• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১

চিরদিন তোমার আকাশ

উদ্যম বাবুদের সমাজ পাঠ

সংবাদ :
  • বিলু কবীর

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯

আমাদের বাসায় একটা পিচ্চি আছে। উদ্যম বাবু। দুরন্ত-দুর্বার। আমার ভাইপো। বয়স পাঁচ বছর কয়েক মাস। খুব বুদ্ধি। পাকা। সমাজ সংসারে যেসব ভালো দিক, সেগুলো ছোঁয়াচে নয়, শিশুদের মনের জন্য প্রভাবক নয়। সেগুলো শিক্ষার বিষয়। যেটা ছোটদের জন্য শেখার বিষয়, সেটা বড়দের জন্য শেখানোর বিষয়। মানে যা শিষ্টাচার, যা অনুশীলনযোগ্য, তা ছোটদের অন্তরে গেঁথে দিতে বড়দের কিছু বেগ পেতে হয়, প্রচেষ্টা নিতে হয়। এছাড়া উদ্যমদের মতো বাচ্চাদের জন্য সহজেই তাদের অনুপযোগী অনেক সাবজেক্ট সহজ লভ্য। এগুলো তারা বড়দের অসাবধান কথাবার্তা, ফো

নালাপ, খবরের কাগজের ছবি, টেলিভিশন এসব মাধ্যম থেকে পেয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই যা ভালো ও কম আনন্দদায়ক বা মোটেই আনন্দদায়ক নয়, তা তাকে টানে না। আর যা তার জন্য এখনই জানা খারাপ, সহজে আকর্ষণীয়- তা যেমন তাকে টানে, তেমনই সংক্রামক। মানে ‘রোগ ছোঁয়াচে, স্বাস্থ্য নয়’-এর মতো। আমার অভিজ্ঞতা হলো এ বয়েসের বাচ্চারা যেটা করে, সেটা হলো নতুন কিছু শুনলে-দেখলে প্রশ্ন। কারণ হচ্ছে প্রতিদিনই সে জীবনে প্রথম শুনছে, প্রথম দেখছে এমন অনেক কথা, অনেক ঘটনা, ছবি ইত্যাদি। এবং এসব ক্ষেত্রে তার সহজ প্রশ্ন এমন কঠিন হয়ে যায় যে বলার নয়। আবার সহজেই সে এমন এমন শব্দ ও বিষয়ের মুখোমুখি হয় যে, সেটা এখনই তার জীবনে না ঘটাটাই ভালো ছিল। কিন্তু তা সব আবছেই তার সামনে দৃশ্যায়িত হয়, উচ্চারিত হয়। সব ক্ষেত্রে ছোটদের যেমন কিছু করার থাকে না, তেমনই অনেক ক্ষেত্রে বড়দেরও কিছু করার উপায় থাকে না। কিন্তু ছোটদের তো সাবধান হবার বয়স হয়নি। কিন্তু বড়দের হয়েছে। তাদের কাদর্য্যগুলোই ছোটদের মধ্যে ঢোকে এবং বাসা বাঁধে। এবং বড়দের সুস্বাস্থ্য ছোটদের মধ্যে সহজে ঢোকে না, ঢুকলেও সুযোগ পাওয়া মাত্রই তা বেরিয়ে আসে। পক্ষান্তরে রোগ ও নিচুতা সহজেই ঢোকে এবং সহজে বেরোয় না। এমনকি কোন কোন ভুল শিষ্টাচার তার মধ্যে সারা জীবনের জন্য প্রবেশ করে। উদ্যম বাবু এককভাবে আমাদের বাড়ির ছেলে হলেও সে সারা দেশে সব বাড়ির এই রকমের ছেলেদেরই প্রতিনিধি। সব বাড়িতেই উদ্যম আছে। সব বাড়িতেই তাদের মা-বাবা জেঠু আছে। এবং তারা শিখছে তাদের কাছ থেকে। এখন জেঠু যদি টেলিফোনে মিথ্যাচার করে, মা-বাবা যদি সাম্প্রদায়িকতা করে, আত্মীয় পরিজন যদি তার সামনে কোন বাজে কথা- খারাপ কাজ- ঝুঁকির কসরৎ করে, তাহলে সেটা সে শিখবে, সেটার বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু হবে- এটাই স্বাভাবিক।

যেমন আমাদের উদ্যম বাবু শিখেছে, ‘ওরা হিন্দু’। এ হচ্ছে মানুষে-মানুষে বিভেদ শেখার প্রথম পাঠ। নিজেকে বড় কুণ্ঠিত মনো হলো। এটা সে নিশ্চয়ই আমার কাছ থেকেই শিখেছে। আমি জানি তাকে যদি আমি বলি যে, ও কথা বলতে হয় না। তাহলে সে বলবে ‘কেন তুমি যে বললে? মানে সে যে চটপটে, সত্য এবং উচিতকথা বলতে তো দ্বিধা করবে না। অথবা আমিই হয়তো মনে করি ওর তো এ কথা শেখাই উচিত যে, আমি মুসলমান, ও মুসলমান নয়। উদ্যম বাবু আমাকে খুব ভালোবাসে। সেদিন সে হাসতে হাসতেই, যেন ভালোবাসরই প্রকাশ ভেবে আমাকে বললো- ‘তুমি তো বুড়ো মানুষ। আমি খুব খুশি হবার অভিনয় করলাম যে এটা একটা ভালো কথা। কথাটা যে শিষ্টাচার হিসেবে ভালো নয়, সত্য হলেও অসুন্দর সেটা বোঝার বয়স ওর তো হয়নি। অতএব, হেসে উড়িয়ে দাও। এই রকম ক্ষেত্রে বড়রা অসহায়। কিন্তু উদ্যম বাবু ভাবলো জেঠুকে ভালো কথা বললাম, ভালোবাসলাম, খুশি করলাম। তার ভাবনা মোটেই ভুল না। কারণ আমি- আমরা তো তাকে হর-হারমেশাই বলি- তুমি ছোট মানুষ না? এ কথা বলতে হয় না। তুমি বড় হলে কিন্তু আমাকে এই জিনিসটা কিনে দেবে। কিন্তু ওকে ‘ছোট বলাটা ওর জন্য আমাকে ‘বুড়ো’ বলার মতোই কষ্টদায়ক অশোভন কিনা তা তো আমরা ভেবে দেখি না। আমি বুঝতে পারি আমাদের কাছ থেকেই উদ্যম এই শব্দ শিক্ষাটি পেয়েছে। আমাদেরও অপরিনামদর্শিতা ওদের কতভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত করে- বলার নয়। আজকাল তো টিভি খুললেই ধর্ষণের খবর। সমাজের এমন কোন স্তর নেই, যে স্তরের মানুষ ওই দোষে কলঙ্কিত নয়। ধর্ষণের কারণে একে ধরা, ওকে রিমান্ডে নেয়া, ও চিকিৎসাধীন, এর মৃত্যু লেগেই আছে। একদিন আমি, আমার ছোট ভাই এবং বৌমা রাতের খাবার খাচ্ছি আর টিভিতে খবর শুনছি। সেখানে শিশু ধর্ষণ বিষয়ে খবরের ফলোআপ রিপোর্ট পাঠ করা চলছে। হঠাৎ উদ্যম বাবু প্রশ্ন করল- ‘শিশু ধর্ষণ কী?’ পাঠক হয়তো ভারছেন সমাজ চিত্র তুলে ধরার জন্য এ আমি বানিয়ে বানিয়ে লিখছি। না, বিশ্বাস করুন, কল্পচারিতা নয়, এ আমাদের সংসারের সত্য। এবং বহু সংসারের বড়রা যে এই রকমের বিড়ম্বনায় পড়েন তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন উদ্যমের এই প্রশ্নের কী জবাব দিতে পারি আমরা। তার যে জানার ইচ্ছা, তা তো কোন খারাপ লক্ষণ নয়। আবার টিভির নিউজ দেখার সময় তাকে সরিয়ে রাখব সেটাও অনুচিত এবং অসম্ভব। এরই মধ্যে যে ‘ক্যাসিনো’ শব্দটি শিখেছে। আর পুলিশ যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন, দেশ-বিদেশের পুলিশ যেসব কঠিন ধস্তাধস্তি, ধরপাকরের কাজ করে, তাতে তাদের বিষয়ে উদ্যোমের নেগেটিভ ধারণা জন্মে গেছে। এখন সমাজের সত্যপাঠ থেকে তাকে সুরক্ষা দেবে কে? বাংলাও ইংরেজিও না, বরং হিন্দি ভাষা তার ওপর দৃঢ় প্রভাবক হিসেবে প্রকট হয়ে উঠেছে। আমি বলছি না যে, কোন ভাষার প্রভাবক বৈশিষ্ট্য বাচ্চাদের জন্য খারাপ। শুধু সমাজের চিত্রটা তুলে ধরা আরকি। উদ্যমের প্রিয় হচ্ছে একটা কার্টুন ছবি। সেটা হিন্দি ভাষায় নির্মিত। ‘হাঙ্গামা’, নামে নাকি এক চ্যানেল সিরিয়াল আছে, সেইটেই ওই কার্টুন ছবি। পড়া, ঘুমানো আর ঘুমানো বাদে সারাক্ষণ ওই চ্যানেল। উদ্যম বাবু বাংলা আর হিন্দি সমানেই বলতে পারে। হিন্দিটা বুজতে পারে বাংলার চাইতে বেশি। আমি মনে করি এই ছবিটা তার জন্য খারাপ। ওই ছবিতে পিস্তল উঁচিয়ে একজন আরেক জনকে গুলি করে- এমন দৃশ্য আছে। আগ্নেয়াস্ত্র-খেলনা পর্যন্ত আমার বিচারে বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর। এখন কী আর করা যাবে, উদ্যমের এই কার্টুন দেখা বন্ধ করলেই যে তার আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখা, মারামারি দেখা, চোর-পুলিশ দেখা, ধর্ষণের খবর দেখা বন্ধ হয়ে যাবে- তা তো আর নয়। এখন কী করি আমরা। আমাদের দেশে তো কয়েক কোটি উদ্যম রয়েছে। তাহলে তাদের মূল্যবোধ এবং চারিত্র্য ও চরিত্র গঠনের ভবিষ্যৎ কী?

একদিন দুর্নীতি দমন বিষয়ে একটা খবর দেখাচ্ছিল টিভি। বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতির কারণ বিষয়ে কে কি বলছেন সেইটা দেখানো হচ্ছিল। আমি আউট অব কিউরিসিটি ওকে জিজ্ঞেস করলাম- উদ্যম খবরে কী বলছে? তাতে উদ্যম বাবু উত্তর দিল- বলছে যে শর্সের ভেতরে ভূত। এখন ভূতটা তার মনে ধরেছে। কারণ ওটা একটা রূপকথার ক্যারেক্টার। আমিই তো তাকে অনেক ভূতের বই কিনে দিয়েছি। প্রধানত ছবির বই। সঙ্গে সামান্য লেখা- ভূত-পেতনি দৈত্য এসব। এসব যে কল্পনার নামে, রূপকথার নামে নিরেট মিথ্যা কথা, এটা উদ্যমের জন্য সঠিক পাঠ্য বা উপকারী সাহিত্য কিনা, সেটা তো আমি কখনোই ভেবে দেখিনি। অতএব উদ্যমের আর দোষ কী? দোষ আসলে আমাদের বা বড়দের। যে দোষ গিয়ে পরে সমাজের ওপর, রাষ্ট্রের ওপর। নিয়তি বলে কথা। এভাবেই উদ্যম বাবু বড় হবে। একদিন সে সত্যকে আঁকড়ে ধরবে, মিথ্যকে ত্যাগ করবে। অথবা মুখে মুখে সত্যকে আঁকড়ে ধরবে, কিন্তু অন্তরে মিথ্যকে ত্যাগ করবে না বা করতে পারবে না। কেননা মিথ্যা যে অসত্য এ সত্যটা জানতে জানতে তার বিলম্ব হয়ে যাবে অনেক। তত দিনে তার অন্তঃসারশূন্য বিশ্বাস বা মিথ্যাগুলো তাকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। আমি আমাদের দেশের কোটি কোটি উদ্যম বাবুকে ভেবেস্ত্রস্তে শিহরিত হই। তাদের এবং আমাদের জাতীয় ভবিষ্যৎ কী? আমি তো উল্টো খুব ভয়ে ভয়ে থাকি যে উদ্যম কখন আমাকে জিজ্ঞেস করে বসে, উপাচার্য কী, পদত্যাগ কী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কী, রোহিঙ্গা কী? অনেক কিছুই সে ঠিক করে বলতে পারে না। কিন্তু ঠিক ঠিক বুঝতে পারে। হিন্দি ছবির পুলিশের একটা সংলাপ নিয়ে উদ্যম বাবুকে প্রশ্ন করলাম-উদ্যম। ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট’ বললো কেন? তার মানে কী? উত্তর দিলো উদ্যম-জানো না? ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট মানে ‘থানায় চলো’। উদ্যমের বড় বোন হিয়া, সে এখন ভাসির্টিতে পড়ে। ছোট বেলায় সেই মেয়েটা ‘একগ্লাস পানি দাও’র ইংরেজি বলতো ‘গিভ মি এ গ্লাস অব ওয়াটার দাও’!

আমি খুব মজা পেতাম বাঙালির মেয়ে এক গ্লাস জল চাইবে, তা সেটা ইংরেজিতেই হোক আর হিব্রুতেই হোক, তার মধ্যে একটা ‘দাও’ বা ‘দে’ বা ‘দেন’ থাকবে না, তাহলে সেই চাওয়ায় যেন অন্তরের ভাবটা মেটে না। এখন উদ্যমের কথাতেও আনন্দ পাই। ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট’ এর বাংলা অর্থ যা-ই হোক, পরিণতিতে ওই ‘থানায়ই চলো।’

বাচ্চাদের নিয়ে যে এদেশে লাখো কোটি উদ্যামের অভিভাবকরা পেরেসানির মধ্যে আছেন তার দুটো উদাহরণ দিয়ে এই লেখাটা শেষ করতে চাই। একই দিনে ঘটনা। আমি অফিসে আমার রুমে বসে কাজ করছি। কাজ মানে তো কলম পেষা। দরোজায় খট খট শব্দ। আসেন। তিনি জামান ভাই, আমাদের অফিসের আর্টিস্ট। দরোজা ঠেলে জামান ভাই রুমে ঢুকে সামনের চেয়ারে বসলেন। স্যার একটা সমস্যা! কী সমস্যা? আপনার স্যার কোন চেনা-জানা সাইকিয়াট্টিক আছে? মুহূর্তে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুললো। কী ব্যাপার। কার জন্য? তিনি মুখটা নীল করে বললেন তার ছেলের জন্য। একটা বালকপুত্র তার জন্য মনোরোগ বিশেজ্ঞ লাগবে। কেন কী ধরনের সমস্যা? আমি এ কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তার ছেলে রাত দিন গেম নিয়ে আছে। হয় কমপিউটারে না হয় মোবাইল টেলিফোনে খেলা নিয়ে সে মজে আছে। লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম-ঘুম সব তার কাছে এখন তুচ্ছ। গেমের আসক্তি তাকে নাকি এমনভাবেই গ্রাস করেছে যে এখন তাকে মনোচিকিৎসককে দেখানো দরকার। আমি দেখলাম বিপদ তো! বাবার মন পুত্রপ্রেম বলে কথা। প্রথমে আমি তাকেই কাউন্সেলিং করলাম, যেটা তার পুত্রের জন্যও দরকার। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে আজকালকার প্রায় সব বালক-বালিকাই এই ইলেক্ট্রনিকস গেমে অসক্ত। কি করবে, ওরা ভালো রেজাল্ট করার জন্য ওদের যে পরিমাণ চাপে রাখা হয়, অতো মাস্টার, অতো কোচিং ক্লাস, অতো স্কুলের লেখাপড়া, ও তো হলো গিয়ে হোমটিসক। এসব করার পর সে যে বাইরে মাঠে-ময়দানে খেলতে যাবে তার এনার্জি কই? এনার্জি যদি থাকেও তো সময় কই? সময় যদি থাকে তো মাঠ কই যে খেলবে? পুকুর কই যে সাঁতার কাটবে? অতএব হয় টিভি দেখো, হিন্দি সিরিয়ালে না হয় কমপ্যু গেম। একদিক দিয়ে কিন্তু এটাই ভালো, বাইরে গিয়ে সঙ্গ দোষের চাইতে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে ঘরে বসে খেলছে। শরীরে কোন কাজ হচ্ছে না বটে কিন্তু সামান্য আঙ্গুলের ব্যায়ামে মেধা বা মগজের কিন্তু কর্মক্ষমতা বাড়ছে। আই মিন লোড নেয়ার ক্ষমতা। ফোঁস করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন জামান ভাই- স্যার ব্যাপারটা অতো সহজের মধ্যে নেই। গত রাতে ছেলেটা একদমই ঘুমায়নি! আমার স্ত্রী ভোরে নামাজ পড়তে উঠে দেখে তার বাতি জ্বলছে। কী ব্যাপার। সে শুয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন টেপাটিপি করছে। এতটা তো ভালো লক্ষণ নয় স্যার। খেলছে তো খেলাছেই। কোন কাজে বললে শোনে না, খেতে ডাকলে বিরক্ত। তাহলে কীভাবে হবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম স্কুলে রেজাল্ট কি রকম করে। জামান ভাই বললেন ভালো। আমি বললাম তাহলে আর কী? আর কী চান? না স্যার চাই যে একটু রেস্ট করুক, গল্পগুজব করুক। কার সঙ্গে গল্প করবে? আপনি কখন অফিসে আসেন? কত রাতে বাসায় ফেরেন? আপনার স্ত্রী কখন রান্নাবান্না, কাজকর্ম শুরু করেন, কখন ফ্রি হন? আপনার মেয়ের কি কোন বিরাম সময় আছে সারা দিনে। আবার আপনারা যদি সময় বের করেনও তার সঙ্গে আপনার পুত্রের ফুরসত বা অলস সময়টা মিলতে হবে। তাই না? এবার জামান ভাইয়ের মুখে কথা কম! বলুন? কোন কথা বলেন না তিনি। আমি বললাম শোনেন, ওকে কাউন্সেলিং করেন। বোঝান, কাজ হবে।

এই যে আমি আপনাকে বোঝালাম কাজ হলো কি না? সেই রকম। রসিকতা করে আরও বললাম সাইকিয়াট্টিকের কাছে গেলে তিনি তা আগে আপনার প্রেসক্রিপশন লিখবেন। জামান ভাই হাসতে হাসতে বিদায় নিলেন।

আশ্চর্য! জামান ভাই যাবার পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে টেলিফোন করলেন হামিদ ভাই। মানে হামিদুল ইসলাম। তিনি সংবাদের আজীবন বা আমৃত্য পাঠক। সেই সুবাদে আমার সঙ্গে যোগাযোগ এবং যাকে বলে হার্দ্যকি সখ্য। ওমা তিনি ফোনে ঠিক জামান ভাইয়ের কথাটারই কার্বনকপি বললেন- ভাই আপনার চেনাজানা কোনো শিশু সাইকিয়াট্রিক আছে? আমি তো অবাক।

একেবারে আউটডোরে রোগী দেখার মতো। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কী ব্যাপার বলুন তো। কেন? কার জন্য? তো উত্তরে তিনি যা বললেন তাতে আমার চক্ষু চড়ক গাছ। একবার মনে হলো তাকেও সেই প্রেসক্রিপশনটাই করি- যেটা জামান ভাইকে করেছি মাত্র কিছুক্ষণ আগে, যে আপনাকেই কিন্তু ডাক্তার সাহেব ওষুধ লিখে দেবেন। যাই হোক তিনি বললেন তার নাতনির বয়স বছর চার-পাঁচ। প্লে গ্রুপ পার হয়ে কেজি ওয়ানে মনে হয় পড়ে। স্কুলও অভিজাত। মাইনাপওর কম নয়। শো-শার বেলায় ষোলো আনা। কিন্তু স্কুলে ভালোই যাতায়াত করছিল যেই নাতনি, সেই কিনা এখন বেঁকে বসেছে। এমনই নাকি বাঁকা যে, তাকে আর সোজাই করা যাচ্ছে না। সেই জন্য তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেয়ার কথা ভাবছেন। হাজার হলেও গ্র্যান্ডফাদার বলে কথা। তো আমি তাকে বললাম নাতনি বেঁকে বসেছে বুঝলাম। কিন্তু কেন, কোথায় বেঁকেছে তা তো ভাই বুঝলাম না। একটু ভেঙে বলবেন? এবার তিনি ভেঙে বললেন, তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তার নাতনি অতিশয় শিশু। কেজি ওয়ান বা এই রকমের একটা নিচু ক্লাসে পড়ে। তার একটা ঠাণ্ডা লাগা নিয়েই স্কুলে যেতে হয়েছে। তো ক্লাসের ভেতর সে এক দুইবার কেশেছে স্বাভাবিকভাবেই তাতে একটু শব্দ হয়েছে। ব্যাস; মাস্টার মশাই তাকে বকা দিয়েছেন, ভর্ৎসনা করেছে। এটাই যথেষ্ট ছিল। অথবা তিনি ওই মেয়ের গার্ডিয়ানকে বলে দিতে পারতেন যে কয়দিন ওর কাশি না সাড়ে ক্লাসে আসা দরকার নেই। কিন্তু না- মূর্খের হাতে ক্ষমতা থাকলে যা হয়। মাস্টার মশাই তাকে ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছেন! ছোট্ট মেয়ে জীবনে প্রথমে অপমান। ব্যাস তার পরদিন থেকে শিশুটি বেঁকে বসেছে, সে আর স্কুলে যাবে না। কেন? স্কুল ভালো, টিচার ভালো না! মেয়েটির কাশি এসেছে, কেশেছে, একটু শব্দ তো হবেই। তো তাতে অপরাধ কী? অপরাধ যদি হয়ও তাহলে সেটার মাত্রা কি এতই বেশি যে, তাকে ক্লাস থেকেই বের করেই দিতে হবে? ওই শিশুটি জানে না, ভবিষ্যতে এই রকমের বহু শিক্ষকের সঙ্গে তার দেখা হবে। যার শব্দ করে অথবা নিঃশব্দে অনেক বড় বড় অপরাধ করেন। কিন্তু তাদের ক্লাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা খুব কমই ঘটে। এ শিশুটিই বড় হয়ে দেখবে বহু শিক্ষক, বহু বড় পজেশনের মানুষ, বহু শিস্টাচার জানেন না, বহু ভব্যতার ধারে কাছে নেই। তারা সামাজিক ম্যানার্সসহ খেতে জানেন না, টুথপিগ ব্যবহার করতে জানেন, হাঁচি কাশি দিতে তো জানেনই না। এ মেয়েটি বড় হয়ে অনেক মাদরাসা শিক্ষকের, অনেক প্রধান শিক্ষকের, অনেক অধ্যক্ষের, অনেক উপাচার্যের বিষয়ে অনেক আপত্তিকর খবর শুনবে-দেখবে পড়বে। কিন্তু তাদের কাউকেই বের করে দেয়া হবে না।

