• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০

কিশোর অপরাধ ও আমাদের দায়

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায় না। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা বৈরী পরিবেশই মানুষকে অপরাধী করে তোলে। একবারে নিরাপরাধ, নিষ্পাপ জন্ম নেয়া শিশু, কিশোর বয়সে পদার্পণ করতেই কেন অপরাধী হয়ে ওঠেÑ এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে নানা উপাদান বেরিয়ে আসে। শুধু যে নিম্নবিত্তের কিশোররা অভাব, অবেহেলার কারণে অপরাধী হয়ে ওঠে তা নয়, অঢেল অর্থবিত্তের মাঝে থেকেও কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জন্ম নেয়। দেশে অপরাধী কিশোরদের মধ্যে ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর সদস্য রয়েছে। রাজধানীতে উঠতি বয়সের কিশোররা ভয়ঙ্কর সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত পড়ছে। সামান্য কারণে এক কিশোর খুন করছে তার নিকটাত্মীয় বা বন্ধুকে। যে বয়সে কিশোরদের বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ঠিক সেই বয়সে ছুরি, চাকু হাতে কিশোররা অপরাধমূলক কান্ড ঘটিয়ে চলেছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি ও অস্ত্র বহনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে কিশোরদের লিপ্ত করা হচ্ছে। এর পেছনে কখনও কাজ করে এক শ্রেণীর শক্তিশালী রাজনীতিক সম্পর্কযুক্ত প্রভাবশালী অপরাধীচক্র। সন্ত্রাসীচক্রের সদস্যরা নিম্নবিত্ত, ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানছে। সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরদের চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাট অপরাধের বাইরেও মাদক বিক্রি, অস্ত্র ও বোমা বহনের মতো মারাত্মক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কাজের জন্য ওদের দেয়া হয় লোভনীয় অঙ্কের অর্থ। এসব অপরাধী কিশোরদের মধ্যে একাধিক গ্রুপ রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপ এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার করে রাখে। এসব গ্রুপ এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ইভটিজিং, হত্যাকা-সহ নানা ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রুপে গ্রুপে দ্বন্দ্বের জের ধরে এক গ্রুপের কিশোররা অন্য গ্রুপের কিশোরদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। কখনও ঘটছে খুনোখুনির ঘটনা। সম্প্রতি ঢাকার দক্ষিণখানে মেহেদি হত্যা এমনই কিশোর গ্রুপের দ্বন্দ্বের করুণ পরিণতি। বেশ কিছুদিন আগে ঢাকার উত্তরায় এবং চট্টগ্রামে এমনি কিশোর গ্রুপের দ্বন্দ্বে হত্যাকান্ড ঘটেছিল।

কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের একটি বিরাট অংশ নিম্নবিত্তের। দরিদ্র পরিবারের লাখ লাখ কিশোর বড় হয় অযতœ, অবহেলার মধ্য দিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে ওরা হয় বঞ্চিত। শিশুকাল থেকে মা-বাবার স্নেহ-মমতা বঞ্চিত হয়ে কখনও তারা পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিবেশে অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে এক সময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। শিশু-কিশোররাই প্রথমে অপরাধ জগতের নবীণ সদস্য হয়ে কালক্রমে শীর্ষস্থানে চলে যায়। পারিবারিক, সামাজিক অনুশাসনের অভাবে বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। নিম্নবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের কিশোররাও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থের প্রাচুর্যও কখনও অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মায়ের অসতর্কতার কারণে এসব কিশোররা অসৎ সঙ্গে মেশার সুযোগ করে নিচ্ছে। কর্মব্যস্ততার কারণে মা-বাবা তাদের সন্তানের প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হন। পর্যাপ্ত অর্থ, বেশি স্বধীনতা, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত স্নেহ-আদর ও উপযুক্ত পরিচর্যাবঞ্চিত শিশু-কিশোররা ভোগে একাকীত্বে। এ সুযোগে তাদের মনে স্থান করে নেয় বাইরের সঙ্গী, বন্ধুবান্ধব। আর সেই সঙ্গী অনেক সময় তাকে বিপথে ঠেলে দেয়। আকাশ সংস্কৃতির অবাধপ্রবাহের এ যুগে অ্যাডভেঞ্চার, অশ্লীল ভিডিও, ফেসবুক, ইন্টারনেটের অপব্যবহারও তাদের বিপথগামী করে তোলে। নেশার টাকা জোগাতেও অনেক সময় তাদেরচুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি থেকে শুরু করে হত্যার মতো তৎপরতায়ও জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। কখনও কিশোর ধর্ষকের রূপে আবির্ভূত হয়। মা-বাবা, নিকটাত্মীয়কে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে। অর্থের বলে কখনও বিত্তবান কিশোরদের অপরাধ লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। কিশোরের মনোজগতের বিকাশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে এরা চলে যায় অন্ধকার জগতে। আজকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো মানুষের বড্ড অভাব। কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে কারও শেষ রক্ষা হয় না। বিপদ আমাদের সবার পিছু নেয়। তাই যে যার অবস্থান থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসা প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। তাই শিশু-কিশোরদের প্রতি আমাদের সবার সবাই যতœশীল হতে হবে। আজকের কিশোর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দিনেদিনে বেড়ে ওঠে কিশোর পরিণত বয়স্ক হয়। অনুকূল পরিবেশ পেলে ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে। বিদ্যা-বুদ্ধি-মননে, প্রগতিশীলতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়। সমাজ গঠনে রাখতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। তাই দেহমনের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রতিটি শিশুর জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক পরিচর্যা, অফুরন্ত আলোকময় পরিবেশ। দেশের অসংখ্য শিশু-কিশোরদের অপরাধ জগৎ থেকে বের হয়ে আলোর পথে ফিরে আনার দায়িত্ব আমাদের সবাইকে নিতে হবে। দেশের অধিকারবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, বস্ত্র এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে। দৃঢ় করে তুলতে হবে পারিবারিক বন্ধন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিতে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মাদক থেকে কিশোরদের দূরে রাখতে নিতে হবে দৃঢ় পদক্ষেপ। মাদকের সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অনুসারে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তবেই দেশ ও জাতি গঠনে কিশোররা রাখতে সক্ষম হবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। নিম্নবিত্তের কিশোরদের জন্য স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি শিশু-কিশোরের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিদান নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদন সুবিধা দিতে হবে। স্কুল ক্যারিকুলামের বাইরে শিক্ষার পাশপাশি সাংস্কৃতিক পরিম-লে উন্নত চিন্তা-চেতনা নিয়ে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কিশোর অপরাধ দূর করতে ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের জন্য পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা ইতোমধ্যে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই দেশের কিশোররা অপরাধের দিকে না ঝুঁকে আলোর পথে হাঁটতে শুরু করবে। দেশের একটি কিশোরও যেন অপরাধী না হয়, সে দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজসচেতন প্রতিটি মানুষকে নিতে হবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার ]