• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১ কার্তিক ১৪২৫, ৫ সফর ১৪৪০

খালেদা জিয়ার কারাদন্ড এবং আরো কিছু কথা

মোহাম্মদ শাহজাহান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

অবশেষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। একই মামলায় বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। একই সাথে প্রত্যেক আসামিকে অর্থদন্ড দেয়া হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। পুরান ঢাকার বকশীবাজারের কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে দুপুর ২টা ৩২ মিনিটে এই রায় ঘোষণা করা হয়। বেগম জিয়ার সামাজিক মর্যাদা, বয়স ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে অন্যদের চেয়ে তাকে কম সাজা দেয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন বিচারক। রায় ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাজা হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে বিশেষ বার্তা বয়ে আনতে পারে। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আইনি প্রক্রিয়ায় এই প্রথম কোনো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগে সাজা হলো। এই রায়ের প্রভাব চলমান রাজনীতি, আগামী নির্বাচন এবং সামাজিকভাবে দেশের রাজনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে বলে অনেকে মনে করেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বছরে বিএনপি নেত্রীর বিচার করেছে, তা বুমেরাং হতে পারে। আওয়ামী লীগসহ সকল মহল মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, বেগম জিয়ার সাজা হলে বিএনপি আগের মতো বা তার চেয়ে বেশি উদ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করবে। আর সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু হলে তা চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল সরকার ও সরকারি দল। কিন্তু রায়ের পর বিএনপির নরম কর্মসূচি সরকারি পক্ষের সব হিসাব-নিকাশ ভন্ডুল করে দিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। বিএনপি যদি কোনোভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে আগামী নির্বাচনে এর সুদূরপ্রসারী প্রবাব পড়বে বলে অনেকের বিশ্বাস।

বেগম জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া এ মামলায় অন্য সাজাপ্রাপ্তরা হচ্ছেন- মাগুরা থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জে. জিয়ার ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ বর্তমানে জেলে রয়েছেন। তারেক রহমান সাড়ে ৯ বছর ধরে লন্ডনে এবং কামাল সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান পলাতক রয়েছেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক এ মামলাটি দায়ের করে। পরে এ মামলায় মাতা-পুত্রকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

৮ ফেব্রুয়ারি ১টা ৪১ মিনিটে আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। ২টা ১১ মিনিটে বিচারক ড. আখতারুজ্জামান আদালত কক্ষে প্রবেশ করে বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজনকে বের হয়ে যেতে বলেন। এর পর বিচারক বলেন, মামলার রায়টি ৬৩২ পৃষ্ঠার। তবে তিনি এর সারসংক্ষেপ পড়ে শোনাবেন। ১৫ মিনিটে রায় পড়া শেষ করে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক। রায়ে বলা হয়, এতিমের জন্য সৌদি আরব থেকে আসা দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কুয়েতের আমিরের দেয়া এ অনুদান বেআইনি ব্যবহারের দায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের এবং তারেক রহমানসহ বাকি আসামিদের ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। টাকা রাখতে ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল কিনা, তা ব্যক্তিগত একাউন্টে রাখা হয়েছিল কিনা, আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিনা- এমনসব মোট ১১টি বিষয় বিবেচনা করে রায় দেয় আদালত। রায়ে বলা হয়, ক্ষমতায় থেকে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের’ দায়ে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় সাজা দেয়া হয়েছে। আত্মসাতের সমপরিমাণ অর্থ দুই কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় খালেদা জিয়া ব্যতীত পাঁচ আসামিকে। জরিমানা অনাদায়ে কতদিন কারাবাস করতে হবে, তা বলা হয়নি সংক্ষিপ্ত রায়ে। ঘিয়ে রঙের শিপন শাড়ি ও ক্রিম রঙা চাদর পরা বেগম জিয়া চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে রায় শোনেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী দুদকের প্রধান কৌসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘যাবজ্জীবন শাস্তি চেয়েছিলাম। সাজা কম হয়েছে। তারপরও আমরা খুশি।’ দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘বিএনপি এ মামলাকে সাজানো, বানোয়াট বললেও মামলা হয়েছিল ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়া আসামি বলে এ মামলায় বিশেষ কোনো বিষয় নেই। আইন সবার জন্য সমান।’ আসামি পক্ষের আইনজীবী ও বিএনপি নেতারা বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার পাননি।’ আইনজীবী ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এ রায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার। খালেদা জিয়াকে কোন অপরাধে সাজা দেয়া হয়েছে, তা রায়ে বলা হয়নি।’ প্রধান আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান বলেন, ‘আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর জানা যাবে- কিসের ভিত্তিতে সাজা দেয়া হয়েছে। একজন বৃদ্ধ নারীকে কেন সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়েছে, তা বোধগম্য নয়।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এক সাংবাদ সম্মেলনে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অভিহিত করে এর প্রতিবাদে ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভের ডাক দেন। মহাসচিব তাদের কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উল্লেখ করে বলেন, ‘বেগম জিয়া স্পষ্ট করে বলে গেছেন রায় তাঁর বিপক্ষে গেলেও কোনো প্রকার হঠকারী কর্মসূচি দেয়া যাবে না। ফখরুল বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে এই গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সরকার রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য ভুয়া ও মিথ্যা মামলা ও নথি তৈরি করে তাকে সাজা দিয়েছে, যা এদেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা মনে করি, এ মামলার রায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত করবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা চলে যাবে। এই রায়কে কেন্দ্র করে সরকার গত ৩ দিন ধরে এক যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে বারবার ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করছে।’ সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এটা কোনো ফৌজদারি মামলা নয়, এটা একটি রাজনৈতিক মামলা। আইন ও সংবিধানকে লঙ্ঘন করে যে রায় দেয়া হয়েছে, এটাকে একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখছি।’ এ মামলার আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না- আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ বলেন, ‘এটা আইনমন্ত্রীর ব্যাপার নয়। এটা আদালতের ব্যাপার। খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি পারবেন না, সেটা কি আইনমন্ত্রী ঠিক করবেন? এটা তো তার বিষয় নয়। প্রয়োজন পড়লে এটা উচ্চ আদালতে গড়াবে। তখন সুপ্রিম কোর্টই সিদ্ধান্ত দেবে তিনি পারবেন কি পারবেন না। আমাদের মতে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

