• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ১৮ শাবান ১৪৪০

খালেদা জিয়ার উত্থান এবং

মোহাম্মদ শাহজাহান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

বিএনপি চেয়ারপারসন দেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি। গত বছরের এ দিনে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাকে মুক্ত করতে রাজপথে আন্দোলন ও আইনি লড়াই দুটিতেই ব্যর্থ হয় বিএনপি। দলের হাইকমান্ডের অভিমত- রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা দেয়া হয়েছে। তারা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, আইনি যুদ্ধে তাদের নেত্রীকে মুক্ত করা যাবে না। আর এ জন্যই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। বিএনপি নেতারা আশা করেছিলেন, জনগণ ভোট দিতে পারলে তারা জয়ী হবেন। বিজয়ী হলে তাদের নেত্রী মুক্তিলাভ করবেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। বরং নির্বাচনের পর দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে এসেছে। বিএনপি নেতারা নিশ্চিত হয়েছেন, আইনের সাধারণ প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্ত হওয়ার কোন পথ নেই। তাকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা। বিএনপির একজন আইনজীবী নেতা একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা এজন্য কঠিন যে, বর্তমান সরকার সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তাকে মুক্ত করা যাবে না।’

অনেক সমস্যার মধ্যে বিএনপির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দলের কোন একক নেতা নেই। ১৯৮২ সাল থেকে গত তিন যুগ ধরে খালেদা জিয়া দলকে পরিচালনা করে আসছেন। তার নেতৃত্ব নিয়ে কেউ কোন দিন প্রশ্ন তোলেনি বা প্রশ্ন তোলার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোন নেতাও দলে নেই বা ছিল না। অবশ্য নেত্রী জেলে যাওয়ার আগেই জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানকে নেতৃত্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রেখে যান। তাতেও কোন সমস্যা ছিল না, যদি তিনি দেশে থেকে দলকে পরিচালনা করতেন। সাড়ে ১০ বছর ধরে তিনি লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর দৃশ্যত দলে কোন নেতৃত্ব সংকট নেই। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দল পরিচালনা করছেন। গত এক বছরে দলে কোন ভাঙন দেখা দেয়নি। কোন নেতা দল ছেড়ে যায়নি। তবে খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পর বিএনপি নেতারা স্বীকার করছেন, দলনেত্রীকে মুক্ত করতে না পারাটা তাদের ব্যর্থতা।

পুরনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র বন্দী খালেদা জিয়া। গত সেপ্টেম্বরে তার ৭৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। শরীর অসুস্থ। একা চলার শারীরিক শক্তি তার নেই। হুইল চেয়ারে তাকে আদালতে বা হাসপাতালে যেতে হয়। দুর্নীতি, নাশকতা, মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু মামলায় বিচার কাজ চলছে, কয়েকটি উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত আছে। আবার কয়েকটি মামলা রয়েছে তদন্ত পর্যায়ে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদন্ড হয়। এরপর হাইকোর্টে আপিলের রায়ে ৫ বছরের কারাদন্ড বেড়ে ১০ বছর করা হয়। তাছাড়া জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে বিচারিক আদালত ৭ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া গত বছর (২০১৮) ১৯ নভেম্বর আপিল করেন, যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬ মামলার মধ্যে ৪টি মামলা দায়ের করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বাকি ৩২টি মামলা গত ১০ বছরে দায়ের করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলা হচ্ছে ৫টি। তাছাড়া মানহানির ৪টি, নাশকতার ১৬টি, ৩টি হত্যা, মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার জন্য ২টি, রাষ্ট্রদ্রোহ ১টি, মিথ্যা জন্মদিন উদযাপনের ১টি, সাবেক নৌমন্ত্রীর ওপর বোমা হামলার ১টি, জাতীয় পতাকা অবমাননার ১টি, ড্যান্ডি ডাইংয়ের অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন ১টি এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মালিকানা নিয়ে ১টি দেওয়ানি মামলা রয়েছে বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে।

হুইল চেয়ারে হাঁটাচলা করা, তিন মামলায় অভিযুক্ত, ২ মামলায় দন্ডিত, বিভিন্ন রোগে অসুস্থ এক সময়ের প্রবল ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মনোবল এখনও অটুট রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘বর্তমানে শারীরিকভাবে তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পুরনো রোগগুলো বেড়েছে। পা ফুলে গেছে, চোখে প্রচন্ড ব্যথা।’ একজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক বলেছেন, ‘অসুস্থ খালেদা জিয়া চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর বদ্ধ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকতে হচ্ছে তাকে। সুচিকিৎসা থেকে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন।’ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, ‘মুক্তি পেতে হলে তাকে ৪ মামলায় জামিন পেতে হবে। জিয়া অরফানেজ মামলায় হাইকোর্টের ১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করা হলে জামিনের আবেদন করা হবে। অন্যদিকে চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টে করা আপিলের জামিন আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লার হত্যা মামলা ও মানহানির একটি মামলায় ম্যাডামের এখনও জামিন হয়নি। এসব মামলায় ১৬টি অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। ১১টি মামলার বিচার কাজ উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে। বাকি সব মামলার মধ্যে কোনটি তদন্তের পর্যায়ে আছে আবার কোনটিতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে।

এদিকে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ২৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছে আদালত। ৭ ফেব্রুয়ারি কারা অধিদফতরের মাঠে স্থাপিত আদালত-৩ এ খালেদা জিয়াকে হাজির করা হয়। মামলার শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, মামলার জব্দ তালিকার কাগজপত্র তারা এখনও হাতে পাননি। ওই কাগজপত্র ছাড়া তারা কিভাবে শুনানি করবেন। বিচারক বলেন, শিগগিরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তারা পেয়ে যাবেন। এ সময় দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, ‘মামলার এজাহার হওয়ার পর দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা কি কি কারণে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় জড়িত। ওই মামলার এজাহারে নাম ছিল ১৩ জনের। তদন্তে ২৪ জনের নাম ওঠে আসে। ইতিমধ্যে ৬ জন মারা গেছেন। সব আসামি পরস্পরের সহযোগিতায় দুর্নীতি করেছেন। সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলাগুলো মূলত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দায়ের করা হয়েছে। ঢাকার মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা ও নাশকতার কারণে ১৩টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে খালেদা জিয়া আহূত তথাকথিত হরতাল-অবরোধের সময় বাসে আগুন, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, মানুষ হত্যাসহ বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় ১০টি মামলায় অভিযোগপত্র দায়ের করেছে পুলিশ। এগুলোর মধ্যে ২টি যাত্রাবাড়ী থানায় এবং অন্য ৮টি দারুস সালাম থানায়।

সব মিলিয়ে বর্তমান সময়ে খালেদা জিয়া তার তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে কঠিন, করুণ ও দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করছেন। মানুষের জীবনে উত্থান-পতন অস্বাভাবিক কিছু নয়। রাজনীতিতে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে আসছে। ‘সকালে আমির বিকেলে ফকির’ এমন উদাহরণের অভাব নেই। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন এবং সুদিন-দুর্দিনের ঘটনাগুলো সবার চোখের সামনেই ঘটেছে। ১৯৬৫ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগ ও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে ৫ দশকের বেশি সময় ধরে এদেশের রাজনীতির অনেক কিছুই আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। হঠাৎ করে নিতান্তই অপরিচিত একজন গৃহবধূ কিভাবে দেশের একজন জনপ্রিয় নেত্রীতে পরিণত হলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে ২-৩ বার প্রধানমন্ত্রী হলেন এবং কিভাবে আজকের করুণ দশায় পতিত হলেন, তা এদেশের মানুষ দেখেছেন। কোন রাজনৈতিক পরিবারে খালেদা জিয়ার জন্ম হয়নি বা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য থেকে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হননি। খালেদা জিয়া হচ্ছেন এ দেশের প্রথম স্বৈর সেনাশাসক অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনতাইকারী জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী।

জিয়াউর রহমান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আরও অনেকের সঙ্গে তিনি বীর-উত্তম খেতাব লাভ করেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। তখন জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সবচেয়ে কাছের মানুষ সেনাপ্রধান জিয়াকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো হয়। গত ৪৪ বছরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জিয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন অনুপ্রবেশকারী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিদ্রোহী সেনা সদস্যদের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত অবৈধ রাষ্ট্রপতি জিয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে যদ্দুর সম্ভব ধ্বংস এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে এদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। ফাঁসিতে কর্নেল তাহের হত্যা মামলার পুনঃবিচারকালে উচ্চ আদালত জে. জিয়াকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে রায় দিয়েছেন। জিয়া হত্যার পর এরশাদ ও খালেদা জিয়ার পূর্বসূরির অনুসরণে স্বাধীনতাবিরোধীদেরই লালন-পালন, সংরক্ষণ ও যদ্দুর সম্ভব পুরস্কৃত করেছেন। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের আড়াই দশকের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ছিনতাই করেছেন।

