• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৪,৭ শাবান ১৪৩৯

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও বাংলাদেশ

মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী

| ঢাকা , সোমবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৭

‘সবার জন্য টেকসই ও সমৃদ্ধ সমাজ’- এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব গত ৩ ডিসেম্বর ২০১৭ রোববার পালন করল ২৬তম আন্তর্জাতিক ও ১৯তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস। বাংলাদেশ কাগজে-কলমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি অন্যের অনুগ্রহ ও দয়া নির্ভর ‘কল্যানমূলক’ নীতি থেকে ‘অধিকারমূলক’ নীতি গ্রহণ করলেও কার্যত কল্যাণমূলক নীতিই বহাল থাকায় প্রতিবন্ধী নাগরিকের অধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়নি। আইন অনুযায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে, প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী নাগরিকের পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণের অধিকার থাকলেও বাস্তবে সর্বস্তরে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিবন্ধী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত গতকালের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও সরকার কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মূলমঞ্চে ঠাঁই দিতে চায়নি। প্রবল সমালোচনার মুখে অবশেষে অনুষ্ঠান মঞ্চে যায়গা পেয়েছিল একজন পঞ্চমশ্রেণী পড়–য়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু। দেশের আড়াই কোটি প্রতিবন্ধী মানুষকে শিশুটি কতটা কার্যকরভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছিল সেটা সময় বলে দেবে। তবে প্রকৃত অর্থে টেকসই ও সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই গণজীবনের সর্বস্তরেপ্রতিবন্ধী নাগরিকের অবাধ, সমান ও কার্যকর অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার দলিল/কনভেনশেন গ্রহণ করলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কনভেনশন তৈরির বিষয়ে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করে। ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে মোট তিনবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (সিআরপিডি) খসড়া উপস্থাপন করা হলেও সেগুলো গৃহীত হয়নি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংস্থাগুলোর নেতাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও নিরলস প্রচেষ্টায় অবশেষে ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ-সিআরপিডি পাস হয় এবং ২০০৮ সাল থেকে বিশ^ব্যাপী কার্যকর হয়। বাংলাদেশ কোনরকম রিজার্ভেশন ছাড়াই ২০০৭ সালে সিআরপিডি এবং ২০০৮ সালে এ সনদের অপশনাল প্রটোকল স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে। অপশনাল প্রটোকল অনুযায়ী বাংলাদেশের যে কোন প্রতিবন্ধী নাগরিক দেশের প্রচলিত আইনে নিজের অধিকার আদায় করতে ব্যার্থ হলে সরাসরি জাতিসংঘে প্রতিকার চাইতে পারবে।

বিশ^ নেতারা আন্তর্জাতিক সনদের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে বিলম্ব করলেও বাংলাদেশ ২০০১ সালেই প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন প্রণয়ন করে। তারও পূর্বে ১৯৯৭ সালে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মে এতিম ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাসহ ক্যাডার সার্ভিসে প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের জন্য ১% কোটা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২০০৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সিআরপিডির অধিকাংশ অনুচ্ছেদকে রাষ্ট্রীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। একইভাবে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ এবং এ দুটো আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের সুবিধার্থে পৃথক দুটো বিধিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার।

ইতোমধ্যে মোটরযান আইন সংশোধন করে প্রতিবন্ধীবান্ধব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। লুনেসি অ্যাক্ট বাতিল করে মানসিক স্বাস্থ্য আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ বিধান সম্বলিত শিক্ষা আইন ও বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া সংসদে উত্থাপনের জন্য অপেক্ষমাণ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে সরকারের এসব শুভ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আইনগতভাবে বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করা হলেও সেগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভোগ করতে পারছেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক অধিদফতর প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও এখনও সে অধিদফতর আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৩ সালের আইনের তফশিলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ ষোলোটি বিষয়ে ৮২টি সুনির্দিষ্ট কর্মকা- গ্রহণের কথা লিখা হলেও এগুলো বাস্তবায়নের জন্য অদ্যাবধি কোন জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। আইন অনুযায়ী গণস্থাপনাগুলো প্রবেশগম্য হিসেবে তৈরি/সংস্কার করার কথা থাকলেও কোথাও সে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। প্রবেশগম্যতা নেই বলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে অধিকার ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণ ও কর্মক্ষেত্রে রিজনেবল অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নের নজির নেই।

