• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৮ ফল্গুন ১৪২৬, ২৬ জমাদিউল সানি ১৪৪১

আজি এ বসন্তে...

সামসুজ্জামান

| ঢাকা , শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। তবে ছয় ঋতুর মধ্যে সবচেয়ে নয়নাভিরাম এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বসন্ত সবার মনকে করে পুলকিত এবং আন্দোলিত। এ জন্যে বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হয়ে থাকে। সর্ব গুণে গুণান্বিত এই ‘বসন্ত’ তাইতো হয়েছে কবির ছন্দের মালা, বাউলের বাশীর সুর প্রেমিকের উদ্বেলিত মনের খোরাক। শিল্পীর কণ্ঠের মূর্ছনায় যেন এক অনাবিল মাদকতা। ‘আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে, কত পাখি গায়’ সুরের যেন কোকিলের কষ্ঠ মিশে একাকার হয়ে যায়। ফুর ফুরে জ্যোৎনা আর নির্মল বাতাসে রাতের বসন্ত যেন অন্য এক পরশ বুলিয়ে যায়।

মাঘ মাসের শেষে হালকা শীতের পরশ জানান দেয় বসন্তের আগমনী বার্তা। কোকিলের কুহু কুহু ডাক যেন আরও বেশি স্পর্শ কাতর হয়ে এ বার্তাকে সজাগ করে দেয়। শিল্পীর তুলির আঁচড় যেন আরও পরিস্ফুটিত হয় এই ঋতুতে। শিল্পীর অনেক অজানা চিন্তার বহিপ্রকাশ ঘটে বসন্তে। তাই তো তার আঁচড় শেষ হয় না। আনমনে একে যান তিনি তার অজানিত বাংলা কৃষ্টির অনেক কিছুই। কবির কবিতা যেন ফুরায় না। একের পর এক শব্দের মালা গেঁথে চলেন তিনি।

আমাদের দেশে বস্ত উৎসব মহাসমারহে পালিত হলেও আমরা খুব কম সংখ্যকই জানি বসন্ত বরণের আদি ইতিহাস। পূর্ব এশিয়ায় ‘নিয়ন’ নামে ছিল এক অপদেবতা। শীতের শেষে সে হয়ে উঠতো উন্মুত্ত। সে এতটাই রক্ত পিপাসু হয়ে উঠত এই সময় যে, ছোট বাচ্চাদের ধরে তাদের খেয়ে ফেলত। চীনের মানুষ তখন চিন্তায় পড়ে গেল। তারা যে কোন প্রকারে এই দেবতা রুখতে বিভিন্ন পথ অবলম্বব করে চলতো। অবশেষে দেখা গেল এক মাত্র লাল রং দেখলেই ‘নিয়ন’ দেবতা পালিয়ে যায়। এটা ১৭০০ শতাব্দির কথা। শীতের পর বসন্তে যখন গাছে ফোটে লাল ফুল চারিদিকে লালের সমারোহ তখন আর ‘নিয়ন’ থাকে না। তখন থেকে চীন দেশে বসন্তের আগমন উপলক্ষে শুরু হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। চীনের সাধারণত জানুয়ারির ২১ তারিখ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শুরু হয় নববর্ষ। নববর্ষকে তারা ‘চুন ইং’ বলে থাকে। জাপানে চেরিফুল তাদের ভাষায় ‘সাকুরা’ দিয়ে তারা বসন্তকে বরণ করে থাকে। বসন্তকালকে তারা পবিত্র মাস হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকে। এই উৎসবকে তারা ‘হালামী’ বলে উল্লেখ করে থাকে। কোরিয়ায় বসন্তকে বরণ করা হয় ভিন্ন ভাবে। প্রতিটি বাড়িকে সুসজ্জিত করা হয় লাল ফুল দিয়ে। খাবার দাবারের ব্যাপক আয়োজন করা হয়ে থাকে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে ইরানের ‘শাহনামা আব জরুত্রুস্ত্রিয়ান’ লোকগাঁথা থেকে জানা যায় রাজা জামসিদের আমল থেকে বসন্ত বরণ উৎসবের প্রচলন হয়েছে। এই উৎসবকে তারা ‘নওরোজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রায় তিন হাজার বছর পূর্ব থেকে এই উৎসব চলে আসছে। ‘নওরোজ’ ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপ জুড়ে। ২০১০ সালে জাতি সংঘের সাধারণ পরিষদে ‘নওরোজ’ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বসন্ত বাংলার ঐতিহ্যময় একটি ঋতু। বসন্তের আগমনী জানাতে গ্রামেগঞ্জে পাড়ায় মহল্লায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়ে থাকে। শহরে বসন্ত পালিত হয় ভিন্ন মাত্রায়। বসন্ত মেলা, বসন্ত বরণ উৎসব পালিত হয় বিভিন্ন আঙ্গিকে। সপ্তাহ, ১৫ দিনব্যাপী চলে নাচ, গান, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। বাঙালি স্বত্বার সঙ্গে বসন্তের যেন নাড়ির সম্পর্ক। আর তাই হয়ত আমরা এই ঋতুকে বরণ করতে উন্মুত্ত হয়ে যাই। বিভিন্ন আঙ্গিকে বরণ করে থাকি বসন্তকে।

