• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে হবে

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ২০১৮ সালে ৪৬৬ জনকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সন্দেহজনক এসব হত্যার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম হওয়া ও বানোয়াট প্রমাণ হাজির করার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উল্লিখিত বক্তব্য সর্বৈব সত্য। তবে বাংলাদেশে শুধু যে মাদকবিরোধী অভিযানেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হচ্ছে; তা নয় বরং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চরমপন্থি ও জঙ্গি তৎপরতা দমনের নামে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হচ্ছে এবং পরে এর নাম দেয়া হচ্ছে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বন্দুকযুদ্ধ। শুরু থেকেই দেশি সংগঠনগুলোর পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ক্রসফায়ারকে বিচারবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করে এটা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। অপরাধ দমনের এ পদ্ধতি যে ভুল, বেআইনি এবং চূড়ান্ত বিবেচনায় বিপজ্জনকÑ এমন মতও শুরু থেকেই উচ্চারিত হয়েছে গণমাধ্যমে, নাগরিক সমাবেশে। জোট সরকার আমলে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছিল, তাদের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারে হত্যা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলে যাওয়ার পর একই অভিযোগ করেছিল বিএনপিও অথচ ২০০৪ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- শুরু করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। যথারীতি বিএনপি সরকারের মতো পরবর্তী সরকারও অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, দলটি ক্ষমতায় এলে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা হবে। তবে সেটার প্রতিফলন পরে আর দেখা যায়নি।

বাস্তবতা হলো, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- কোনভাবেই বন্ধ করা হচ্ছে না। একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটলেও রাষ্ট্র বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না। এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে রাষ্ট্রের একটা অস্বীকৃতির মনোভাব আমরা দেখতে পাই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, তারা জানে না ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটছে। কারা ঘটাচ্ছে, সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা নেই। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে এ ঘটনাগুলো ঘটছে, এখন পর্যন্ত ক’টা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে এবং প্রকৃত সত্য কী, সে সম্পর্কে নাগরিকরা খুব বেশি কিছু জানেন না বা তাদের জানানো হচ্ছে না। কেউ জানতে পারছে না, কারা এসব ঘটিয়েছে? এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বিরাট চ্যালেঞ্জ। যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে, তারা রাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে যে তারা এ ধরনের অপরাধগুলো করে যাবে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে তুলে নেয়ার পর লাশ পাওয়ার খবর পেয়েছেন স্বজনেরা, এমন অভিযোগও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের অনেক গরমিল দেখা যায়।

ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো যে পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গৎবাধা বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রসফায়ারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে এমন একটি বিবৃতিই প্রচার করা হয় যে, গ্রেফতার ব্যক্তিকে নিয়ে রাতে অস্ত্র উদ্ধারে বের হলে বা তার সহযোগীদের গ্রেফতার করতে বের হলে ওতপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা হামলা, গুলিবর্ষণ করে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি ছোড়ে। দুই পক্ষে বন্দুকযুদ্ধের সময় ক্রসফায়ারে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় বন্দী ব্যক্তি। ঘটনাস্থল থেকে কিছু অস্ত্র উদ্ধারও দেখানো হয়। ২০০৪ সালে শুরু হওয়া এ গল্প এখনও জারি আছে। শুধু ক্রসফায়ারের স্থলে কখনও কখনও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘এনকাউন্টার’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশকে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে। ঘটনার শিকার নাগরিকদের যথাযথ সহায়তা দিতে হবে। বিশ্বের যেসব দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় এ ঘটনা ঘটছে, সেসব দেশে আদালত সব সময় ভুক্তভোগীদের পক্ষে সুবিচার করতে পারেন না। বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। সমাজের ন্যায়বিচারের যে প্রতিষ্ঠানগুলো থাকে, সেগুলো একে অপরের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ সঞ্চারিত হয়।

সরকারের উচিত গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান করা এবং তাদের আত্মীয়দের তদন্তের অগ্রগতি জানানো। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে গত দেড় দশকে সংঘটিত ক্রসফায়ার ও গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্তে একটা স্বাধীন কমিশন গঠন করা উচিত। যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব বেআইনি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা যায়।