• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ২৩ জিলহজ ১৪৪১, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

কৈশোর ও স্বাস্থ্য

অকারণ ক্রোধ ও উত্তেজনা

ডা. মিনতি অধিকারী

| ঢাকা , সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০

অসহিষ্ণুতা, কথায় কথায় রেগে যাওয়া এবং অকারণে উত্তেজিত হওয়া কৈশোরের স্বাভাবিক ধর্ম। তবে তা মাঝে মাঝে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করে।

ষ কিশোর-কিশোরীর মনের মধ্যে কিছু মানসিক জটিলতা বা কমপ্লেক্সিটি দেখা দিতে পারে। কখনো সুপিরিয়র কমপ্লেক্সিটি কখনো ইনফিরিয়র কমপ্লেক্সিটি বা হীনমন্যতা।

ষ যখনই দেখা যায় তার কথা কেউ মানছে না, শুনছে না তখনই সে উত্তেজিত হয়ে পরে।

ষ আমার কথা বা কাজের কোনো মূল্যই নাই এদের কাছে। তাই সে চরম ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে উত্তেজিত হয়ে পরে।

ষ কখনো কখনো কিশোর কিশোরীর মনের মধ্যে প্রচণ্ড ইগোইজম দেখা দেয়। যখনই কাজে বা কথায় কারো সঙ্গে বিশেষতঃ বয়োজেষ্ঠদের সঙ্গে তার মতানৈক্য দেখা দেয়; সে মনে করে ওই ব্যক্তিটি তাকে যথাযথ মূল্য দিচ্ছে না, তখন সে রেগে যায় এবং উত্তেজিত হয়ে পরে।

ষ স্টাবর্ননেস : তারা আশা করে তার আশা ও ইচ্ছা অনুযায়ী সব কাজ সমাধা হবে; যখন তা হয় না তখনই তারা রেগে যায়।

ষ মনে করে ক্রোধই সেই মহার্ঘ অস্ত্র যার দ্বারা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

ক্রোধ : সুখ, দুঃখ, ঈর্ষার মতো রাগ ও আমাদের একটি ইমোশন। মাঝে মাঝে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তবে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হওয়া উচিত সঠিকভাবে উপযুক্ত সময়ে।

ষ বেশকিছু জিনিস তোমাকেও রাগিয়ে দিতে পারে-

ষ যদি কোন বিশেষ জিনিস তোমার মন মতো না হয়

ষ যদি পাঠ্য বিষয় অনেক চেষ্টা করেও বোধগম্য না হয়

ষ তোমার প্রিয দলটি ইমপর্টেন্ট খেলায় হেরে যায়

ষ হতাশা থেকে ক্রোধ

ষ কেহ তোমাকে ব্যঙ্গ বা ভর্ৎসনা করলে

ষ বাবা-মায়ের কঠিন বাধা-নিষেধ তোমাকে রাগিয়ে দিতে পারে

ষ দোষ না করেও দোষী সাব্যস্ত হলে।

** রেগে গেলে তা চেপে যেও না; আবার চিৎকার কোর না। মনে ভাব কেন তুমি রেগে গেলে; এবং তার সমাধান খুঁজে বের কর। যেমন;

ষ তোমার ছোট ভাই/বোন একটি গিফট পেল যা তোমারও খুব পছন্দ। রেগে না গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার কর।

ষ অঙ্কটি খুব কঠিন; রেগে বইটি ছিড়ে না ফেলে বাবা, শিক্ষকের সাহায্য চাও।

কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে হবে যে রাগ বা উত্তেজনা ক্ষতিকর।

ক্রোধ বা উত্তেজনার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো নিম্নরূপ :

ষ ক্রোধ এবং উত্তেজনা অনেক মানসিক ও শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন মাথাব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, এসিডিটি, কাজে বা লেখাপড়ায় মনোযোগের ব্যঘাত প্রভৃতি।

