• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৮ কার্তিক ১৪২৭, ৬ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রভাব

আবু আফজাল সালেহ

| ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

সবচেয়ে নেতিবাচক বিষয় হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মূলত অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থার গোড়াতেই আঘাত হেনেছে। শ্রম, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, সেবা খাত ইত্যাদি সবকিছুই এর দ্বারা আক্রান্ত। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, মারাও যাচ্ছে। অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান/পর্যটন ¯পট সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। অভিভাবকদেরও ঘর-ছাড়ার সুযোগ থাকছে না। ইতালির উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। ইতালি থেকে বাংলাদেশে আগত তিনজনের মধ্যে এ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্বের কারখানা বলা যায় চীনকে। আমাদের অনেক জিনিসপত্র চীন থেকেই আমদানি করি। সেই চীনই এখন বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। ফলে বিশ্ববাজারে বাণিজ্যিক ও পর্যটন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন যে বহু কর্মস্থল কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বিপরীত দিক থেকেও প্রভাব ফেলছে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা বিবেচনায় আনতে কমিয়ে ফেলতে হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

যে সব স্থানে লোকের সমাগম বেশি হয়, বিশেষভাবে পর্যটন স্থানসমূহে লোক সমাগম সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ‘প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’। করোনা ঠেকাতে সৌদি সরকার ওমরা বন্ধ করে দিয়েছে, সংক্রমণের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির কারণে ভুটান ও ভারতের সিকিমে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাময়িকভাবে। বাংলাদেশের বড় একটি শিল্প পর্যটন শিল্প, যা থেকে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক রাজস্ব আয় করে থাকে

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে চীন সরকার ১৪টি প্রদেশে ছুটি এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করে। এছাড়া বন্দরনগরী সাংহাই ও জিয়াংসু শহরও অতিরিক্ত ছুটির কবলে পড়েছে। চীনের মোট জিডিপির প্রায় ৬৯ শতাংশ আসে এই তিনটি স্থান থেকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের আতঙ্কে চীনজুড়ে উৎপাদন ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। জেনারেল মটরস ও টয়োটার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর চীনের আর্থিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে ৫.৬ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৬.১ শতাংশ। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ কমে গিয়ে ২.৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। যা সর্বশেষ বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার পর সবচেয়ে কম। প্রতি বছর চীনের প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষ গ্রাম থেকে শহরে কাজের সন্ধানে আসেন। তারা খুবই কম মূল্যে নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করে থাকেন। কিন্তু এ বছর অনেক কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে তাদের কাজ পাওয়া বেশ কঠিন হবে। বিশেষ করে হুবেই প্রদেশের ১০ লাখ কর্মজীবী মানুষকে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হবে।

করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। প্রাণঘাতী ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ানোর কারণে আতঙ্ক এখন বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের শতাধিক দেশে ভাইরসটি আক্রামণ করেছে। এটা শুধু মানুষের শরীরেই সংক্রমণ ঘটাচ্ছে না; এর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বৈশ্বিক অর্থনীতিও। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলোতে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে এসে পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়াচ্ছে, তাতে বৈশ্বিক জিডিপি চলতি বছর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। করোনাভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে আর্থিক বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে শঙ্কা। এটা এতটাই যে মানুষকে আশ্বস্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদহার কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এর আগে আর্থিক বাজারে সৃষ্ট শঙ্কা ও পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০০৭-২০০৯ সময়ের অর্থনৈতিক মন্দার সময়। সবচেয়ে নেতিবাচক বিষয় হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মূলত অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থার গোড়াতেই আঘাত হেনেছে। শ্রম, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, সেবা খাত ইত্যাদি সবকিছুই এর দ্বারা আক্রান্ত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প হচ্ছে পর্যটন। করোনাভাইরাসের প্রভাবে থমকে গেছে পর্যটন।

বাংলাদেশে সর্বশেষ তিন জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর। সারা বিশ্বে ৭০টিরও বেশি দেশে লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এই ভাইরাসে। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিন হাজারেরও বেশি। এ অবস্থায় পৃথিবীর অনেক দেশে পর্যটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিজাত বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চীন থেকে। বর্তমানে এসব কাঁচামাল আমদানি বন্ধ। পূর্বের আমদানি করা মজুদ থেকে এখন চলছে। তবে তা একসময় ফুরিয়ে যাবে। এদিকে দেশের বড় অবকাঠামোতে উন্নয়ন কাজের অনেক যন্ত্রপাতি আমদানি হয় চীন থেকে। এসব প্রকল্পের কাজও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর এবং চীন হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানতম আমদানিকারক দেশ। ব্যাবসায়িক কারণেও বহু বাংলাদেশি চীনে ভ্রমণ করে। একইভাবে চীন থেকেও বাংলাদেশ ভ্রমণের সংখ্যা অনেক বেশি। বিশেষত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বহুসংখ্যক চীনা কর্মী রয়েছে। ইতোমধ্যে চীন ভ্রমণ বাতিল করতে শুরু করেছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ও পর্যটক বিভিন্ন কারণে চীন ভ্রমণ করেন। পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও চীনের মধ্যে প্রতিদিন চারটি ফ্লাইট যাওয়া-আসা করে। বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা এবং চীনের চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স ও চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে চীনে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব ফ্লাইটের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ যাত্রী বাংলাদেশ থেকে চীনে যান। কিন্তু এখন সে সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে।

কক্সবাজার আমাদের পর্যটন নগরী। বহু দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদাচারণা থাকে। এখন পর্যটন মৌসুম। রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আবাসন ব্যবস্থাও করা হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। তাই এ জেলায় অধিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এখনই বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। জনসচেতনতা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। ইমাম-পুরোহিতরা এ ভাইরাস নিয়ে বক্তব্যে দিতে পারে। শিক্ষকগণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। আতংকিত হওয়ার দরকার নেই। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। এসব বিষয়েই আলোচনা করতে হবে। এতে করে সাধারণ জনগণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়।

প্রায় প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রোগের মহামারি রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের ফল এটি। আচমকা এসব রোগ উলট-পালট করে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উন্নত বিশ্বও এসব রোগের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকা বা দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্যবিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়ছে। বহু প্রাণহানিও ঘটছে। করোনায় যারা আক্রান্ত হয়, ৮০ বছরের বেশি বয়সীর ক্ষেত্রে ১৫% মৃত্যুঝুঁকি। মোটের ওপরে মৃত্যুঝুঁকি ২.৩%। বয়স যত কম, মৃত্যুশর আশংকা তত কম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মুখ্য ভূমিকা রাখবে। কাঁচা খাবার- ফল থেকে শসা, ভালো করে না ধুয়ে খাওয়া যাবে না। ভালো করে হাতমুখ ধুতে হবে। বর্তমানের আলোচিত করোনাভাইরাস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্মূল করা যাবে ততই আমাদের ও বিশ্ববাসীর জন্য মঙ্গলজনক হবে।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী ১ লাখেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। এ কারণে বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণসহ বিভিন্ন আয়োজনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যেগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দর্শনার্থীর অংশগ্রহণ দেখা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শিল্পের মধ্যে পর্যটন অন্যতম। করোনাভাইরাস আতঙ্কে সারা পৃথিবীতে পর্যটকদের ভ্রমণ বাতিল ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে এই খাতে। জার্মানির বার্লিনে এ বছর বার্ষিক পর্যটন ইভেন্ট ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম এক্সচেঞ্জ’ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাইরাসের কারণে তা বাতিল হয়ে গেছে।

আমরা বাঙালি মুনাফাটাই বেশি বুঝি। সেক্ষেত্রে মানবতা বা সেবাকে গৌণ হিসাবেই বিচার করি। ইতোমধ্যে মাস্ক ও ক্লিনারসামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে। ভুটান মেডিসিন ফ্রিতে দেয়ার ঘোষণা করেছেন। সেখানকার প্রধানমন্ত্রী নিজেই তদারকি করছেন বলে গণমাধ্যমে জানতে পারছি। কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে জোর করে মানাতে হয়। বিধায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা বাড়াতেই হবে।

যদি বাংলাদেশে করোনার প্রভাব পড়ে, তাহলে বাংলাদেশে স্বাভাবিক উন্নয়নে বাধা আসতে পারে, উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের প্রয়োজন আরেকটু বাড়তি সতর্কতা। যে সব স্থানে লোকের সমাগম বেশি হয়, বিশেষভাবে পর্যটন স্থানসমূহে লোক সমাগম সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ‘প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’। করোনা ঠেকাতে সৌদি সরকার ওমরা বন্ধ করে দিয়েছে, সংক্রমণের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির কারণে ভুটান ও ভারতের সিকিমে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাময়িকভাবে। বাংলাদেশের বড় একটি শিল্প পর্যটন শিল্প, যা থেকে বাংলাদেশ সরকার ব্যপক রাজস্ব আয় করে থাকে। পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারেরও ভাবার সময় এসেছে। লোক-সমাগম স্থান গুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্কুল-কলেজ সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা যেতে পারে।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট]

  • প্লাস্টিক : স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক

    সোনিয়া আক্তার

    সুস্থ দেহে, সুস্থ মন- কথাটির সাথে আমরা সকলে পরিচিত। আর স্বাস্থ্যই দিনদিন

  • মুজিব শতবর্ষ

    মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

    প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছেন, এবারের সংগ্রাম একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার

  • গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু

    রাজশাহী, ৮ই আগস্ট। আওয়ামী লীগের সূত্রে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, বিগত ১ লা আগস্ট বিরাট হট্টগোলের মধ্য দিয়া নাটোর মহাকুমা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পরিসমাপ্তি ঘটে।