• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ৫ শাবান ১৪৪১

স্বাধীনতা দিবস- ঊনপঞ্চাশ বছর

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

ঊনপঞ্চাশ বছর আগে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এর আগে ২৪ বছর কেটেছে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে।

গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের অঙ্গীকার ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রণোদনা। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র স্থান করে নিয়েছিল। হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যাবে, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তিনটিই আজ নির্বাসিত। সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ অবৈধ সামরিক শাসকের সঙ্গিনের খোঁচায় সংবিধান থেকে নির্বাসিত। গণতন্ত্র দুর্বল ও ভঙ্গুর।

একদিনে এ অবস্থা হয়নি। ১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল। এর পরপরই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো কারাগারের তথাকথিত নিরাপদ হেফাজতে। তারপর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা ছিল হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র, সামরিক অভ্যুত্থান এবং সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসন। এ ষড়যন্ত্র, হত্যা, ক্যু আর রক্তাক্ত সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নছবি ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়েছে।

১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়ার সামরিক ফরমান বলে জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম ও লড়াইয়ে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া হয় সংবিধান থেকে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামক উদ্ভট এক তত্ত্ব আমদানি করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো, বিতর্কিত করে তোলা হলো স্বাধীনতার আরেকটি মীমাংসিত ইস্যুকে। এরশাদ আমলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলো। বাংলাদেশ পড়ল নামে-বেনামে সামরিক শাসন, লুটপাটের রাজনীতি আর রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কবলে। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে কালো টাকা ও অবৈধ অস্ত্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হলো। সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকে ক্রমে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়ামক শক্তি করা হলো। এখনও ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা, মোনাফেকি ও ফতোয়াবাজি, নারী নির্যাতন বাংলাদেশের সমাজে এক নারকীয় বাস্তবতা হিসেবে রয়ে গেছে।

ঊনপঞ্চাশ বছরের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ তার অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, যখন ইসলামী জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন সারা দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা করেছিল। এরপর শুরু হয়েছিল জঙ্গিবাদের আরেক ভয়াবহ স্তর আত্মঘাতী বোমা হামলা। এ হামলার লক্ষ্য হলো আদালত, বিচারক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী, পুলিশ বাহিনীর সদস্য প্রভৃতি। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত এ জঙ্গি হামলায় শুধু যে বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীসহ ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন তাই নয়, এ হামলার ফলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশই আক্রান্ত হয়েছিল। ইসলামী জঙ্গিবাদীদের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ধ্বংস করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার নামে একটি ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। অনেক দেরিতে, অর্থাৎ ৬৩ জেলায় হামলা এবং আদালত, বিচারকসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত হওয়ার পর ইসলামী জঙ্গিদের বিপদ সম্পর্কে তদনীন্তন জোট সরকারের টনক নড়তে দেখা যায়। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পত্র-পত্রিকার পক্ষ থেকে ইসলামপন্থিদের তৎপরতা, সংগঠিত হওয়া এবং উত্থান সম্পর্কে বারবার হুঁশিয়ার করা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জোট সরকারের সব মন্ত্রী এবং নেতা দেশে ইসলামী জঙ্গিদের অস্তিত্বই অস্বীকার করেছিলেন। রাজশাহীতে চারদলীয় জোটের মন্ত্রী এবং এমপিদের যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাংলাভাই নামক আরেক হিংস্র ইসলামী জঙ্গির উত্থান ঘটানো হয়েছিল। বাংলাভাই যখন রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ অঞ্চলে একের পর এক মানুষকে হয় জবাই করে, না হয় গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করছে- রাজশাহীর সরকারি দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় এবং পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের মদদে চালাচ্ছে সমান্তরাল সরকার, তখনো মিডিয়াতে বাংলাভাই সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো জোট সরকার উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল ‘বাংলাভাই মিডিয়ার আবিষ্কার’ বলে। বিএনপি সরকার বরাবরই মিডিয়া এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, দেশে ইসলামী জঙ্গি আছে বলে তারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। শেষ পর্যন্ত সত্যিই যখন বাঘ এলো, রাষ্ট্রকে আক্রমণ করল জামা’আতুল মুজাহিদীন নামের জঙ্গিরা তখন জোট সরকার বাধ্য হলো তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা দেশগুলোর মধ্যে সামনের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই যে শেষ পর্যন্ত জোট সরকার শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাই এবং জেএমবির বিরুদ্ধে অভিযানে গেছে, সেটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এখনো দেশে প্রকাশ্যে স্লোগান দেয়া হচ্ছে ইসলামী আইন, আল্লাহর আইন বা শরিয়াহ শাসন ব্যবস্থা কায়েমের।

এ কথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা দুটোই বাতিল করে দেশে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া থেকেই জঙ্গিবাদের সূত্রপাত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ’৭৫-পরবর্তী বছরগুলোতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে আনুকূল্য পেয়ে পেয়ে এখন জঙ্গিবাদ আক্রমণ করতে সমর্থ হয়েছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার অর্জন হিসেবে এ দেশের সংবিধানে যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সেটা ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত একটি পদক্ষেপ। সংবিধানের আদি রচয়িতারা ভবিষ্যতের এ বিপদের কথা ভেবেই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় দেশ থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুর সময় প্রণীত ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও সেটা করা হয়নি। সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও দল করার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে।

দেশ, সমাজ এবং মানুষ এখনও যে ইসলামী জঙ্গিবাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা, শোলাকিয়া ঈদ জামাতে জঙ্গি হামলার চেষ্টার পর থেকে মাঝে মধ্যেই বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি হামলা চলছে এবং এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল অভিযানও চলছে। শীর্ষ জঙ্গিবাদীদের ধরা হয়েছে, নিষিদ্ধ করেছে কয়েকটি সংগঠন কিন্তু দেশকে এর হাত থেকে মুক্ত রাখার জন্য এ পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়। এর জন্য জঙ্গিবিরোধী তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আদর্শিক এবং রাজনৈতিকভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি আবহ তৈরি করতে হবে যেন সব সময়ের জন্য ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা থাকে। এজন্য জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। আর এজন্যই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে যে ধারাগুলো ছিল সেগুলো পুনঃসন্নিবেশিত করা দরকার। দেশকে জঙ্গিবাদের বিপদ থেকে মুক্ত রাখতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। এবারের স্বাধীনতা উদযাপনের মূলমন্ত্র হোক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে বিজয়ের প্রত্যয়।

স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশ আরেক মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের আক্রমণে যে বৈশ্বিক মহামারী শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ সেই আক্রমণ থেকে মুক্ত নয়। রাষ্ট্র ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে মরণঘাতী এ ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতোই সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের নেতৃত্বে এ মুক্তিযুদ্ধেও বিজয় লাভ করতে হবে।

রাজনৈতিক দলের মধ্যে রাষ্ট্রের মৌলিক ইস্যু স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, নির্বাচন ইত্যাদি প্রশ্নে বিভেদ এখনও বয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল এখনো রাজনীতিতে তাদের অবস্থা ধরে রাখতে পারছে। এ বিভেদের সুযোগে মৌলবাদ জঙ্গিবাদ তৎপর হতে পারছে। স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছর পর আমরা অবশ্যই আশা করব মৌলিক ইস্যুগুলোতে রাজনীতিতে মতৈক্য হবে এবং মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির জনক প্রশ্নে ঐকমত্যের ভিত্তিতে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপিত হবে।