ষ তুমি নিঃসঙ্গ ও নির্বান্ধব হয়ে পড়বে। মা-বাবা বন্ধু বান্ধব তোমার সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

ষ তুমি অত্যধিক মানসিক চাপ অনুভব করবে আর মানসিক চাপ বেড়ে গিয়ে অসুস্থ’ হয়ে পড়তে পার।

ষ সবসময় রাগ পুষে রাখার জন্য তুমি আর হাসিখুশি থাকতে পারছ না; ফলে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে।

ষ মানুষ তোমার বিরূপ সমালোচনা করবে।

ষ তোমার মেজাজ মর্জি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে; ফলে কখন যে তুমি কার ওপর কিসের জন্য রাগ করেছো বা কি কারণে উত্তেজিত হয়ে পড়ছ নিজেই বুঝতে পারবে না। ফলে অকারণ ক্রোধ ও উত্তেজনার জন্য তোমার নিজের জীবনই দুর্ভর হয়ে উঠবে।

ষ মহা বিপদের তুমি কারও সুপরামর্শ গ্রহণ করতে রাজি হবে না; কেননা তুমি ভাবছ তুমি যা জান কেবল তাই সঠিক। ফলে তোমাকে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

ষ কিছুদিন পর তুমি নিজের ওপর নিজেই রেগে যাবে এবং হীনমন্যতায় ভুগবে।

ষ ক্রমে তুমি অন্যের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস একেবারেই হারিয়ে ফেলবে ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

ষ তুমি হয়ত তোমার অকারণ ক্রোধ ও উত্তেজনার জন্য অনুতাপ করবে; কিন্তু পরবর্তীতে আবার একই ভুল করবে।

কীভাবে রাগের মোকাবিলা করবে :

ষ বাবা-মা, শিক্ষক বা বন্ধুর কাছে খুলে বল রাগের কারণ।

ষ উল্টোভাবে ১০ গণনা কর

ষ উষ্ণ করমর্দন কর বন্ধুর সঙ্গে, বা জড়িয়ে ধর

ষ লাফানো বা অন্য কোন ব্যায়াম কর

ষ তোমার রাগের একটি ছবি আঁক

ষ ভিডিও গেম খেল

ষ পাঁচ মিনিট দৌড়াও ঘরের চার পাশ

ষ স্টিরিওর সঙ্গে সঙ্গে গান গাও

ষ বাগানের ঘাস উপরাও

ষ ভালো চিন্তা কর

ষ প্রিয় খেলাটি খেল; মোট কথা ব্যস্ত থাক

ষ মনে রেখ রাগ নিযন্ত্রণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ, রাগকে তোমার বস হতে দিও না

কি করে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে আনবে :

১ পৃথিীবির বিখ্যাত দু’একজন মণীষির জীবনী পড়, দেখবে তাদের অনেকেই ক্রোধ জয় করেছেন।

২ নিজেকে বিশ্লেষণ কর; কেন রেগে যাচ্ছ তার কারণ খুঁজে বেড় কর এবং ডায়েরিতে নোট কর।

৩ যখন খুব রাগ হবে সিনেমা বা নাটকের কোনো হাসির দৃশ্য বা চরিত্র কল্পনা কর; রাগ উবে যাবে।

৪ উল্টো থেকে ৫০ হতে ১ পর্যন্ত গণনা কর; রাগ চলে যাবে।

৫ নিজেকে প্রশ্ন কর; রাগ করে আমি কি পেতে চাই।

৬ চিন্তাধারা পাল্টে ফেল; সর্ব বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব

৭ পোষণ কর। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

৮ মনে রাখবে রাগ নাই তো দুঃখ নাই; ক্রোধ তোমার বড় শত্রু নিজ আচরণে কিছু পরিবর্তন আন: যেমন -

