• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১

একজন স্বশিক্ষিত সফল শিল্পোদ্যোক্তা

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯

image

ধান, চাল, নারিকেল এবং নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের আড়তদারি ব্যবসায়ী বাবা-মার একমাত্র সন্তান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের পরিবর্তে বাবার স্বাধীন ব্যবসায়ী চেতনা আয়ত্ত করছিল এক কিশোর বালক। লেখাপড়া শুরু করলে দেখা গেল অসাধারণ তার মেধা। যে শ্রেণীতে সে উত্তীর্ণ হয়েছিল, তার যোগ্যতা তার চেয়েও অনেক বেশি। ফলে শিক্ষকরা তাকে প্রমোশন দিয়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করে দিলেন। কিন্তু স্কুলে পড়া সম্ভব হয়নি লেখাপড়ায় মন ছিল না। বাবার সাহায্যার্থে তাকে ব্যবসার কাজ শুরু করতে হয়। ডাব বিক্রি, চানাচুর বাদাম ফেরি করার কাজ। ব্যবসা ভুলভাল হলে বাবার কাছে বকা খেতে হতো। একদিন বাবা-ছেলের মধ্যে বসচা বেঁধে যায়। ফলে সে রাগ করে বাড়ি থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। সে সময় তার কাছে মাটির ব্যাংকে জমানো ১৭ টাকা নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় সে। মানুষ হয়ে বাড়ি ফিরবে এ ছিল তার পণ। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর।

গভীর রাতে শিয়ালদা স্টেশনে এসে নেমে পড়ে সে দেখে অসংখ্য লোক প্ল্যাটফর্মের ওপর কাগজ বিছিয়ে শুয়ে আছে। এখান থেকে সে জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছিল। স্টেশনের এই প্ল্যাটফর্মই হয় তার সেই নতুন জীবনের আশ্রয়। সারাদিন শহর বেড়িয়ে রাত কাটে তার এ স্টেশনে। এক পয়সায় কেনা খবরের কাগজ বিছিয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে শুয়ে থাকা। দৃঢ়-কঠিন জীবন, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল এক অসামান্য জীবন প্রত্যয়ের। কলকাতার পথঘাট তার অজানা। কিন্তু এ অজানাকে চেনা, শহর ঘুরে ঘুরে কাজের সন্ধ্যান করা। ইতোমধ্যে মন্দার প্রভাব শহরময় ছড়ানো। অচেনা এক কিশোর সে। তাকে কাজ দেবে কে? কিছুদিন ঘোরাফেরা চললো শহরের নানা জায়গায়। এতে পুঁজিও কমে আসতে থাকল। আয় নেই কিন্তু ব্যয় আছে। তদুপরি ছাতু খেয়ে জীবন ধারণ। এ অবস্থায় হাতের টাকা কয়টি কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তা। বাবার সঙ্গে ব্যবসার কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার। সেই চিন্তাটা তার মাথায় খেলছিল। একদিন শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে লক্ষ্য করে বড় বাজারের রামলোচন স্ট্রিটের এক জায়গায় কমলা লেবুর নিলাম হচ্ছে। বড় বাজারের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত বিভিন্ন ফলের নিলাম হতো। এখান থেকে ফল কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে। সে খুচরা বিক্রেতার এ কমলালেবুর নিলাম অনেক সময় নিয়ে দেখছিল। কীভাবে নিলামের দর ডাকা হয়, কীভাবে ক্রয় করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতায় অন্য অনেক ক্রেতার মতো সেও নিলামের ডাকে অংশ নেয় এবং আড়াই টাকা দিয়ে চার ঝুড়ি কমলা ক্রয় করে। চার ঝুড়ি কমলা যখন কেনা হয়ে গেল, তখন সে পড়ে আর এক বিপদে। ঝোঁকের মাথায় কমলা কেনা হয়েছে কিন্তু এ অজানা শহরের কোথায় বিক্রি হবে সেটা তো তার জানা নেই। হঠাৎ হাওড়া ব্রিজের কথা তার মনে এলো। সে ব্রিজ কিছু দিন আগে তৈরি হয়েছে। ব্রিজ নির্মাণের অনেক কাজ তখনো বাকি ছিল। ফলে অনেক শ্রমিকের আনাগোনা ছিল সেখানে। এই জায়গাটাকে সে তার কমলা বিক্রির উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে করে। এটাই ছিল তার কলকাতা জীবনের প্রথম ব্যবসা।

সেদিন তাকে কুলির মজুরি দিতে হয়েছিল দু’পয়সা, পুলিশকে এক পয়সা। সে সময় একটা নিয়ম ছিল টহলদার পুলিশকে প্রতি চার ঘণ্টায় ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য এক পয়সা ঘুষ দিতে হতো। নিয়মটা ছিল অলিখিত। কুলি ও পুলিশকে তিন পয়সা দিয়ে এবং হাত খরচ করেও সেদিনের প্রথম ব্যবসায় সে ১০ পয়সা লাভ করে।

প্রথম দিনের ১০ পয়সা লাভ খুব কম ছিল না তার পক্ষে। কারণ তার নিজের প্রতিদিনের খরচ ছিল দু’পয়সা। তার খাদ্য ছিল ছাতু। দু’পয়সায় কেনা। স্টেশনে ঘুমাতে পয়সা লাগতো না। ফলে তার লাভ খারাপ হলো না। এমন লাভ দেখে সে নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসাটি করতে লাগলো। এভাবে কিছুদিন ব্যবসা করার পর সে লক্ষ করে তার হাতে প্রায় ৩০০ টাকা জমে গেছে।

সেদিনের সেই বালক ব্যবসায়ী ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পপতি, শিল্পোদ্যোক্তা ও সমাজসেবক শেখ আকিজউদ্দীন, আজকের বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্প পরিবার আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা । আকিজ উদ্দিন অত্যšত মিতব্যয়ী ছিলেন। প্রতিদিনের খাবারের বাইরে কিছু কিনতেন না। মিতব্যয়িতা তার জীবনের এক পরম শিক্ষা। তিনি কমলালেবুর ব্যবসায় বেশ উন্নতি করেছিলেন। একদিন হঠাৎ জাকারিয়া স্ট্রিটের এক হোটেল মালিকের সঙ্গে দেখা হয়। হোটেল মালিক আকিজ উদ্দিনের ব্যবসায় নিষ্ঠা দেখে খুব প্রশংসা করেন। তার পরিশ্রম দেখে মুগ্ধ হয়ে হোটেল মালিক তাকে হোটেলে নিয়ে এসে সস্তায় থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। প্রতিদিন এক আনায় আকিজ উদ্দিন খেতে পেতেন এবং রাতে হোটেলে থাকার সুযোগ পেলেন। তার স্টেশনে ভাসমান জীবনের অবসান হলো। এ সময় তার বড় অঙ্কের মূলধন হওয়ায় তিনি ব্যবসা পরিবর্তনের চিন্তা করলেন। আরও ভালো ও বড় ব্যবসা কীভাবে করা যায়। তার খোঁজ করতে থাকলেন।

তখনকার কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একটা দৃশ্য দেখা যেত। চার চাকার ঠেলাগাড়িতে বিভিন্ন মনোহরি পণ্য সাজিয়ে ‘নিলামওয়ালা ছ-আনা’ যা নিবেন ছ-আনা’ ব্যবসা খুব জনপ্রিয় ছিল। ঠেলাগাড়িতে ৩০-৩৫ ধরনের পণ্য রাখা হতো। এই দোকানিরা হিন্দিতে সুন্দর সুন্দর ছড়া কাটতো। সেই সব ছড়ায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হতো। দোকানিদের উদ্দেশ্যও সফল হতো। তাদের পণ্যেও বিক্রি ভালো হতো। ছোটো ও উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা নিলামওয়ালা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে তাদের মনের মতো খেলনা বা মনোহরি দ্রব্য কিনতে পছন্দ করত। আকিজ উদ্দিন চমকদার এ ব্যবসাটির প্রতি খুবই আকৃষ্ট হলেন। তিনি একটি নতুন নিলামওয়ালা ঠেলাগাড়ির দোকান ক্রয় করলেন। চমৎকার এবং আকর্ষণীয় ৩৫-৪০টি পণ্যে দোকানটি সাজালেন। সমস্যা হলো একটি। কারণ তিনি তখন পর্যন্ত হিন্দি ভাষা জানতেন না। যে হিন্দি ছড়াগুলো মুগ্ধকর এবং ছেলেমেয়েদের আকৃষ্ট করে তিনি সেগুলো শিখতে চাইলেন। সে জন্য তিনি একজন হিন্দিভাষী সহকারী রাখলেন। এতে তার হিন্দি ছড়াগুলো আয়ত্ত করা সহজ হলো। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ছড়াগুলো রপ্ত করে ফেললেন। তখন কিশোর আকিজ উদ্দিনের মুখে হিন্দি ছড়াগুলো শুনে প্রচুর লোক তার দোকানে আসতে লাগলো। এভাবে তার এ ব্যবসাও পুরনো দোকানিদের ছাড়িয়ে যেতে লাগলো। প্রায় পুরো এক বছর আকিজ উদ্দিনের ‘নিলামওয়ালা ছ’আনা’ ব্যবসা বেশ রমরমাভাবে চললো। কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি পুলিশের খপ্পরে পড়লেন। শোনা যায় পুরনো দোকানীরা তার বিরুদ্ধে পুলিশকে লাগিয়ে দেয়। অনুমতি ছাড়া রাস্তায় দোকান করার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

তখনকার ব্রিটিশ ভারতের আদালতে বিচারব্যবস্থা ছিল খুব কঠোর। শ্বেতাঙ্গ বিচারকরা কারণে অকারণে ভারতীয়দের কঠোর শাস্তি দিত। কিন্তু আকিজ উদ্দিনের বেলায় একটু ব্যতিক্রম হলো। তার চেহারায় একটা সাধারণ লাবণ্য ছিল। ছিল একটা নিস্পাপ উজ্জ্বল মুখ। বিচারের সময় তার এই চেহারা দেখে বিচারকের মায়া হলো। বিচারক আকিজ উদ্দিনকে মাত্র তিন দিনের জেল ও পাঁচ টাকা জরিমানা করেন। তবু নির্দোষ আকিজ উদ্দিন এই জরিমান ও জেল খাটার কথা মনে করে ভেঙে পড়েন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি এ ব্যবসায় আর ফিরতে চাইলেন না। তিনি চার চাকার ঠেলাগাড়ি এবং দোকানের সকল পণ্য বিক্রি করে দিলেন।

এর পর বিষণœ মনে তিনি কিছুদিন বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে লাগলেন। এ সময় তার হাতে প্রায় আড়াই হাজার টাকা জমেছিল। তিনি আবার নতুন করে কোনো ব্যবসার কথা ভাবতে লাগলেন। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন পূর্ব পরিচিত পেশোয়ারের এক ফল ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তিনি কলকাতায় এসে প্রথম যে কমলালেবুর ব্যবসা শুরু করেছিলেন, রামলোচন স্ট্রিটের সেই কমলালেবু বিক্রেতা ছিলেন এই পেশোয়ারের ব্যবসায়ী। তিনি আকিজ উদ্দিনের কাছ থেকে তার কলকাতা জীবনের সব ঘটনা শুনলেন। উদ্যোমী কিশোরের গল্প তার মনে ভীষণ নাড়া দিলো। আকিজ উদ্দিনের প্রতি তিনি খুব স্নেহশীল হলেন। একদিন এ পেশোয়ার ব্যবসায়ী আকিজ উদ্দিনকে বলেন যে, তিনি দেশে ফিরে যাচ্ছেন। আকিজ উদ্দিন যদি ইচ্ছা করে তবে তার সঙ্গে সে যেতে পারে এবং সেখানে গেলে সে নিশ্চিত মনে ফলের ব্যবসা করতে পারবে। পেশোয়ার ব্যবসায়ীর এই কথায় আন্তরিকতা ছিল। নির্ভীক আকিজ উদ্দিন তার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেলেন। পেশোয়ারে তার প্রায় দু’বছর কেটে যায়। পেশোয়ারে স্বল্পকাল অবস্থান করলেও পরবর্তীকালে জীবনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এমনকি তার এ পেশোয়ার বাসের অভিজ্ঞতা একবার নিজের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছিল এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার সাফল্য লাভের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

পেশোয়ার যাওয়ার সময় আকিজ উদ্দিনের কাছে প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা ছিল। পেশোয়ারে ব্যবসা করার পর তার এ মূলধন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৯৪০ সালে বাড়ি ছাড়ার পরে আকিজ উদ্দিনের প্রায় চার বছর কেটে গেছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি একবারও বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কাজেই এক ধরনের উৎকণ্ঠা তার মনে কাজ করছিল। তিনি হয়তো কলকাতাতেই স্থায়ী হয়ে থাকতে পারতেন। তার জন্য সেটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা অন্য এক লগ্নতা তৈরি করেছে। ফলে ১৯৪৫ সালের দিকে তিনি নিজ গ্রাম মধ্যডাঙ্গায় প্রত্যাবর্তন করেন। বাড়ি ফেরার সময় তার কাছে পুঁজি জমেছিল প্রায় আট হাজার টাকা। এই পুঁজি ভরসা করেই তিনি বাড়ি ফিরলেন। কিছুদিনের মধ্যেই বাবা-মার মৃত্যুতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লো আকিজ। তখন তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। আর্থিক সামর্থ্য স্বল্প হলেও তিনি আত্মবিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন।

