• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৮ রবিউস সানি ১৪৪১

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

অবকাঠামোগত বাস্তবতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৯

বাস্তবতা

জনসংখ্যার ঘনত্বে আমরা বিশ্বে ১২তম এবং জনসংখ্যা হিসাবে বিশ্বে অষ্টম। WHO-এর চাহিদামতো ১০০০ জন মানুষের জন্য ১ জন ডাক্তার প্রয়োজন।

বহির্বিভাগ : প্রতিটি ডিউটি আওয়ারে একজন ডাক্তার ১০ মিনিটে ১ জন করে অনধিক ৩০ জন রোগী দেখতে পারবেন যা আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষিতে এই চিন্তা করাও দুরূহ বিষয়। ডিউটি আওয়ারে একজন ডাক্তার যদি ভালোভাবে একজন রোগীকে দেখতে চান তাহলে ১০ মিনিট সময় অবশ্যই লাগবে সেক্ষেত্রে একজন ডাক্তার অনধিক ৩০ জন রোগী তার ডিউটি আওয়ারে দেখতে পারেন। একবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে যদি চিন্তা করা যায় তাহলে চিকিৎসার বিভিন্ন স্তরে সমস্যাগুলো নিম্নরূপ-

ইউনিয়ন পর্যায়ে : WHO-এর চাহিদামতো ৪৫৫০টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ৪০ জন ডাক্তার থাকার কথা সেখানে ১ জন মাত্র ডাক্তার প্রায় ৪০ হাজার লোকের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত থাকলে, তার ওপর রয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, ভাঙাচুরা দালানের মধ্যে প্রায়ই সেখানে ডাক্তারের বসার ব্যবস্থাও ঠিকমতো থাকে না। আরও রয়েছে SACMO’দের দৌরাত্ম্য- স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের হুমকি-ধমকি এবং নিরাপত্তার অভাব (স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রায়শই আশা করেন ডাক্তার তার বাসায় যেয়ে তাকে দেখে আসবে)। তার ওপর রয়েছে :

ওষুধের অপ্রতুলতা

ন্যূনতম রোগ নির্ণয়ের কোন ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়তে হয় ডাক্তারকে।

উপজেলা পর্যায়ে : ৪৯২টি উপজেলায় প্রতিটিতে যেখানে ৩৪০ জন ডাক্তার প্রয়োজন সেখানে একটি উপজেলা হাসপাতালে স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগপ্রাপ্ত হন তদুপরি রয়েছে উপযুক্ত দক্ষ জনবলের অভাব এবং ডাক্তারদের বাসস্থানের অভাব।

বহির্বিভাগ সেবার ক্ষেত্রে যেখানে একজন ডাক্তার ডিউটি আওয়ারে সর্বোচ্চ ৩০ জন রোগী দেখতে পারেন অথচ সেখানে একজন চিকিৎসককে ডিউটির আওতায় ১০০-১৫০ এমনকি কখনও ২০০ জন রোগীকে সেবা দিতে হয়।

যেহেতু উপজেলা পর্যায়ে কোন ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার-এর পদ নেই এবং একজন রোগীর ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্টেরও কোন ব্যবস্থা না থাকায় কোন ইমার্জেন্সি পরিস্থিতির উদ্ভব হলে ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণে কোন ধরনের ইমার্জেন্সি পরিস্থিতিতে সহজেই ডাক্তাররা রোগীদের আক্রমণের শিকার হন।

ইমার্জেন্সি রোগী রেফারেলের ক্ষেত্রেও সমস্যা-অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা।

জেলা পর্যায়ে : ৬৪টি জেলায় প্রতিটিতে ২৬ লাখ মানুষের বাস হলে প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী সেবাদানের জন্য ২ হাজার ৬০০ ডাক্তার প্রয়োজন জেলা হাসপাতালে। জেলা হাসপাতালে বেড প্রয়োজন কমপক্ষে ২৫০টি।

সমস্যাগুলো :

ডাক্তার স্বল্পতা বিশেষ করে প্রতি ইউনিটে (মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ইত্যাদি) শুধু ১ জন বিশেষজ্ঞ ও একজন সহকারী রেজিস্ট্রার দিয়ে চলে।

সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত বেডের অভাব।

বিশেষায়িত পরীক্ষা-নীরিক্ষার অভাব/ স্বল্পপরিসরে ওষুধের সরবরাহ।

ডাক্তারদেরও বাসস্থানের অভাব।

স্থানীয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের দৌরাত্ম্য।

মেডিকেল কলেজ : দেশে মোট মেডিকেল কলেজ ১১১টি (সরকারি-বেসরকারি) শিক্ষক দরকার ২৫,৫০০ আছে ৯,৫০০ অর্থাৎ ৬৩% শিক্ষক নেই। শিক্ষক স্বল্পতা সবচেয়ে তীব্র বেসিক সাবজেক্টগুলোতে (এনাটমি, ফিজিওলজি ইত্যাদি) অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর (কিছু কিছু পদে) শিক্ষায় মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এছাড়া অবকাঠামোগত দুর্বলতাতো আছেই, আছে পর্যাপ্ত রোগীর অভাব, যার ফলে কিছু কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে যারা ডাক্তার হিসেবে বের হচ্ছেন চিকিৎসক হিসেবে তাদের মান ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যা জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।

প্রস্তাবনাগুলো : সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে গ্রামে চিকিৎসক পদায়নের জন্য রিমোট ইনসেনটিভ চালু করা হয়েছে। আমাদের দেশেও যদি তা চালু করা যায়, সময়মতো পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, যেমন চিকিৎসকদেও বাসস্থান ও সর্বোপরি নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়, উপরোক্ত বাধাগুলো (ইউনিয়ন ও উপজেলা) দূর করা যায় তাহলে আমাদের পক্ষেও গ্রামে চিকিৎসকের অকবস্থান নিশ্চিত করা অনেক বেশি সহজ হবে।

৭ বছরে (২০০৯-২০১৬) পর্যাপ্ত ৫০টি মেডিকেল কলেজ চালু হয়েছে। দেশে এই মুহূর্তে আর নতুন কোন মেডিকেল কলেজ প্রয়োজন নেই, এখন গুরুত্ব দিতে হবে মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি।

যেসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মানসম্মত নয় (অপর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামোর অভাব, অন্যান্য জনবল এবং রোগীর অপ্রতুলতা সেগুলো বন্ধ করে ছাত্রছাত্রীদের মানসম্পন্ন মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করতে হবে। চিকিৎসা শিক্ষাকে পণ্য হওয়ার হাত থেকে যে কোন মূল্যে বাঁচাতে হবে।

সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় এবং অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ জনশক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

ডেপুটেশন :

প্রচলিত নিয়মে ডেপুটেশন চলবে তবে যেসব ক্ষেত্রে শিক্ষক স্বল্পতা আছে সেখানে যাদের সংখ্যা বাড়িযে দ্রুত শিক্ষক তৈরি করতে হবে।

ডেপুটেশনের অর্ডার সময়মতো না হলে ছাত্রছাত্রীর অযথা বিলম্ব হয় তা পরে তার শিক্ষাকালকে পিছিয়ে দেয় যা কোনভাবেই একজন ছাত্রের জন্য কাম্য নহে।

বেতন-ভাতা ও প্রমোশন : সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় দুটি ইনক্রিমেন্ট

সময়মতো পদোন্নতি এবং সুযোগ সুবিধা।

ডিপিসি এবং এসএসবি প্রতি ৩ মাস পর পর নিয়মিত হওয়া এবং দরখাস্ত ছাড়া প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্রমোশনের ব্যবস্থা।

প্রাইভেট হাসপাতাল : কর্মরত চিকিৎসকদের মাসিক বেতন কমপক্ষে ৫০,০০০/- করতে হবে।

এমবিবিএস চিকিৎসক পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে কোন প্রাইভেট হাসপাতালের অনুমোদন যেন না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

সর্বোপরি চিকিৎসা সেবা যেহেতু মানুষের মৌলিক অধিকার, সেই মৌলিক অধিকারটুকু মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবার জন্য বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টা এবং আন্তরিকতার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। যর ফলে ন্যূনতম চিকিৎসা সেবাটুকু অনায়াসে পাচ্ছে প্রান্তিক জনগণ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন নতুন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ যার সুফল অচিরেই দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। গত দশ বছরে সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন দশ হাজারের উপর ডাক্তার।

সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। যদি সরকারের পাশাপাপশি আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে নিজের সর্বোচ্চ সততাটুকু দিয়ে চেষ্টা করি প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার তাহলে আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বাংলাদেশে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয় সারা বিশ্বের কাছে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সম্ভব হবে।

[ লেখক : সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন; সাবেক প্রোভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ]