• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ২০ জিলকদ ১৪৪১

গণপরিবহনে ভোগান্তি : পাথর নিক্ষেপ, নারী নিগ্রহ দুষ্টচক্র

আবু আফজাল সালেহ

| ঢাকা , সোমবার, ১৩ মে ২০১৯

গণপরিবহনে বেড়ে গেছে ভোগান্তি। ট্রেনে বেড়ে গেছে পাথর নিক্ষেপ। বাসে নারীর প্রতি সহিংসতা জাতি হিসেবে লজ্জাই দিচ্ছে! টিকিট কালোবাজারি তো আছেই। ঈদ উপলক্ষে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা নাগালের বাইরে যায়। দালালির চক্করে টিকিট পাওয়া যায় না; বেশি টাকায় কিনতে হয়। অনেক সময়ে নিম্নমানের বাসে উন্নতবাসের ভাড়া নেয়া হয়। রাস্তায় দীর্ঘ যানজট লেগেই থাকে। ফেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় যাত্রী ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।

বেশ কিছুদিন থেকে রেলে ‘পাথর ছোড়া’ বেড়ে গেছে। আরামদায়ক ও জনপ্রিয় রেলসেবাকে বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা কি না দেখা দরকার। আরও দেখা দরকার অন্য বেসরকারি গণপরিবহণের ব্যক্তিরা জড়িত কি না! পাথর নিক্ষেপের হার ঈদের সামনে বেড়ে যাওয়া কিন্তু সন্দেহের চিন্তা মাথায় আসে। আবার রেলের কালোবাজারির দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর কৌশল কি না- সেটাও দেখা দরকার। এ ব্যাপারে আাসল ঘটনা বের করার জন্য আন্তরিক ও নিবিড় তদন্ত করা দরকার।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে পাথর ছুড়ে ২,০০০ বেশি জানালা-দরজা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। রেলপথে নিরাপত্তাহীনতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাথর ছোড়ার ঝুঁকিপ্রবণ হিসেবে রেলের পূর্বাঞ্চলে ৫টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলার ৬৫টি স্থান চিহ্নিত করেছিল রেল বিভাগ। এ সূত্রে এসব স্থানে রেলে পাথর ছোড়ার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দু-চারজনকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা কোন অসম্ভব কঠিন কাজ নয়। ট্রেনে ছোড়া পাথরে রক্তাক্ত হয়ে গত কয়েক বছরে প্রীতি দাশ, রেলের পরিদর্শক বায়েজিদ শিকদারসহ বেশকিছু মানুষ মারা গেলেও নির্মম হত্যকান্ডের সঙ্গে জড়িতরা শাস্তির বাইরেই রয়ে গেছে। ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশ আলোচিত হলেও তা বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ কাজ করছে মূলত রাতে নেশাগ্রস্ত কেউ আর দিনে শিশু-কিশোররা। শিশু-কিশোররা মূলত খেলার ছলেই এ নির্মম কাজে অংশ নিচ্ছে। রেললাইনের দু’পাশে কিছু অংশে যে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা ১৪৪ ধারা জারি থাকে, তা সবাইকে জানাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ফলে অপরাধীকে কী শাস্তি ভোগ করতে হবে, তাও জনগণকে বিস্তারিত জানাতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষকসহ এলাকার গণ্যমান্য সবাইকে এ কাজে ভূমিকা রাখতে হবে। শিশু-কিশোরদের জানাতে হবে তাদের কৃত-অপকর্মের কারণে মুহূর্তের মধ্যে একজন ব্যক্তি চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা আরও বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। ট্রেনে ইট-পাথর নিক্ষেপ রোধে কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে দুই হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ২০ জেলার ওপর দিয়ে চলার সময় ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলায়। পাথর ছোড়ার বেশি ঘটনা ঘটছে গাজীপুরের টঙ্গী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে গঙ্গাসাগর, কুমিল্লার ময়নামতি ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলি থেকে সীতাকুন্ডু