আইন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য নিষিদ্ধ হলেও খোদ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহন পর্যন্ত করতে দেয়া হচ্ছে না। কোটার মাধ্যমে পিএসসি প্রত্যেক বিসিএস পরীক্ষায় ২-১ জন প্রতিবন্ধী প্রার্থীকে ক্যাডার হিসেবে মনোনয়ন দিলেও; ১% হিসেবে প্রাপ্য পদের তুলনায় নিয়োগকৃত পদের সংখ্যা নগণ্য। বিচারক নিয়োগের কমিশনটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য কোটা সুবিধাতো দিচ্ছেই না, উল্টো এর বিরুদ্ধে মেধাবী প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরপর ৬ বার প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরও একজন প্রতিবন্ধী প্রার্থীকে প্রতিবারই মৌখিক পরীক্ষায় ঝরিয়ে দিয়েছে এ কমিশন। প্রতিবন্ধী প্রার্থীর প্রতি নিয়োগ কর্তৃপক্ষের বৈরী মনোভাবের কারণে শিক্ষিত প্রতিবন্ধী বেকারের সংখ্যা বাড়ছে হু-হু করে।

২০১৩ সালের অধিকার আইনের অধীনে প্রত্যেক জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি করে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা সংক্রান্ত কমিটি’ থাকবার কথা। এ কমিটির কাজ মূলত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা বিষয়ক জেলা পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি কার্যাদির মধ্যে সমন্বয় সাধন, মনিটরিং এবং সুষ্ঠু সম্পাদনের লক্ষ্যে নির্দেশনা প্রদান। প্রতিবন্ধিতার কারণে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিকার চাইলে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের আদেশ প্রদান সহ অন্যান্য প্রতিকার প্রদান করার দায়িত্বও এই কমিটির। অধিকাংশ জেলাতেই গুরুত্বপূর্ণ এই কমিটি গঠিত না হওয়ায় এবং যেসব জেলায় কমিটি গঠিত হয়েছে সেগুলোর সভা নিয়মিত না হওয়ায় আইনটির বাস্তবায়ন তথা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অধিকার আইনের ৪র্থ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এ বছর ৯ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় সহস্রাধিক আশাহত ও ক্ষুব্ধ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ঢাকার প্রেসক্লাবের সম্মুখে ‘প্রতিবন্ধী নাগরিক ঐক্য’ এর ব্যানারে সমবেত হয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর এ অসন্তোষ নিরসনের উদ্যোগ নেবেন।

বিশে^র বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ডিজঅ্যাবল্ড পিপল’স অর্গানাইজেশন-ডিপিও’ গঠণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছেন। জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ, ন্যাডপো, পিএনএসপি এবং এনএফওডব্লিওএর অধীনে বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলায় কয়েক হাজার ডিপিও ও সেল্ফ হেল্প গ্রুপ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করছে। তাদের পরিশ্রমী আন্দোলনের ফসল হল সিআরপিডির আলোকে প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩। যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবী ও বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অকৃত্রিম বন্ধু হেজি স্মিথের (গবেষক, হারভার্ড ল’ স্কুল অন ডিজঅ্যাবিলিটি) মতে ২০১৩ সালের অধিকার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডিপিওগুলো যেভাবে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিল ঠিক সেইভাবে আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও তৃণমূলের ডিপিও নেতাদের পালন করতে হবে। সম্প্রতি তিনি এ আইনের সফল প্রয়োগের বিষয়ে ডিপিওগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্কিন অর্থ সহায়তায় বাংলাদেশের ৮টি জেলায় প্রাথমিকভাবে ৮টি ডিপিওকে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বৈষম্য, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সম্পদ কেড়ে নেয়া, জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের আইনের আওতায় পরিকল্পিতভাবে ও ব্যাপক পরিমাণে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে ডিপিওগুলোকে উদ্বুদ্ধ ও সক্ষম করার লক্ষ্যে এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ^াস করি।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট অব বাংলাদেশ এবং রিসার্স স্পেশালিস্ট, ব্লাস্ট]

advreja@gmail.com