মামলার রায় সম্পর্কে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করতেই পারেন। এ মামলা নিশ্চিতভাবেই উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়াবে। চূড়ান্ত বিচারের পরেই বুঝা যাবে, তাদের অভিযোগ কতটুকু সত্য। আসলে খালেদা জিয়ার এই মামলার সাথে ইতিমধ্যেই উচ্চ আদালত সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। দীর্ঘ ১০ বছরের মাথায় এ মামলার রায় হয়েছে। বিএনপির আইনজীবীরা এ মামলায় বিচারিক আদালতের বাইরে অন্তত ১৩ বার উচ্চ আদালতে গেছেন। এটাতো স্বীকার করতেই হবে, এ মামলার বিচার বিলম্বিত করার জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন আসামির আইনজীবীরা। ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় বিএনপি আইনজীবীরা বিচারক পরিবর্তনের আবেদন করলে একবার, দু’বার নয়- তিনবার তিনজন বিচারক পরিবর্তন করে দেয় উচ্চ আদালত। চতুর্থবার বিচারক পরিবর্তনের আবেদন করলে উচ্চ আদালত রাজি হয়নি। দ্রুত বিচার আদালতের মামলায় ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। ১০ বছরে ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে ২৬১ কর্মদিবসে এই মামলাটি নিষ্পন্ন হয়েছে। বিএনপির আইনজীবীরা ১৫৫ বার সময় চেয়েছেন এবং শুধু আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিতর্ক করেছেন ২৮ দিন। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বেগম জিয়ার শাসনামলে ১৯৯৩ সালের ১ এপ্রিল এই মামলার বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিচারালয়ে যোগ দিয়েছেন। বিচারের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে আরো কয়েকটি ধাপ রয়েছে। বিএনপি নেতারা যদি নিশ্চিত হন বেগম জিয়াকে মিথ্যা মামলায় জেলে দেয়া হয়েছে আর সেটা যদি উচ্চ আদালতে প্রমাণিত হয়, তাহলে ক্ষমতাসীনদের আগামীদিনে এর জন্য চরম খেসারত দিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়াকে হেলাফেলা ভাবার কোনো কারণ নেই। গত তিন যুগ ধরে তিনি তার দলের নেতৃত্বে রয়েছেন।

খালেদা জিয়ার বর্তমান দুরবস্থার দায় কার? সম্রাট নেপোলিয়ন শেষ জীবনে বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বলেছেন, ঊাবৎু সধহ রং ৎবংঢ়ড়হংরনষব ভড়ৎ যরং ড়হি ভধষষ. অর্থাৎ ‘প্রত্যেক মানুষ তার পতনের জন্য দায়ী।’ এক সময়ের খুবই জননন্দিত নেত্রীর আজকের দুর্দশার জন্য তিনিই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। এটা ঠিক, ক্ষমতার প্রথম টার্মে (১৯৯১-১৯৯৬) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ ভালোভাবেই সরকার পরিচালনা করেছেন। একজন অরাজনৈতিক গৃহবধূর পক্ষে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি দেশকে রীতিমতো নরকে পরিণত করে। হাওয়া ভবনে তারেক রহমান সমান্তরাল প্রশাসন চালু করেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হিসেবে আবির্ভূত হন তারেক রহমান। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, কিবরিয়া হত্যা থেকে শুরু করে ঐ সময়ে দেশে সংঘটিত হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, দুর্নীতিসহ সকল অপকর্মের দায়ভার তারেক রহমানের। সোজা কথায়, তারেক রহমান দেশকে আইয়ামে জাহেলের বর্বর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যান। জিয়া, এরশাদ, খালেদা ও তারেক এই চার কুচক্রী স্বাধীন বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত একটিবারের জন্য সরকারি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়নি। খুনিচক্র ও তাদের দোসররা বঙ্গবন্ধুর সাথে স্বাধীন বাংলাদেশকেও হত্যা করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আবার ফিরে পেয়েছে। চার কুচক্রীর হত্যা করা গণতন্ত্রকে শেখ হাসিনাই বারবার পুনরুদ্ধার করেছেন।

