মানুষও অনুধাবন করতেন পারতেন। দেশের বর্তমানের রাজনৈতিক কর্মসূচি কতটা জনবান্ধব? রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো জনবান্ধব হীন হওয়ার কারণে বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম তরুণরা আজ রাজনীতি বিমুখ। ১৯৯০ এর স্বৈরাচারের পতন ঘটায় এদেশের তরুণরা। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছে তরুণরা আজ কেন এই তরুণরা রাজনীতি বিমুখ? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইজ বুকে দেখা যায়, সিংহভাগ তরুণ তার প্রোফাইলে লিখে রেখেছেন Not interested to politics। তরুণরা রাজনীতি বিমুখ হওয়ার কারণে দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী আর অর্থ বিত্তবানদের হাতে ফলে রাজনৈতিক মাঠে অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে গণতন্ত্র চর্চা হয়। আর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি অনুশীলন না হওয়ার ফলে ভবিষ্যৎ জাতিকে ভয়াবহ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ যদি তরুণরা রাজনীতি অনুশীলন না করে তাহলে ভবিষ্যতে দেশের হাল কারা ধরবে। দিন দিন গণতন্ত্রের যে বারোটা বাজছে তা কিভাবে রোধ করা হবে? তরুণদের রাজনীতিতে অনাসক্ত থাকার কারণ হিসাবে অনেক বামপন্থি নেতারা বলেন এটা পুঁজিবাদের কারসাজি। এই কথা বলে কি বাম নেতারা তাদের দায় এড়াতে পারেন। কারণ political party is the great learning institution is the politics সুতরাং বাম নেতারা যদি নিজেদেরকে রাজনৈতিক নেতা বা political activist মনে করেন তাহলে এ কথাটা বলতে পারেন না। পুঁজিবাদের ঘৃণ্য থাবা থেকে তরুণদের বের করে আনার দায়িত্ব বাম নেতাদের, তারা যদি উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করেন তাহলে বিষয়টা অনেকটা এই প্রবাদটির মতো হয়, ‘বাবাকে মেরেছিল আর আমি লুকিয়ে ছিলাম খড়ের গাদার নিচে’। দেশের বাম ডান দক্ষিণ কোন পন্থিরাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক অঙ্গন তৈরি করছেন না, সব পন্থিরাই নিজেদের ভাগ্য পরির্বতনের কাজে ব্যস্ত আর রাজনীতিটা হয়ে গেছে তাদের কাছে অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম। সুতরাং এই রাজনীতি দিয়ে তরুণদেরকে রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট করা যাবে না।

বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মতো রাজনৈতিক দলের উদ্ভব সম্পর্কে আমাদের সকলের জানা তাই তাদের রাজনৈতিক ভিতটা খুবই ভঙ্গুর। তবে অনেকেই বলবেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে বিএনপির আন্দোলনের কথা মূলত ওই আন্দোলনটার মূল কলকাঠি ছিল জামায়াতের হাতে। জামায়াতের নেতারা যুদ্ধাপরাধের মতো জঘন্য অপরাধে দন্ডিত হওয়ার পর তার প্রতিবাদ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা রাস্তায় নেমে মিছিল করেছিল। বিএনপির বর্তমান প্রধান খালেদা জিয়া বিষয়টিতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতার ভূমিকাটা নানা প্রশ্নবাণে জর্জড়িত, অথচ বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম সেনাশাসক জিয়ার চেয়ে অনেকটা গণতান্ত্রিক ছিলেন। যদিও জিয়ার আদর্শিক দলের কান্ডারী তিনি তার পরও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে তার অবদান রয়েছে।

দেশের রাজনীতিতে মাসলম্যান এবং ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ ঘটে দুই সেনাশাসকের আমলে। তবে রাজনীতিবিদরা যদি ওই দুই সেনাশাসকের সহযোগিতা না করতেন তাহলে কি সেনাশাসকরা মাসলম্যান আর অর্থ দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারতো?

দেশের রাজনীতিতে একটা সময় ছিল, সেই সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জনসভার তারিখ দিন সময় বিষয়টি টিনের চোঙা দিয়ে গ্রামময় প্রচার করতো। আর তখন দেখা যেত নির্ধারিত দিনে মানুষ পায়ে হেঁটে মিছিল করতে করতে জনসভায় যোগ দিত। আজকাল ডিজিটাল ব্যানার ফেস্টুন, লাউড স্পিকার, নানা প্রক্রিয়ায় জনসভার তারিখ সময় ঘোষণা করা হয়, তারপরও দেখা যায় টাকা দিয়ে বাস ভাড়া করে জনসভার জন্য লোকজনকে আনা হয়।

কেন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো? দেশের জনসাধারণ বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ডাকে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তৎকালীন বিশ্বের সেরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল রাজনৈতিক ভাবে, আজ সেই জনসাধারণ রাজনীতি বিমুখ। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার আন্দোলনের আদর্শ এবং লক্ষ্য আজও বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতিটি সরকার মুক্তিযুদ্ধ এবং তার আদর্শের কথা বলে কিন্তু তা কেউ বাস্তবায়ন করেন না। দেশের জনগণও এই বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে, দেশে রাজনীতির নামে এক ধরনের ধাপ্পাবাজি শুরু হয়েছে। আর এই ধাপ্পাবাজি করে বামডান দক্ষিণ-পশ্চিম সব নেতারাই নিজেদের মূলধনকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করছেন। তাই রাজনীতি সাধারণ জনগণের যাদের আমজনতা বলা হয় তাদের অংশগ্রহণ দিন দিনই কমে আসছে। বিভিন্ন সময়কে অধ্যায় হিসেবে বিবেচনায় নিলে বর্তমানের রাজনীতির অঙ্গনটি এক বর্ণহীন অধ্যায়ে পরিণত হয়ে গেছে, এর মূল কারণ ডান বাম দক্ষিণ যে কোন পন্থি বলেন না কেন সবারই বৈশিষ্ট্য এক- শুধু বাকপটুতাটা একটু ভিন্ন ধাঁচের।

সুতরাং দেশের রাজনীতিকে বর্ণময় করতে হলে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীনতার আদর্শকে লালন করে রাজনীতি করতে হবে।

[লেখক : কলামিস্ট]