অংশে। এছাড়া, নরসিংদী, পুবাইল, গফরগাঁও, গৌরিপুর, মোহনগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, ফতুল্লা, লালমনিরহাট, পীরগঞ্জ, গাইবান্ধা, বুনারপাতা, সোনাতলা, আজিমনগর, খুলনা, পার্বতীপুর, জামতৈল কোট চাঁদপুর, নোয়াপাড়া, দৌলতপুর, রংপুর, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, ষোলশহর, ফৌজদারহাট, সীতাকুন্ডু, চৌমুহনী, কুমিল্লার শশীদল, ইমামবাড়ি, কসবা, পাঘাচং, ভাতশালা, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কাউনিয়া, বামনডাঙ্গা এলাকায়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মানুষকে হত্যা ও আহত করার বিষয়টি অমানবিক। বছরের পর বছর থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কারণ প্রতিটা রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশে অপরাধীরা ওঁৎ পেতে থাকে। স্টেশন থেকেই নানা অপরাধের সৃষ্টি হয়। এছাড়া নিরাপদ সড়ক ভেবে রেলপথকে অনেক অপরাধী নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছে। এদের মধ্যে রেলওয়ের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত রয়েছেন বলে শোনা যায়। ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য নিরাপদে ট্রেন ভ্রমণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ঢিল ছোড়া দুষ্কৃতকারীদের এমন দৌরাত্ম্যের পরও রেলওয়ের পক্ষ থেকে এই অপরাধ বন্ধে জোরালো কোন উদ্যোগ নেই। একের পর এক দুর্বৃত্তদের ছোড়া ঢিলের আঘাতে ট্রেনের যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হওয়ার পরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা পর্যন্ত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ সাধারণ ডায়েরি করেই দায়িত্ব শেষ করে। বিশেষজ্ঞরা এ অপরাধ বন্ধে জরিমানাসহ অন্যান্য শাস্তি বাড়িয়ে বিদ্যমান আইন সংশোধনের সুপারিশ করছেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনের ১২৭-১২৮ এবং ১৩০ ধারায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শুধু সামান্য আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে এই আইনে পাথর নিক্ষেপে অভিযুক্তের অভিভাবককেই জরিমানা শোধ করতে হবে। তবে পাথর নিক্ষেপে কারও মৃত্যু হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে বলে জানা নেই! এটাও ভাবনার খোরাক প্রসারিত করে! ভেবে দেখতে হবে; গভীরে যেতে হবে। আইনে যা আছে সেটার মাধ্যমে মামলাও হয় কম। কার্যকর হয় আরও কম। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থাকে কি না এবং থাকলে থাকে কেন? স্বার্থের দ্বন্দ্ব কি না? মানে সমস্যা জিইয়ে রাখার প্রবণতা কি নাÑ সেটাও দেখতে হবে। আসলে আমাদের কোন কিছুর ওপর বিশ্বাস কম, আস্থাও কম। নৈতিক অবক্ষয়ের শেষপ্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে।

বেশকিছু কারণে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ভবঘুরে ও রেললাইনের আশপাশে মাদকাসক্তরা ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে। স্টপেজ ছাড়া গাড়ি থামানোর জন্যও দুর্বৃত্তরা এ কাজ করে থাকে। এর বাইরে সরকারি মালামাল নষ্ট করার মনমানসিকতা ও মাদক বা চোরাচালান পণ্য কিছু চিহ্নিত স্থানে নামাতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটতে পারে। রেলে পাথর নিক্ষেপে শিশু-কিশোরেরা জড়িত বলে জানা যায়। বস্তি এলাকায় এ ঘটনা বেশি ঘটছে। কারণ বস্তি এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে বসতঘর। ঘটনাপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করতে হবে। প্রচারণা করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। যেসব স্থান দিয়ে ট্রেন চলাচল করে, সেখানকার জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন রেল কর্মকর্তারা।

আর একটা জিনিস ভাবিয়ে তুলছে। সেটা হচ্ছে বাসে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ। খুন পর্যন্ত গড়াচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয়ের নিম্নপর্যায়ে আমরা! ড্রাইভার আর স্টাফদের দ্বারা বা তাদের সহযোগিতায় বেশিরভাগ এমন ঘটনা ঘটছে বলে মিডিয়া মাধ্যম হতে জানা যায়। বাংলাদেশে নারী যাত্রীদের অনেকেই বলছেন, রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে পরিবহন সংশ্লিষ্ট লোকজন কিংবা পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতা অন্যদিকে সামাজিক অসচেতনতার কারণে দিন দিন নির্যাতন ও নিগ্রহের ঘটনা বাড়ছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই। নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

বাসে খোদ পরিবহন সংশ্লিষ্টরাই অনেক সময় ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ান। বেসরকারি সংগঠন অ্যাকশনএইডের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে দিনের বেলাতেই যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানারকম হেনস্তার শিকার হন নারী যাত্রীদের একটা বড় অংশ। তাদের জরিপে, বাসে পুরুষ যাত্রীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ৪২ শতাংশ নারী যাত্রী। এছাড়া পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩ শতাংশ নারী যাত্রী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাতে নারী যাত্রীদের হয়রানি, ধর্ষণ এমনকি হত্যার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে ভীতি বাড়ছে। ফলে দিনের বেলা নারীদের স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেলেও রাতে ভ্রমণ অনেকটাই কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভারতের দিল্লিতে নির্ভয়া হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের ঘটনার পর সেখানে নারীরা যে কতটা অনিরাপদ তা আলোচিত হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশে রূপা ও সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের শাহীনুর আক্তার তানিয়াদের ঘটনাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এখানেও নির্জন রাস্তায় একাকী নারী সমানভাবে অনিরাপদ। প্রতিদিনই ঘটছে অমানবিক ঘটনা। খুনের ঘটনা একেবারে কম না হলেও তানিয়া আর রূপাদের মতো পরিণতি হচ্ছে অনেককে। প্রকাশ হচ্ছে কম। সমাজে আরও নিগ্রহ হওয়ার ভয়ে অনেক নারী অভিযোগ করেন না! কারণ অভিযোগ করলেও প্রতিকার পান না! পরে নিজ বলয়েই অপমানিত হন নিজেই। এক্ষেত্রে অনেক সময় পাশের পুরুষদেরও সহযোগিতা পাওয়া যায় না।

মহিলাদের সংরক্ষিত সিটও দখল হয়ে যায়। পুরুষেরা বসে থাকে সেখানে; মহিলা দাঁড়িয়ে থাকে পাশে। বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানী ও আশেপাশে এরকম প্রায়ই দেখা যায়। নারী যাত্রীরা অন্য নারী-পুরুষ যাত্রীদের কাছ থেকেও মানসিক সাপোর্ট পায় না। পাবলিক পরিবহনে রাতে নারীযাত্রীদের ভ্রমণ বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমাদের অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। এ থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন করতে হবে। শিশুদের পারিবারিকভাবে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। সেব ধর্মেই অবক্ষয়ের বিষয়ে কঠোর। অতএব ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালন এসব অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে পারে। গণপরিবহনের স্টাফদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। নিয়োগের সময় চারিত্রিক দিকটা অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ঈদের আগে-পরে নির্বিঘ্ন হোক পথযাত্রা। কারণ এ সময়ে নানারকম সংকট বেশি সৃষ্টি হয় পরিবহন সেক্টরে। রেলের অ্যাপস ঠিকমতো কাজ করুক। কাজ না করার পেছনে সিন্ডিকেটের ভয় না আসুক। পাথর ছোড়া শূন্যে নামুক। মহিলাসহ বাসের সব যাত্রী নিরাপদে চলাচল করুক। আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। সবজায়গার দুষ্টুচক্র ভাঙতে হবে।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট]

abuafzalsaleh@gmail.com