• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০

ঐতিহাসিক ১৭ এপ্রিল

মোহাম্মদ শাহজাহান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৮

১৭ এপ্রিল ও ১০ এপ্রিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল ৯ মাসের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করা হয়। ঐদিন ভারতের শিলিগুড়ির অজ্ঞাত বেতার থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক দীর্ঘ ভাষণে কি পরিস্থিতিতে সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, এর প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী সে ভাষণে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন যুদ্ধে লিপ্ত। পাকিস্তান আজ মৃত। অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছে।’ ঐ ভাষণে চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী বলে ঘোষণা করা হয়। আকাশবাণী থেকে এ খবর প্রচারের পরপরই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিমান চুয়াডাঙ্গার ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার দস্যু সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালি জাতির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইপিআর, পুলিশ, বাঙালি সেনাবাহিনী ও জনগণ পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং তার বাহিনী খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম জেলাগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। ৫ এপ্রিল মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ একটি বৈঠক করেন। মেজর ওসমানকে তাজউদ্দীন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গায় সংসদ অধিবেশন বসবে এবং মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করবে।’ ভারী অস্ত্রশস্ত্র না থাকায় পাকিস্তান বাহিনী চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ দখল করে নেয়। পরে ১৭ এপ্রিল শনিবার তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার ভবেরপাড়ার (বৈদ্যনাথতলা) আমবাগানে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের দেশি-বিদেশি ১২৭ জন সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন শপথের পর ঘোষণা করেন যে, ‘আজ ১৭ এপ্রিল থেকে এ বৈদ্যনাথতলা হবে অস্থায়ী সরকারের রাজধানী এবং এর নাম হবে মুজিবনগর। এ মুজিবনগর থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করা হবে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’ বেলা ১১টার দিকে মন্ত্রীবর্গ উপস্থিত হলে ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (এসপি মাহবুব) মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট একটি দল নিয়ে অভিবাদন দেন। পশ্চিম রণাঙ্গনের সেনাপতি মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং মেহেরপুরের এসডিও তওফিক ইলাহী চৌধুরীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা শপথ অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে বিশেষ অবদান রাখেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে দেয়া গার্ড অব অনারে নায়েব সুবাদার তোফাজ্জল হোসেনসহ ইপিআর বাহিনীর ৩৪ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও এএইচএম কামারুজ্জামান। অনুষ্ঠানে নারী জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন মেজর ওসমানের স্ত্রী বেগম নাজিয়া ওসমান ও তাদের দুই শিশুকন্যা চম্পা ও কলি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন, সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পারস্পরিক মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ গঠনের কথা ঘোষণা করছি এবং এ ঘোষণা দ্বারা আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্বে (২৬ মার্চ) যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, সে পবিত্র ঘোষণাটিকে অনুমোদন করছি ও সিদ্ধান্ত করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করবেন, রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদেও অধিষ্ঠিত থাকবেন, রাষ্ট্রপ্রধানই সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী হবেন, তিনি একজন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রয়োজনবোধে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন। ... আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এ স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।’

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে অস্তমিত সূর্য ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে পুনরায় উদিত হয়। সত্তরের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ৩১৩ আসনের মধ্যে শুধু পূর্ব বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) ১৬৭ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু মুজিব কেন্দ্রে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেন। পাকিস্তান সামরিক চক্র এবং তাদের ক্রীড়নক জেড এ ভুট্টো ষড়যন্ত্র করে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন ১ মার্চ (’৭১) দুপুরে আকস্মিকভাবে স্থগিত করে দেয়। জান্তার ঘোষণা বাংলার মানুষ মেনে নেয়নি। ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সারা বাংলায় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এর বিরুদ্ধে সেøাগান দেয়।

১ মার্চ, ১৯৭১ ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণে কার্যত পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটে। ৭ মার্চ ’৭১ এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেন। ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে সহকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। ওই কালরাতে গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা আগে তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামÑ এ তিনজন একত্রে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ৩২ নম্বর বাসভবনে দেখা করে তাকে আত্মগোপনে যেতে পীড়াপীড়ি করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার সিদ্ধান্তে অটল থেকে তাদের দ্রুত ৩২ নম্বর ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য করেন। কথা ছিল এ তিনজন একত্রে সীমান্ত অতিক্রম করবেন। যে কোন কারণেই হোক, ড. কামাল হোসেন অন্য দুজনের কাছ থেকে ওই রাতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রচ- গোলাগুলির মধ্যে এক বাসায় আশ্রয় নেন। কার্ফ্যু প্রত্যাহার করা হলে ২৭ মার্চ তারা দু’জন ঢাকা শহর ত্যাগ করেন। ৩১ মার্চ রাতেই মেহেরপুরের এসডিও তওফিক এলাহী চৌধুরী ও ঝিনাইদহের পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিন আহমদের সহযোগিতায় তারা সীমান্ত অতিক্রম করেন। পরদিন পহেলা এপ্রিল দুই নেতা বিমানযোগে দিল্লি যান। ৪ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বাংলাদেশের নেতা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিনিধি হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ দেখা করেন। তাজউদ্দীন জানান, ২৫ মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের আর কোন দেখা হয়নি। তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোন মূল্যে এ স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রয়োজন। তবে পাকিস্তান আমাদের যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। ওদের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ করতে হবে।’

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এসে তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।

এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তাজউদ্দীন দ্বিতীয়বারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে দলে দলে মানুষ পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে। দুই নেতার সাক্ষাৎকালে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য-আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের খবর প্রচারের জন্য একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপনের কথাও আলোচনায় ওঠে আসে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে হামলার পর থেকে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালাতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হত্যা প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি প্রচার যন্ত্র আওয়ামী লীগ ও সে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে বিরামহীন অপপ্রচার চালায়। এ পরিস্থিতিতে ২/১ জন আওয়ামী লীগ নেতা সীমান্তের ওপারে গেলেও তখনো অনেকেরই খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছিল না।

বাংলার মানুষের মনোবল অটুট রাখতে এবং পাকিস্তানি অপপ্রচারের জবাব দিতে ’৭১-এর ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হলো। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেয়ার জন্য তাজউদ্দীন আহমদের একটি ভাষণও রেকর্ড করা হয়। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নেতা ওপারে পৌঁছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীনকে মেনে না নেয়ার চেষ্টা চালান। খন্দকার মোশতাক ষড়যন্ত্র শুরু করেন তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে। প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হক মনি বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু শত্রুর কারাগারে। এখন আর মন্ত্রী মন্ত্রী খেলা সাজে না। যুদ্ধের সময় সমরক্ষেত্রে যেতে হবে। সরকার গঠন নয়, বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে।’

বিবদমান এ পরিস্থিতিতে রাতের বেলা লর্ড সিনহা রোডে দলীয় এমপিএ-এমএনএদের সভায় কয়েকজন নেতা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। অবশেষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানের সমর্থনে তাজউদ্দীন প্রথমবারের মতো পরিস্থিতি সামলে নিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র হামলার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ৪৬ বছর বয়স্ক তাজউদ্দীন শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের ঘোষণাই দিলেন না, বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ ভাষণে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাসহ পাকিস্তানি নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরেন।

এরপর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, স্থানীয় জনতা এবং জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমদ, মন্ত্রী হিসেবে এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এএইচএম কামারুজ্জামান শপথ গ্রহণ করেন। কর্নেল (অব.) ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। শপথ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ শপথ গ্রহণের পর ভাষণে স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী, প্রবাসী সরকারের রাজধানীর নামকরণ করেন মুজিবনগর।

সে সময় আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধীদের নেতা খন্দকার মোশতাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীনের কেবিনেটে থাকলেও গোপনে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেন। মোশতাকের মূল উদ্দেশ্যে ছিল তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের শাহের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো। ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন লাভ ও পাকিস্তানের পরিধির মধ্যে সমাধান করে কনফেডারেশন গঠন করা ছিল এদের মূল লক্ষ্য। এ সময় মোশতাক গং প্রচার করেÑ ‘হয় স্বাধীনতা, না হয় শেখ মুজিব’। অর্থাৎ স্বাধীনতা পেলে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যাবে না আর বঙ্গবন্ধুকে জীবিত পেতে হলে স্বাধীনতার ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে। এই চক্র আরও প্রচার করতে থাকে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চান না।

এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় কোন কোন বক্তা বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার মধ্যে একটিকে বেছে নেয়ার প্রস্তাব করেন। ঐ সভায় অনেক সিনিয়র নেতাই বক্তব্য রাখতে বিব্রতবোধ করেন। এ সংকটময় মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমদ দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে ফিরে পাব। খোদা না করুন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যদি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়Ñ পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে, তাহলে বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েও স্বাধীন বাঙালি জাতির ইতিহাসে অমর ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি একটি নতুন জাতির জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হবেন। ... বর্তমান অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে যদি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়ে ফিরে আসেন, তবু তিনি হবেন পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির পরানো এক গোলাম মুজিব। বাংলাদেশের জনগণ সে গোলাম শেখ মুজিবকে কোনদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে গ্রহণ করবেন না। আর গোলামের পরিচয়ে বঙ্গবন্ধু কোনদিন অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসবেন না। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করব। বাংলার মুক্ত মাটিতে মুক্ত মানুষ হিসেবেই বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন।’ (নজরুল ইসলামের লেখা, ‘একাত্তরের রণাঙ্গনÑ অকথিত কথা’, পৃষ্ঠা ১৩১-১৩২)। এরপর সব নেতাই তাজউদ্দীনের বক্তব্যকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও মোশতাক চক্রের চক্রান্ত এভাবেই আবারও ব্যর্থ হয়ে গেল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলতে হবে, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মন্ত্রী এম. মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগের অন্য কয়েকজন নেতা বিশেষভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন করেছিলেন বলেই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ ৯ মাসে তাজউদ্দীন সরকার মনজিলে মকসুদে পৌঁছেছিলেন। বাংলার জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এতটাই গ্রহণযোগ্যতা ছিল যে, শত্রুর কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও তাকেই যুদ্ধকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতি করতে হয়েছিল। জয় বাংলাÑ জয় বঙ্গবন্ধু সেøাগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছেন। মূলত বঙ্গবন্ধু মুজিবই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। তার নামেই ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। জয় বাংলা।

১৫ এপ্রিল ২০১৮

লেখক : সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক

bandhu.ch77@yahoo.com

  • মুজিবনগর দিবসের স্মৃতিকথা

    তোফায়েল আহমেদ

    মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিকথা লিখতে বসে কতো কথা আমার মানসপটে ভেসে উঠছে