এই হচ্ছে পরিস্থিতি। এখন মেয়েশিশুটির নানা ভদ্রলোক হামিদুল ইসলাম আমাকে ফোন করলেন যে আমার চেনা জানা কোন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন কিনা। আমি এখন কী জবাব দেব তাকে। বলেছি যে না- নেই।

তারপরের ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে অবশ্যি আমি আর অপেডেট জানি না। শিশুটি স্কুলে যেতে সম্মত হয়েছে কিনা বা গিয়েছে কিনা! কিংবা নানা ভদ্রলোক সত্যি সত্যিই তাকে নিয়ে মনোচিকিৎসসকের কাছে গিয়েছেন কিনা! যদি গিয়ে থাকেন তাহলে ডাক্তার সাহেব তার নাতনির জন্য কোন চিকিৎসা দেন আর নাই দেন, ওই শিক্ষকের জন্য কোন চিকিৎসা দিয়েছেন কিনা! নানা ভদ্রলোককেও ডাক্তার রোগী বিবেচনা করে বসতে পারেন, বলা যায় না। কারণ আমার বিবেচনায় এখানে মূল রোগী ওই শিক্ষক, কেননা তারই সংক্রমন ঘটবে ক্লাসের সব শিশুর মধ্যে, যার ফলাফল ভয়াবহ হতে বাধ্য।

এই লেখার নায়ক বা প্রধান চরিত্র শিশু উদ্যম বাবু। দ্বিতীয় চরিত্র জামান ভাইয়ের পুত্র, তৃতীয় জন হলো হামিদুল ইসলামের নাতনি। জীবনের সমাজপাঠ থেকে তো এদের রেহাই নেই। তাদের ফ্রেস এবং বহু স্পেসসহ যে নিঃকলুষ হৃদয়টি তার জন্য অপেক্ষা করছে হাজারটা অসঙ্গতির কড়াল বীভৎস। কিন্তু কি আর করা এর ভেতর দিয়েই তাদের বেড়ে উঠতে হবে। আর যেটা হতে পারে সেটা হলো স্বপ্নের সমাজের জন্য প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষা কেন? প্রতীক্ষা এ জন্য যে, সমাজ বিনির্মাণের জন্য তো আমরা যথযথ কাজ করি না, দায় নিই না। এও কিন্তু সাইকোস্যোসীয় এক ধরনের বিমার-বেদনাই বটে। আমি, জামান ভাই, হামিদুল ভাই সমাজ গড়ার কোন দায় নেব না। কিন্তু ভোগ করতে চাই ষোলো আনা! তা কেন?

[লেখক : কবি ও গবেষক]

bilukabir21@gmail.com