১৯৫২ সালে আকিজ প্রথম বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসাটির ধারণা তিনি পেয়েছিলেন নিতাই চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তির নিকট থেকে। সেই সময়ের বিখ্যাত ‘বিধু’ বিড়ির মালিক বিধু ভূষণ ছিলেন তারই এক বন্ধুর বাবা। তার অনুপ্রেরণাতেই আকিজ প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বিড়ির ব্যবসাটিকে দাড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন। ধীরে ধীরে বেজেরডাঙ্গা তার নিজ এলাকায় রেলস্টেশনের পাশে একটি মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে এই দোকানে তার মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ষাট হাজার টাকা। এর মাঝেই ঘটে যায় আরেক দুর্ঘটনা। এক রাতে আকিজের পুরো দোকানটি পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অসীম ধৈর্যশীল আকিজ এতটুকু ভেঙে পড়েননি তাতে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় অচিরেই তিনি গড়ে তোলেন নতুন দোকান। এ সময় তাকে সহায়তা করেন ফুলতলা বাজারের কালাকু-ণ্ডু। তার সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও নিরলস পরিশ্রমের ফলে কিছু দিনের মধ্যেই মোট মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ টাকা। এরই পাশাপাশি আকিজ শুরু করেন ধান, পাট, চাল, ডাল, গুড় প্রভৃতির খুচরা ব্যবসা। সমস্ত ক্ষেত্রেই আকিজের প্রধান মূলধন ছিল বিশ্বস্ততা। ব্যবসায়ী মহলের সবাই তাকে একবাক্যে বিশ্বাস করত।

পরবর্তীকালে ষাটের দশকের দিকে ব্যবসায়িক কারণে চলে আসেন যশোরের সীমান্তবর্তী থানার নাভারণ পুরাতন বাজারে। এখান থেকে বিড়ির ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটান এবং গড়ে তোলেন দেশের সর্ববৃহৎ আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি। নাভারণে আসার প্রথম দিকে ব্যবসা প্রসারে তাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোজাহার বিশ্বাস।

এভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেন আকিজ। নতুন নতুন উদ্ভাবনী মেধায় তিনি উন্মোচন করেন ব্যবসার নানা দিগন্ত। একে একে গড়ে তোলেন আকিজ তামাক ফ্যাক্টরি, আকিজ নেভিগেশন, আকিজ জুট মিল, আকিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি, আকিজ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এখন প্রায় ৭০ হাজার কর্মী তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে।

সেখ আকিজ উদ্দিন জীবনের সব শ্রম-সাধনা শুধু নিজকে প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করেননি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি একজন সফল সমাজসেবক হিসেবে দায়িত্ব পাল করেন। ছোট বেলায় দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের করুন অবস্থা উপলব্ধি করেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শরিফ হোসেনের সহায়তায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আদ্-দ্বীন। বর্তমানে এ সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন মহিলা, শিশু ও চক্ষু হাসপাতাল সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। তার অর্থায়নে পরিচালিত আকিজ কলেজিয়েট স্কুল প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই যশোর শিক্ষা বোর্ডের সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম বহন করে আসছে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এমন একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না। অক্লান্ত পরিশ্রম, কঠোর অধ্যাবসায়, আপোষহীন সততা, সর্বপোরি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা তাকে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার পুরো জীবনের নিয়ন্ত্রক। অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান তিনি সহজেই নিজের জীবনে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষা বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়নি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল যেমন- রবীন্দ্রনাথেরও জীবনের শুরুতে। মেধা ও প্রতিভার সমন্বয়ে গড়ে তোলা তার প্রতিষ্ঠানে এখন হাজার হাজার শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ, সম্পদ ও মানব সেবার এ বিরল দৃষ্টান্ত।

  • দায়বদ্ধতা অথবা দায়হীনতার কথা

    মৌসুমী বিশ্বাস

    পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতি আমাদের ক্রমশই এক ‘আমিত্ববাদিতার’ দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা সেই আমিত্ববাদিতা থেকে এখন আর বের হতে