ষ বেশি কথা না বলে শুধু যে কয়টা কথা বলা উচিত তাই বল।

ষ আস্তে মিষ্টি করে কথার জবাব দিও। কখনো তর্ক করবে না।

ষ কেহ অপমানসূচক কথা বললে বা আচরণ করলে চুপ থাক; আত্মায় অধিষ্ঠান কর, আত্মাকে আঘাত করা যায় না, অপমান করা যায় না।

ষ মেডিটেশন কর নিয়মিত দুই বেলা। অধ্যাত্মিক শক্তি বেড়ে যাবে; মনে রাগ প্রবেশের পথ পাবে না।

ষ দিনে দুই ঘণ্টা মৌনব্রত অবলম্বন কর।

ষ যোগব্যায়াম কর :

হ চোখ বুজে সোজা হয়ে দাঁড়াও বা মেরুদণ্ড সোজা করে চেয়ারে বস

হ যদি ঘাড় শক্ত হয়ে থাকে স্রাগ করে ঘাড় রিল্যাক্স করে নিও

হ নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নাও; মনে মনে ভাব পবিত্র নীল আলোকরশ্মি তোমার শরীরে প্রবেশ করছে। মনে মনে তিনগুণ এবং শ্বাস ধরে রাখ।

হ এবার ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস বের করে দাও; মনে মনে ভাব শরীর থেকে বিষাক্ত কালো ধোয়া বের হয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে আমার যাবতীয় ক্রোধ।

হ এভাবে ১৫ বার নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নাও এবং ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস বের করে দাও।

যা করবে না :

হ রাগ করে নিজেকে আঘাত করবে না।

হ মাদক বা ঘুমের বড়িতে আসক্ত হবে না।

কীভাবে ক্রোধ ও উত্তেজনা থেকে মুক্তি পাবে :

ষ রাগ গোপন করবে না; প্রকাশ কর; বালিশে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়, বালিশটি শূন্যে ছুড়ে মার।

ষ যার ওপর রেগে গেছ তার ছবি আক যেমন পার তেমন; তারপর কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেল সেই ছবি।

ষ মনটা অন্য দিকে সরিয়ে নাও; সখের মিউজিকটি শুন, মিউজিকের তালে তালে পা ফেল, তাস নিয়ে পেসেন্স খেল, রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাসটি পড়।

ষ রাগের প্রথম পর্যায়ে-ই তা দমন কর। যখন ক্রোধের ছোট্ট ঢেউগুলো অবচেতন মনে দোলা দেয় তখনই তা দমন কর। বড় ঢেউ আসতে দেবে না।

ষ ঠাণ্ডা জল পান কর; ওম শান্তি ওম শান্তি বারবার উচ্চারণ কর।

ষ গান শুন; প্রথমে একটি ধুমধাড়াক্কা গান যার ওপর তুমি রাগ ঝাড়তে পার; তারপর শুন একটি সুদিং গান যা তোমার মনকে প্রশান্ত করবে।

ষ ফুটবলটিকে পা দিয়ে ঠোকর দাও, মনে কর যার ওপর রেগে গেছ তার উপর ঠোকরটি মারছ।

ষ ডায়রিতে পুরো ঘটনাটি লিখে ফেল। গল্প লিখ তোমার আবেগ দিয়ে, রাগ করার ঘটনাটি অবলম্বন করে।

ষ মন চাইছে কিছু ছুড়তে! ফ্রিজ থেকে বরফের টুকরো নিয়ে টাইলস বসানো দেয়ালে ছুঁড়ে মার; দেয়ালের ক্ষতি হবে না; তোমার রাগ পরে যাবে।

ষ ১০ থেকে ৭০ পর্যন্ত যতটা পার গুনতে গুনতে পেট ফুলিয়ে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নাও; তারপর মুখ হা করে পেট সংকুচিত করে সব বাতাস বের করে দাও। এভাবে ১০ থেকে ১৪ বার কর।

ষ যে ব্যক্তিটির ওপর রাগ করেছ তার সদগুণগুলো স্মরণ কর।

ষ যখন কিছুতেই রাগ দমন করতে পারবে না, তখন সেই স্থান ত্যাগ কর; মনে বল ওম!