বাংলায় বসন্ত আসে নতুন রূপে। গাছে গাছে ফুলের সমারহ। নতুন কুড়ির মৌ মৌ ঘ্র্রাণ যেন মাতাল করে দেয় আমাদের। সেই সঙ্গে কোকিলের মন মোহিনী কণ্ঠ আরো মাতোয়ারা করে দেয়।

বাংলায় ১৪০১ সাল থেকে বসন্ত উৎসবের শুরু। এর আগে ইউরোপে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রচলন হয় উৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দুই মাসে কিছু আচার অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়ে থাকে। শান্তি নিকেতনে খুব বড় আয়োজন করে পালিত হয়ে থাকে বসন্ত উৎসব। ভারতের মূলত বাঙালি অধ্যুসিত প্রদেশ যেমন আসাম, ঝড়খ-, পশ্চিম বাংলা, রাজস্থান, ত্রিপুরা, বিহারে ধূমধামের সঙ্গে পালিত হয় বসন্ত উৎসব, যা জাতীয় বসন্ত উৎসব হিসেবে তারা আখ্যায়িত করে থাকে।

বাংলাদেশে বসন্ত উৎসবকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে থাকে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি। এছাড়া উদীচী, তির্যক, রংধনুর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরো মাসব্যাপী আয়োজন করে থাকে বসন্ত বরণ উৎসব উপলক্ষে কর্মসূচি।

বসন্তকে বরণ করতে মেয়েরা সাজে বাসন্তী রঙ্গের শাড়িতে। পুরুষরাও একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোশাক পরে থাকে। আর তাই হয়তো শিল্পীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘একি আনন্দ, একি বসন্ত, আজ তোমারই কুঞ্জ দ্বারে,’ গানের সুমধুর ধ্বনি।

বাঙালি লোকজ কৃষ্টিতে বসন্তের বিকল্প একমাত্র বসন্তই। মাতোয়ারা করা বসন্ত। ঝাঁক বেধে সাদা বকের উড়ে যাওয়া, কোকিলের মিষ্টি সুরের ধ্বনি, কাঁশ বনের নরম ছোয়ায় মনের আকুতির বহিঃপ্রকাশ, ফুর ফুরে মনে বুক ভরে নির্ভেজাল নিঃশ্বাস নেওয়া যেন বসন্তকে চিরবসন্ত ঝরে রাখার প্রয়াস।

এক সময় বসন্ত বরণকে সনাতনী কৃষ্টিহিসাবে আখ্যায়িত করা হতো, যা আজ বাংলার কৃষ্টি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সব বাঙালির মনে। বাংলায় গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত, হেমন্ত, শীত সব ঋতুই আসে পর্যায়ক্রমে কিন্তু বসন্তের মতো বাঙালির প্রাণে আসন করে নিতে পারেনি কোন ঋতুই। বসন্তের ঝিরি ঝিরি হাওয়ায় মানুষ যেন একাকার হয়ে যায়।

গাছে গাছে নতুন পাতা, নতুন কুড়ির সমারহ পাতাহীন কৃষ্ণচূড়া গাছে বড় বড় পাঁপড়ি ওয়ালা লাল ফুলে পাখির কলতান, সরিসা ক্ষেতে মৌমাছির মধু আহরণ সব কিছু যেন এক নতুনত্বের পরশ বুলিয়ে দেয় মানুষের মনে। হলুদ সরিষা ক্ষেত দেখে চোখ এবং মন জুড়িয়ে যায়।

চাঁদনী রাতে কোন বাঁশরীয়ার বাঁশির সুর উতলা করে সবাইকে। এসব কথা লিখে বুঝাবার নয়। শুধু অনুভব করা যায়।

বসন্ত উৎসব উপলক্ষে বসন্ত মেলার প্রচলন এখন গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের যুবকরা ফাঁকা মাঠের মধ্যে ব্যানার টাঙিয়ে লোকগীতি, কবিয়াল গান দিয়ে এ মেলার আয়োজন করে থাকে। আবাল বৃদ্ধ-বণিতারা সবাই যোগদেয় এ মেলায়। ছোট ছোট দোকানের পসরা মেলাকে আরও প্রাণ বস্তু করে তোলে। কোন ধর্ম ভেদাভেদ থাকে না এখানে। সবাই একাট্টা হয়ে উৎসাহ জোগায় আয়োজক যুবকদের। গ্রামের মেয়েরাও সাধ্যমতো চেষ্টা করে বাসন্তী রংয়ের শাড়ি পরতে। অনেকে বিয়ের হলুদের কাপড়ও ব্যবহার করে এ উপলক্ষে।

বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টি আজ বহুলাংশে মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং পড়ছে। অনেক কিছুই আজ হারিয়ে গেছে বাংলা থেকে যা আমাদের লোকগাঁথা হয়ে ছিল। এতকিছুর মধ্যেও বসন্তবরণ উৎসব আমাদের উৎসাহ জোগায়/ পুরোনোকে ফিরে পাওয়ার আশায়। এখন তাই আমরা স্বপ্ন দেখি। হয়ত এই আশা বাস্তব হয়ে দেখা দেবে একদিন।

[লেখক : কলামিস্ট]

তারিখ: ১২.০২.২০২০

shamsuzzaman07@gmail.com