স্বৈরশাসক জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন দলের সুবিধাবাদী, রাজনৈতিকভাবে অসৎ, নীতি-আদর্শহীনদের নিয়ে বিএনপি গঠন করা হয়। ১৯৮১ সালে জিয়া হত্যার পর বিএনপির বহু নেতা দ্বিতীয় অবৈধ শাসক এরশাদের সঙ্গে হাত মেলান। বিএনপির ওই কঠিন দুঃসময়ে ১৯৮২ সালে খালেদা জিয়াকে বিএনপির নেতৃত্বে আনা হয়। ১৯৮১ সালে স্বদেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। অবশেষে দুই নেত্রী ঐক্যবদ্ধ হন এবং নব্বইয়ের ডিসেম্বরে এরশাদের পতন হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়ী হলে ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বেগম জিয়া ৫ বছর মোটামুটি ভালোভাবেই সরকার পরিচালনা করেন। ১০ বছর পর লতিফুর রহমানের কারচুপির নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে নিয়ে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া পুনরায় সরকার গঠন করেন। এ সময় স্বাধীনতাবিরোধী নিজামী ও মুজাহিদকে মন্ত্রী বানান ম্যাডাম। ২০০৮-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। খালেদা জিয়া বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হন।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। নির্বাচন প্রতিহত করতে হরতাল ও আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীরা রাজপথে জড়ো হয়। বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় একতরফা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের বছর খানেক আগে দুর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে কারাবন্দী হন খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে জয়-পরাজয় থাকবেই। কিন্তু বিএনপি এবং এ দলের নেত্রী এমন করুণ দশায় পতিত হলেন কেন? খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ৫টি করে আসনে এবং ২০০৮ সালে ৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি এ পর্যন্ত কোন নির্বাচনে পরাজিত হননি। তার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই বিএনপি দু’বার জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। তিনি এ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। দলে তার সমকক্ষ বা তার মুখোমুখি কথা বলার মতো দ্বিতীয় কোন নেতা নেই। এক সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি দু’বার প্রধানমন্ত্রী, দুবার সংসদের বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। তিন যুগ ধরে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন।

কথায় আছে, প্রত্যেক মানুষ তার পতনের জন্য নিজেই দায়ী। খালেদা জিয়ার আজকের করুণ পরিণতির দায়ভার একান্তভাবেই তার নিজের। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করা। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা এবং রাষ্ট্রের ও জনগণের সম্পদ বিনষ্ট করা। ২০১৫ সালে অবরোধের নামে ৩ মাস যেভাবে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হয়েছে, তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। মূলত ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ও এরপরের ২টি সন্ত্রাসী আন্দোলন খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নামের রাজনৈতিক দলটিকে শেষ করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে নির্বাচনে গেলে দল বিজয়ী না হলেও খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে মন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করতেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলীয় নেতাকে বলা হয় ‘ছায়া প্রধানমন্ত্রী’। খালেদা জিয়ার দুটি সন্ত্রাসী আন্দোলনের পর সরকার বিএনপিকে চেপে ধরে। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে, সত্য-মিথ্যা হাজার হাজার মামলা করা হয়। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপির এমন কোন নেতা নেই যার নামে ২-৪টি মামলা নেই। মামলার কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা ঘরছাড়া হয়ে যায়। আর এ জন্যই বিএনপি আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে পারছে না। পালিয়ে থেকে জেলে গিয়ে বা দেশ ছেড়ে কোনভাবে জীবন বাঁচানো যায়, আন্দোলন করা যায় না।

খালেদা জিয়া যদি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন না করতেন এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আন্দোলনের নামে যদি কয়েকশ’ মানুষ হত্যা ও রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংস না হতো তিনি আজও অন্তত বিরোধী দলের নেতা থাকতেন। তার নামে হয়তো মামলা হতো না জেলেও যেতে হতো না। তার অন্য ভুল হলো পুত্রকে উত্তরসূরি বানানো। তারেক রহমানের ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক ভাবমূর্তি অনুজ্জ্বল। তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। দলের বড় বড় নেতারা তাকে নেতা হিসেবে কোনভাবেই মানতে পারছেন না। নেতা হলে ঝুঁকি নিতে হবে। একজন পলাতক আসামি, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত একজন বিতর্কিত ব্যক্তি এমন একটি বড় দলের নেতা হতে পারেন না। তাছাড়া বিএনপি আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। হামলার পর বিএনপি পৌনে দু’বছর ক্ষমতায় ছিল। ওই সময় গ্রহণযোগ্য তদন্তের পরিবর্তে মামলার মোড় ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দেয়া হয় তৈরি করা হয় জজ মিয়া কাহিনী। রায়ে তারেক রহমানসহ ওই সময়কার পদস্থ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের কয়েকজনের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে। কাজেই গ্রেনেড হামলা মামলার গ্রহণযোগ্য তদন্ত না হওয়ার দায়ভার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার ওপরই বর্তায়। বেগম জিয়ার জীবনের আরেকটি ঘৃণ্য কাজ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবস ১৫ আগস্ট জাতির শোকের দিনে উল্লাস করার জন্য তিনি নিজের জন্মদিন পরিবর্তন করেছেন। আরও এমন কিছু ভুল তিনি করেছেন, যা এ স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়।

তবে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। আশা আছে বলেই মানুষ বেঁচে আছে। কবি বলেছেন, ‘সংসার সমুদ্র তরঙ্গের খেলা- আশা তার একমাত্র ভেলা।’ পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ‘কঠিন দুঃসময়েও খালেদা জিয়ার মনোবল চাঙ্গা আছে।’ ভুলে গেলে চলবে না, কারও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সুখের পর দুঃখ এবং দুঃখের পর সুখ আসে। খালেদা জিয়া বর্তমান কঠিন সময় পার করে আবারও স্বমহিমায় জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসনে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন।

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

[লেখক : সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক]

bandhu.ch77@yahoo.com