• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন চাই

| ঢাকা , বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য মানবিক সমাজ বিনির্মাণের উপযোগী সুনাগরিক তৈরি করা- এ কথা যেমন সত্য, তেমনি একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা লাভের অন্যতম উদ্দেশ্য কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে সরাসরি কাজে লাগে না- এমন বিষয়ে পড়াশোনার ওপরই এখনও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের গাদা গাদা বই পড়ানো হয়। রবী ঠাকুরের ‘তোতা কাহিনী’ তে তোতা পাখিকে শিক্ষা দেয়ার মতো। রাজা তার মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, পাখিটাকে শিক্ষা দাও। তোতা পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রথমে একটা খাঁচা তৈরি করা হলো। তারপর খাঁচার উন্নতি সাধনের চেষ্টা চালাতে লাগল। কিন্তু খাঁচায় দানা, পানি নেই। কেবল রাশি রাশি পুঁথি থেকে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়ে মুখের মধ্যে ঠাসা হচ্ছে। গান তো বন্ধই, চিৎকার করার ফাঁকটুকু পর্যন্ত নেই। তারপর একদিন পাখিটি মারা গেল।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও তোতা পাখির খাঁচা বানানোর মতো। আমাদের জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়েছে, তা তো পাখি মারার খাঁচার মতোই। ইদানীং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মাহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি অব্যহত রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের মৌখিক শাস্তি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিছুদিন আগে অভিভাবককে স্কুলে ডেকে এনে অপমানিত করার কারণে এক শিক্ষার্থী আত্মাহত্যা করেছে।

বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ইন্টারভিউ নামক একটি নাটকে আনিসুল হক বলেছেন, স্কুলে বাচ্চারা শিখতে আসবে, তারা তো জজ-ব্যারিস্টার হয়ে এসে ভর্তি পরীক্ষা দেবে না। আর স্কুল হতে হবে সবার জন্য, যেখানে কালো-ফরসা, ধনী-গরিব, আইকিউ বেশি, আইকিউ কম, কথা বলতে পারে, কথা বলতে পারে না-সবার সমান সুযোগ থাকবে, কোন ধরনের বৈষম্য থাকবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে সন্তান ভর্তি করাতে হলে অভিভাবকের নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক আয় থাকতে হয়। সরকারের উচিত ব্যবসায়ী এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া।

আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মেরুদ-হীনভাবে দাঁড় করিয়েছি। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা বলার মতো না। যা জাতির কাছে দৃশ্যমান। আমাদের এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং শিক্ষকদেরকে মানবিক হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিতর্ক, কবিতা আবৃত্তি, আউট বই পড়া, সংস্কৃতির চর্চা এবং বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আনন্দহীন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। রবীনন্দ্রনাথ আনন্দহীন শিক্ষা প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, অন্য দেশের ছেলে যে বয়সে নবোদগত দন্তে আনন্দমনে ইক্ষু চর্বন করিতেছে, বাঙালির ছেলে তখন স্কুলের বেঞ্চির উপর কোঁচা সমেত দুইখানি শীর্ণ খর্ব চরণ দোদুল্যমান করিয়া শুধু বেত হজম করিতেছে, মাস্টারের কুট গালি ছাড়া তাহাতে তার কোনরূপ মসলা মিশানো নাই। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দমূলক ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর শিক্ষককেও আনন্দমূলক শিক্ষার কৌশল রপ্ত করতে হবে। শ্রেণীকক্ষে নাটকীয় ভঙ্গিমায় চিত্তাকর্ষক পাঠদান করতে হবে। শিশুর মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে হবে। এতে করে তাদের কোমল মনে চিন্তার প্রসারতা ঘটবে। তার মনে বিশ্বকে জয় করার মানসিকতা গড়ে উঠবে। অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, অদেখাকে দেখার চরম ইচ্ছা জাগ্রত হবে।

বাংলাদেশে যারা মেধাবী তারা ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আর মধ্যম মানের ছাত্রেরা বাধ্য হয়ে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক হয়। ফিনল্যান্ড বা নরওয়ের মতো নরডিক দেশগুলোতে শিক্ষক হতে হলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। ভালো ছাত্রদের সেখানে সর্বোচ্চ বেতন দিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্নচিন্তা যার চমৎকার, জ্ঞানচর্চা তার দ্বারা হয়ে ওঠে না। শুধু শ্রদ্ধায় চিড়া ভিজে না। আমাদের দেশেও শিক্ষককে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সর্বোচ্চ বেতন দিতে হবে। বেতন যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে পিএইচডিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেই-বা সমস্যা কী? ডিগ্রি তো থাকতেই হবে, কিন্তু দেখতে হবে শিক্ষাদানে আগ্রহী, চৌকস এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরাই যেন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এ ধরনের শিক্ষক খুঁজে বের করতে হলে আমাদের নিয়োগকর্তাদেরও সমভাবে চৌকস হতে হবে।

শিশুর শিক্ষার জন্যে সমাজকেও ভূমিকা রাখতে হবে। সমাজ হতে হবে শিশুর শিক্ষার উপযোগী। শিশুর বিদ্যালয়ে যাতায়াতসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সমাজের দায়িত্ব। সমাজকে শিশুর চিত্তবিনোদনের জন্য খেলার মাঠ, ক্লাব, পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। বৃত্তিমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের সামাজিকভাবে উৎসাহিত করতে হবে। সমাজকে নিশ্চিত করতে হবে, শিশুর অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের সু-ব্যবস্থা। বিদ্যালয় থেকে শিশু শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের মানুষকে। প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, বেড়ে উঠা, আচরণ সহ সব বিষয়ে সমাজের মানুষকে সচেতন ও সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মূলকথা হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালো হলে আলোকিত মানুষ তৈরি হবে। আলোকিত মানুষ তৈরি হলে দেশও উন্নত হবে।

আরিফ ইকবাল নূর

শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়