ভুল করলে সেই ভুলের খেসারত দিতে হয়। ঐতিহাসিকরা একদিন লিখবেন, তারেক রহমানের উত্থান থেকেই খালেদা জিয়ার রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া তিনবার ক্ষমতায় এসে একবারও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেননি। তারেক, সাকা চৌধুরীদের পরামর্শে খালেদা জিয়া ওয়ান-ইলেভেন অনিবার্য করে তোলেন। বিএনপি দ্বিতীয় টার্মে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারেক রহমান দেশ-বিদেশে দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হন। বেগম জিয়ারা আদৌ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় বেগম জিয়া তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদকে ক্ষমতা গ্রহণের অনুরোধ জানান। যেসব কারণে খালেদা জিয়া আজকের দুরবস্থায় পতিত হয়েছেন, সেগুলো হচ্ছে- অন্ধ পুত্রস্নেহ, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের দুটি ব্যর্থ সন্ত্রাসী আন্দোলন, স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে রাজনীতি করা এবং তার ও তারেক রহমানের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘ হবে। ১১ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিক লিখেছে, দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে নাশকতার ঘটনায় দায়ের তিন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। একই দিন আরেকটি দৈনিক লিখেছে, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ৩৬ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এদিকে আরেকটি দুর্নীতি মামলার রায়ও খুব সহসাই দেয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাজেই সাজাপ্রাপ্ত মামলায় জামিন হলেই তিনি সাথে সাথে মুক্তি পাচ্ছেন না।

বিএনপি তাহলে এখন কি করবে? ৮ তারিখে সাজা হওয়ার পর বিএনপি দুদিন বিক্ষোভ পালন করেছে। আরো ৩ দিনের নরম কর্মসূচি দিয়েছে দলটি। বিএনপি মহাসচিব বলছেন, ‘খালেদা জিয়া হঠকারী আন্দোলনে যেতে নিষেধ করে গেছেন।’ আসলে বর্তমান অবস্থায় বিএনপির হার্ড লাইনে যাওয়ার শক্তি-সামর্থ্য, নেতৃত্ব কোনোটাই নেই। খালেদা-তারেকের ভুল রাজনীতি দলটিকে যেমন শেষ করেছে- তেমনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বও খতম হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকতে হলে এবং আগামী দিনে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে হলে নরম কর্মসূচি দিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করতে হবে এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে। খালেদা জিয়াকে সরকার গ্রেফতার করেনি। আদালতের রায়ে দন্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে গেছেন। নেত্রীর মুক্তির জন্য আইনি পথেই এগুতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজ হলো তারেক নামের ‘রাজনৈতিক দৈত্য’কে সামনে নিয়ে বিএনপি কোনোভাবেই অগ্রসর হতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে তারেক রহমান কোনো রাজনীতিবিদ নন। তারেক রহমান দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের প্রতীক। তিনি দন্ডিত পলাতক আসামি। রাজনীতি করতে হলে জেল-জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতে হবে। বিএনপির স্বার্থে, এদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থে অবিলম্বে তারেকের পরিবর্তে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য একজনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে হবে। এটা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত যে, তারেকের নেতৃত্বে কোনোভাবেই দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যাবে না। বেগম জিয়াকে মনে রাখতে হবে, তিনি তার দলের নেতাদের বিশ্বাস না করলে- নেতারা তাকে বিশ্বাস করবেন কেন? তারেক রহমানের মতো একজন দুষ্টগ্রহকে সামনে নিয়ে বিএনপি কস্মিনকালেও এগিয়ে যেতে পারবে না। আর কারাবন্দী বেগম জিয়ার প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পায় এমন কোনো কাজ ও বক্তব্যের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমান নির্জন পরিবেশ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেগম জিয়াকে স্থানান্তর করা উচিত। কারাবন্দী নেত্রীর আইনি ও মানবিক সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে কোনোভাবেই এই মেসেজ দেয়া যাবে না যে, খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। সবশেষে গাফ্ফার চৌধুরীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এই লেখার ইতি টানতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দন্ড যেমন দেশে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি, বেগম জিয়ার কারাদন্ডও তেমনই কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। এই বাস্তবতা সামনে রেখে বিএনপি নেতারা যদি ঠান্ডা মাথায় তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করেন, ঐক্যবদ্ধ থাকেন, হিংসা ও উত্তেজনা সৃষ্টির পথে পা না বাড়ান, তা থেকে উদ্ধার হওয়ার পথ খুঁজে পাবেন। অন্যথায় বেগম জিয়ার কারাদন্ডের ইস্যুটিকে নিয়ে দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে তারা সফল হবেন না। তারা দলের সর্বনাশ করবেন, দেশেরও ক্ষতি করবেন।’ (ইত্তেফাক, ১১/২/১৮)

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮।

[লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা]

bandhu.ch77@yahoo.com