ষ কিছু শারীরিক কাজ নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখ। শরীরচর্চা কর এবং করতে করতে ভাব কার ওপর রাগ, কেন এই রাগ।

ষ বন্ধুর সঙ্গে কথা বল; মোবাইলে মেসেজ দাও, টিভি দেখ, পার্কে, জলের কিনারে বেড়িয়ে আস।

ষ মনে রাখবে প্রতিশোধস্পৃহা মনে জাগলেও তাকে পাত্তা দেবে না; তোমার জন্যই তা ক্ষতি বয়ে আনবে। বরং তাকে বল তার আচরণে তুমি ব্যথিত।

ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে ভাব। কৌতুকময় কিছু নিয়ে ভাব যা তোমাকে হাসায়। প্রাণখোলা হাসি রাগ কমাতে সাহায্য করে।

ষ ঈষদোষ্ণ জলে স্নান কর; যোগব্যায়াম কর, পোষা প্রাণীটি নিয়ে লোফালুফি কর, ছোট ভাইটির সঙ্গে খেল।

ষ ঐ ঘরটি ত্যাগ কর, যার ওপর রাগ করেছ তার কথা মোটেও ভাববে না।

ষ প্রিয় বস্তু, ব্যক্তি, সিনেমা, বই দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত রাখ।

ব্যায়াম কর :

১ আয়নার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াও; পা দুটো যুক্ত থাকবে এবং আয়নার দিকে মুখ করে থাকবে। দুহাতের তালু একত্রিত থাকবে ও দুহাতের আঙ্গুলগুলো ইন্টারলেসড বা একে অন্যের সঙ্গে সংঘবদ্ধ থাকবে।

২ সংঘবদ্ধ দুহাতের আঙ্গুলের গিঠের ওপর তোমার চিবুক স্থাপন কর, কব্জি দৃঢ় ও সোজা রেখে কনুই দুটো একত্রিত রাখ। পুরো ব্যায়ামটি চলাকালেই দুহাতের আঙ্গুলগুলো ইন্টারলেসড থাকবে।

৩ ধীরে ধীরে ছয় গুনতে গুনতে মুখ বন্ধ রেখে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নাও, এভাবে ফুসফুস তলা থেকে আগা পর্যন্ত পুরো ভরে ফেল। শ্বাস নেবার সময় কনুই দুটো আস্তে আস্তে উপরে তুল এবং দুই forearms (কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত অংশ) দুই পাশে কানের সঙ্গে লাগাবার চেষ্টা কর।

৪ মুখ অল্প হা কর এবং ধীরে ধীরে ছয় গুনতে গুনতে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ফেল। মাথা যতটা সম্ভব পেছনে ড্রপ কর এবং বাহু, কবজি, কনুই পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আন যেন দুহাতের তালু একত্রিত ও আঙ্গুলগুলো ইন্টারলেসড থাকে, কবজি সোজা ও কনুই দুটো একত্রিত থাকে এবং এই অবস্থায় বুকের ওপর বিশ্রাম নেয়।

৫ পুনরায় ধীরে ধীরে ছয় গুনতে গুনতে মুখ বন্ধ রেখে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নাও, ধীরে ধীরে কনুই দুটো এবং মাথা আস্তে আস্তে ওপরে তুল যতক্ষণ পর্যন্ত না চিবুক মাটির সমতলে আসে ও দুহাতের সঙ্গবদ্ধ আঙ্গুলের গিঠের ওপর স্থাপিত হয় এবং বাহু উপরের দিকে প্রসারিত হয়।

৬ এভাবে ১০ বার শ্বাস নাও ও ফেল। তারপর হাত দুটো লম্বা করে শরীরের দুপাশে রাখ। ধীরে ধীরে ১০ গুণ।