• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১১ ফল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউল সানি ১৪৪১

কিশোর-কিশোরীদের অবাধ্যতা ও অভিভাবকদের করণীয়

আলম শামস

| ঢাকা , শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৯

দশম শ্রেণীর ছাত্র রকি। প্রায় রাতেই ঘরে ফিরতে দেরি করে। মাঝে মাঝে রাতে বাসায় আসে না। রাজধানীর মাদারটেকের রকির মা ঘরে না ফেরার কারণ জানতে চাইলে রকি বলে, ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ক্লাসের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। রাত বেড়ে যাওয়ায় আর বাসায় ফিরিনি, এতে টেনশনের কী আছে? আমি অবুঝ শিশু নাকি, হারিয়ে যাব?

মা বলেন, তোর বাবা দেশে থাকেন না। তুই আমার একমাত্র সন্তান, তোর জন্য টেনশন হবে না তো কার জন্য হবে? লোকমুখে শুনি তুই নাকি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাস আর আড্ডা মারিস, মেয়েরা সামনে দিয়ে গেলে শিশ মারিস। এসব কথা শুনতে শুনতে আর ভালো লাগে না। আমি শেষ বারের মতো বলছি, আর যদি কোনো অভিযোগ শুনি তবে তুই আমার মরা মুখ দেখবি।

কলেজ পড়ুয়া কিশোরী পিংকি। প্রায় দেরি করে ঘরে ফিরে। বিভিন্ন অজুহাতে সময়-অসময় ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কলেজ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, রাত জেগে টিভি দেখে, চাইনিজ খাওয়া যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে পিংকির প্রায় দিনের রুটিন। বাবা-মায়ের আদেশ-নিষেধ মানতে চায় না। গাজীপুর জেলার টঙ্গী কলেজ রোড এলাকায় থাকে পিংকি। মা জানতে চাইলে বিরক্তির সুরে পিংকি বলে, আমি কী ছোট খুকি, যে ভালো-মন্দ বুঝব না? এখন সময় পাল্টিয়েছে। নিজেকে সময়োপযোগী করতে না পারলে আমি পিছিয়ে যাব।

এসব তর্ক শুধু পিংকি আর রকিদের ঘরেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের অধিকাংশ ঘরেরই প্রতিচ্ছবি যেন এটি। শিশুদের, বিশেষ করে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রায়ই এমন অবাদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। টিনেজ বয়সী এসব ছেলেমেয়ের এমন আচরণ সংশোধন করতে আদর-সোহাগ ও মমতা মাখানো শাসনের কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. একেএম আমিরুল মোরশেদ খসরু বলেন, ইদানীং অভিভাবকদের বলতে শোনা যায়, টিনেজ সন্তানেরা বাবা-মায়ের কথা শুনছে না। ইচ্ছেমতো চলছে, ঘুরছে। মন যা চায় তাই করছে, ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য বিবেচনা করছে না। না বুঝে বিভিন্ন অন্যায়, অপরাধ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের এ অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। অপরাধের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে এই কিশোর-কিশোরীদের জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।

সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মা-বাবারই। এ বয়সে তারা ভুল করতেই পারে। ভুল করাটাই স্বাভাবিক তাদের জন্য। তাদের প্রতি তাই সুনজর দেয়া অভিভাবকদের অবশ্য কর্তব্য। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা কী করে, কী দেখে, কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মিশে, কীভাবে সময় কাটায়, সবক্ষেত্রে মা-বাবার সুচারু দৃষ্টি রাখা একান্ত প্রয়োজন। একটি ভুলে তাদের জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে-এ কথা মা-বাবার স্মরণ রাখতে হবে প্রতিমুহূর্তে।

মাদকের অবাধ বিস্তারের ফলে যুবসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণরা আজ বিপথগামী। মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে প্রশাসনের কঠোর তৎপরতা অত্যন্ত জরুরি। সন্তানের বিপথগামিতার জন্য শিক্ষক এবং অভিভাবকরাও কম দায়ী নন। মাতা-পিতা সন্তানের ঠিকমতো খোঁজখবর রাখলে ও সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে তার জন্য সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারলে, সন্তান কখনো অন্যায় পথে পা বাড়াতে পারে না। সন্তানের প্রতি অতিমাত্রায় শাসন অথবা আদর কোনটাই সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কারণ অতিআদর ও অতিশাসনের ফলে ছেলেমেয়েরা বখে যেতে পারে। তাই বাবা-মাকে সন্তানের শাসক না হয়ে বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানরা যখন হীনমন্যতায় ভোগে, কিংবা একাকীত্বে ভুগে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখনই তারা বিপথগামিতার পথে পা বাড়ায়। তাই অভিভাবকগণ যতই কর্মব্যস্ত থাকুক না কেন, সন্তানের একাকীত্ব দূর করতে তাদের সময় দিতেই হবে। সন্তানকে ভালোবাসার বন্ধনে আগলে রাখতে হবে। সন্তানদের ছোটখাটো ভুলগুলো শুধরে দিয়ে মার্জনার চোখে দেখতে হবে। তাহলে আর তারা অন্যায় পথে পা বাড়াবে না। অপরাধপ্রবণ সব কাজ থেকে পরিত্রাণে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে মহান ব্যক্তিদের আদর্শে সন্তানদের পরিচালিত হতে উৎসাহিত করতে হবে। বড়দের সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে শেখাতে হবে। পিতা-মাকেও সৎ-নীতিবান হতে হবে। কারণ বাবা-মাকে দেখেই সন্তান শেখে।

