• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

লাইলাতুল কদর

| ঢাকা , বুধবার, ২০ মে ২০২০

মাহে রমজান বিশ্বের মুসলমানদের জন্য বিশেষ রহমত ও বরকতের মাস হিসেবে চিহ্নিত। এ রমজানেই একটি বিশেষ রাত লাইলাতুল কদর বা শবেকদর, অর্থাৎ মহিমান্বিত রজনী। এ রাতেই কোরআন শরিফ নাজেল হয়েছিল। এ রজনীর গুরুত্ব ও মর্যাদা এতই অধিক যে, আল্লাহ পাক বলেছেন- আমি তোমাদের জন্য এমন রাতের ব্যবস্থা করেছি যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

কোন বিশেষ রাতটি লাইলাতুল কদর কোরআন-হাদিসে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তবে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ২১ রমজান থেকে ২৯ রমজান পর্যন্ত যে কোন বিজোড় তারিখের রাতই এ মহিমান্বিত রজনী। তাই ধর্মপ্রাণ মানুষ রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের প্রতিটি বিজোড় তারিখের রাতেই আল্লাহর আরাধনায় মগ্ন হন। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, ২৬ রমজান রাত অর্থাৎ ২৭ রমজানের রাতটিই সেই পুণ্য রজনী, আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) যার সুসংবাদ দিয়েছেন। মুমিন মুসলমানরা তাই বিশেষভাবে এ রাতটি এবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করেন। এ রাতে যিনি এবাদত-বন্দেগিতে নিজকে নিয়োজিত রাখবেন তিনি হাজার মাসের এবাদত-বন্দেগির চেয়ে বেশি সওয়াব হাসিল করবেন, এ হলো শবেকদরের বড় ফজিলত।

লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য ও মহিমা অবশ্য শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান ও শিক্ষার চর্চার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতে মানব সম্প্রদায়কে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। শেষ নবী হজরত মুহম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে। তিনি ছিলেন নিরক্ষর। আল্লাহ তার প্রিয় নবীর কাছে এ রাতে কোরআন শরিফ নাজেল করেছিলেন এই বলে- ‘পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে- যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন লেখনী দ্বারা। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না।’ জাহেলিয়াত বা অন্ধকার থেকে আলোকের যুগে উত্তরণ, জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আত্মোপলব্ধি, কুসংস্কার ও গোঁড়ামি থেকে মানুষের মুক্তি- এটাই ইসলামের শাশ্বত মর্মবাণী। ‘পড়’ কথাটির মধ্য দিয়ে এ রাতেই শুরু হয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা এক নতুন সভ্যতার জয়যাত্রা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই এই রাতটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত। হজরত মুহম্মদ (সা.)-কে আল্লাহতায়ালা শুধু মুসলমানদের জন্যই রহমত হিসেবে প্রেরণ করেননি, আল্লাহর রাসুল ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ বা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্য আল্লাহর আশীর্বাদস্বরূপ।

প্রশ্ন জাগে, আজকের বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় কি আল্লাহর নির্দেশিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সেই পথ অনুসরণ করে চলছে? সবাই জানেন, ইসলাম শুধু পারলৌকিক কল্যাণের ধর্ম নয়, ইহলোকের মঙ্গলকেও এতে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মানুষকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে দুনিয়ার মঙ্গল ও আখেরাতের মঙ্গল কামনা করে। কিন্তু দুনিয়ার মঙ্গলের পথটি তো নিহিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা দ্বারা নিজের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশকে জানা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশকে বশ মানিয়ে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জীবন গড়ে তোলার মধ্যে, আল্লাহ স্বয়ং এ মহিমান্বিত রাতে যার তাগিদ দিয়েছিলেন ‘পড়’ বলে। মহানবী (সা.) বলেছিলেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য (প্রয়োজনবোধে) চীন দেশে যাও। আমরা কি সেই অমূল্য উপদেশ-নির্দেশ পালন করছি? নাকি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ ত্যাগ করে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও গোমরাহির কাছে আত্মসমর্পণ করেছি? আজকের ধর্মীয় নেতারা কি আমাদের শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছেন, না পবিত্র ধর্মকে সংকীর্ণতা ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করে তুলছেন? এ প্রশ্ন কি মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে জাগবে না যে, ইসলামের আদিযুগে যারা সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল সেই বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় আজ এমন পশ্চাৎপদ কেন? পবিত্র লাইলাতুল কদরে এবাদত-বন্দেগির সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নটিরও জবাব আমাদের অবশ্যই খুঁজতে হবে।