• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৪ রমজান ১৪৪০

আত্মনির্ভরশীলতাই নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়

আফরোজা তালুকদার

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

নারী মা, নারী কন্যা, নারী বোন, নারী ভগনী এবং নারী স্ত্রী। তবুও প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে, পাচার হচ্ছে, যৌতুকের বলি হচ্ছে। বিভিন্ন সময় ইভটিজিং এর শিকার হয়ে বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। বিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার মাঝেও দেখা যাচ্ছে হাজার বছর আগে পরিয়ে দেওয়া শিকল এখনও নারীর পায়ে। পুরুষশাসিত স্বার্থান্বেশী সমাজ এখনও পারেনি নারীদের নিরাপত্তা দিতে। এখনও নারীরা মানুষ পরিচয়ের চাইতেও নারী হিসেবেই পরিচিত বেশি।

একজন নারী শিক্ষকের হাতে, নিকট আত্মীয়, পরিচিত জনের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। নির্যাতিত হচ্ছে তার সহকর্মীর হাতে। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নারী নিশ্চিন্তে নিরাপদ। আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজের অনেকেই বলে থাকেন, নারী ধর্ষিত হচ্ছে তার অশ্লীলতার জন্য। তাহলে পাঁচ বছরের কন্যাশিশুটিকে অশ্লীলতার কোন মোড়কে ব্যাখ্যা করবে সমাজ?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নারী। দেশে সমাজে নারীর অবস্থান সন্তোষজনক। তারপরও দেশের অনেক নারী কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কর্মজীবনে প্রবেশ করার সুপ্ত বাসনা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেও ৫০ ভাগ শিক্ষিত নারীদের এখনও তাদের স্বামী বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের উপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। যদিও বদলেছে সমাজ, কিন্তু এখনও অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নারীদের অভিভাবক মনে করে নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেয় পরিবারের নারীটির ওপর। সন্তান পালন, সংসার দেখাশুনা, স্বামীর সেবা করাই যেন নারীর একমাত্র কাজ। এমন ভাবনা থেকে নারীদের আবদ্ধ করে রাখা হয়, রাখা হয় কর্মবিমূখ করে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বনির্ভর হতে পারছে না অনেক শিক্ষিত নারী। ফলে স্বামী কিংবা অন্য পুরুষের দয়ায় তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। কারণে অকারণে পুরুষ দ্বারা নারীরা বিভিন্ন সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ফলে অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকা নারীটি সবসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। সে নিজেকে অক্ষম মনে করতে থাকে, অন্যের বোঝা মনে করতে থাকে। স্বামীকে তার অসহায় জীবনের একমাত্র অবলম্বন মনে করতে থাকে। সে ভুলে যায় সেও সক্ষম, পুরুষটির মতো সেও কাজ করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। তারও কাজ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অবরুদ্ধ থাকতে থাকতে একসময় সে ভুলে যায়, একসময় সে পড়ালেখা শিখেছে। এসব নারীদের অনেকেই হয়তো ইচ্ছে করলেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতো। বদলে দিতে পারতো নিজের অবস্থান। সঙ্গী হতে পারতো দেশ ও উন্নয়নের সঙ্গে।

যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কর্মবিমূখ রেখে কোনো দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। যারা সকল বাধা বিপত্তিকে পিছনে ফেলে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলেছেন, তারা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। সন্তান জন্মদান, লালন পালন করে যাচ্ছেন। এসব নারীরা প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন, একজন পুরুষ যতটা কাজ করতে পারে নারীরা তার চেয়ে কোন অংশে কম নন। নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের কৃতিত্ব দেখাতে সক্ষম। আমাদের দেশের অনেক নারী এখন আগের চেয়ে সচেতন। তারা এখন শুধু ঘরকন্যার কাজের মাঝেই নিজেকে আবদ্ধ রাখেন না, সংসারের জন্য উপার্জন করে অবদান রাখেন সংসারে। আমাদের নারীদের এখন সাংবাদিকতা, আইনশৃংখলা বাহিনী, বৈমানিক ও হিমালয়ের শৃঙ্গ জয় করাসহ এমন কোনো কাজ নেই যেখানে তাদের পদচারনা নাই। নারীদের মুক্তির জন্য তাই এগিয়ে আসতেই হবে। কাজের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে নারীদের কাছে আছে আত্মনির্ভরশীলতা। নারীর শিক্ষা যথার্থই কাজে দিবে নারীর মুক্তির ক্ষেত্রে। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের স্বনির্ভর হতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তিই নারীদের প্রকৃত মুক্তি। সমাজে যখন অর্থনৈতিক সাম্য চলে আসবে, তখন সমাজে একটি সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকবে, যেখানে নারী আপন মহিমায় স্বাধীন ও মর্যাদার অধিকারী হবে। সব নির্যাতন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে পুরুষের পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। নারীর প্রকৃত মুক্তি তখনই হবে, যখন তারা সুশিক্ষায় আলোকিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং অবদান রাখতে পারবে পরিবার ও সমাজে। নারীর কাজের স্বীকৃতি এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর স্বনির্ভরশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সরকারের বহু উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়নের পরও এখনো নারী নির্যাতনকারীদের সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়ার পরও এখনো নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। এখনও প্রচলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুশাসনের জালে আবদ্ধ নারীরা। আর্থসামাজিক পরিবেশ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার নারীর অধিকারকে করে আজও লঙ্ঘিত করে।

প্রকৃতপক্ষে নারীর আত্মনির্ভরশীলতাই পারে কেবল নারীর প্রতি নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধ করতে। নারী নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নারীর অবদানের মূল্যায়ন করতে হবে। পারিবারিক সংহতি হ্রাস পাওয়ার কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে। পরিবার থেকেই শিশুকে মানবিক মূল্যবোধ ও নারীকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে আমাদের শিশুরাই বড় হয়ে তবে নারীকে সম্মান করতে শিখবে। আমাদের শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সচেষ্ট হতে হবে। সমাজ ও দেশের উন্নয়নে কাজ করতে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নারী ও পুরুষ উভয়ের অবদানকে সমানভাবে মূল্যায়ণ করতে হবে।

পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সব জায়গায় নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে আমাদের। তাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার কাজ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে গণমাধ্যম, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক এবং জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন সবার সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা, সচেতনতা এবং সহযোগিতা।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)