সন্তানের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে মা-বাবাকে ছেলেমেয়ের জীবন চলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ শিক্ষা এবং রুটিন তৈরি করে দিতে হবে। সন্তান রুটিন মতো চলছে কি না, তার খোঁজ রাখতে হবে। সন্তান প্রতিদিন স্কুল-কলেজে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে খবর নিতে হবে। সন্তান কাদের সঙ্গে মিশছে, বন্ধুরা কোন পরিবারের বা কোন পরিবেশের, অভিভাবকের অবশ্যই এ বিষয়ে নজর রাখতে হবে। অবসর সময় সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে খোঁজখবর রাখতে হবে মা-বাবাকেই। তার মোবাইল, ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে কী কী ডাউনলোড করা আছে, পরখ করা জরুরি। সে কোন সাইটে ঢোকে, অভিভাবকের তারও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সাইবার ক্যাফেও গিয়ে কী কাজ করছে, মাঝে মধ্যে সেটাও খেয়াল করা প্রয়োজন। সন্তান নেশায় আসক্ত কি না অথবা নেশার প্রতি ঝুঁকে পড়ছে কিনা, তা খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান যখন খেলতে যায়, কোন ধরনের খেলা সে খেলছে, কাদের সঙ্গে খেলছে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তন এবং শারীরিক চাহিদা সৃষ্টি হয়। সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। মা-বাবার সহায়তা খুব প্রয়োজন এ সময় সন্তানের। বয়োঃসন্ধিকালীন শারীরিক পরির্বতন সম্পর্কে তাকে শিক্ষা দিতে হবে। সঠিক শিক্ষা না পেলে সে ভুল শিখতে পারে। এ জন্য মা-বাবাকে সন্তানের পাশে থাকতে হবে। তা না হলে তার জীবনে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বয়ে আনতে পারে। তাই বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জন্মদিনে তাকে শিক্ষামূলক বই উপহার দেয়া যায়। শিক্ষামূলক টিভির অনুষ্ঠান দেখতে উৎসাহিত করতে হবে তাকে। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষাসফর বা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করা প্রয়োজন। বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সমস্যা, ঝগড়া, দ্বন্দ্ব যেন সন্তান জানতে না পারে। অনেক সময় এর প্রভাব সন্তানের উপর পারে ব্যাপকভাবে। নিষিদ্ধ বই, মুভি, গেমস সন্তানের মনের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে। তাই সেসব থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। শিশু যদি কারো সম্পর্কে অভিযোগ করে, তবে বিষয়টি নিয়ে মুখ বুজে না থেকে সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তার সন্তোষজনক সমাধান বের করতে হবে মা-বাবাকেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্তানের ভুল হতেই পারে। কিন্তু মা-বাবার ভুল যেন না হয়। মা-বাবার একটি ভুলের ব্যথা সারাজীবন সন্তানকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের সচেতনতা খুবই জরুরি। বাবা-মায়ের সচেতনতাই পরিবারের সুন্দর আগামীর ঠিকানা।

মা-বাবার সঙ্গ সন্তানের সঠিক পথে পরিচালিত হবার অন্যতম অনুষঙ্গ। মা-বাবাকে সন্তানের সঙ্গে অবশ্যই গুণগত সময় কাটাতে হবে। হতে হবে বন্ধু। তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করা, আচার আচরণে সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মা-বাবা তথা অভিভাবকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না-আমাদের সন্তানরা আমাদেরই গন্তব্য।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রমবিষয়ক ফিচার)

  • মাদক আসছেই

    নজরুল ইসলাম লিখন

    জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও

  • মদ্যপান ও বিপণন বিধিমালা সংশোধন হচ্ছে

    মো. মাহবুবুল হক

    ‘মদপান ও কেনাবেচায় নিয়ম স্পষ্ট হচ্ছে’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত।