• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২ ফাল্গুন ১৪২৭ ১২ রজব ১৪৪২

গুম, খুন, অপহরণ প্রতিরোধ বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া চার ব্যক্তির এখনও হদিস মিলেনি। এই চার ব্যক্তি হলেন- বেঙ্গল গ্লাস ওয়ার্কস ফ্যাক্টরির আইটি শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক আতাউর রহমান শাহীন, আইটি বিশেষজ্ঞ কামরুল হাসান (৩১), র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান এবং কানাডার ম্যাকগ্রিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ (২০)। তারা বেঁচে আছেন নাকি গুম হয়েছেন- তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা অপহৃত হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট থানায় ‘নিখোঁজ’ উল্লেখ করে জিডি দায়ের করেন। চারটি জিডি পুলিশ তদন্ত করে কোন কুল কিনারা করতে পারেনি।

চার ব্যক্তির নিখোঁজের খবরটি উদ্বেগজনক। তবে এ চার ব্যক্তিই শুধু নন, গত প্রায় এক দশকে অগণিত মানুষ সমাজ থেকে হারিয়ে গেছেন, গুম হয়েছেন, রাষ্ট্র তার কোন খোঁজ করেনি। সরকার বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করেছে, এড়িয়ে গেছে, যেন এসব ভেবে দেখার কোন বিষয় নয়, নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।

বস্তুত গুম, খুন, অপহরণ যেন জীবনের সঙ্গীই হয়ে পড়েছে। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে এ তালিকা। আগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ নির্মম ঘটনার শিকার হতেন সন্ত্রাসী বা রাজনীতিবিদরা। বর্তমানে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রাষ্ট্রদূত, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণীর মানুষ।

কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে, আইনানুযায়ী শাস্তি ভোগ করবেন। কিন্তু গুম হয়ে যাবেন কেন? এটি সুস্পষ্টভাবে আইনের শাসনের পরিপন্থি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাউকে তুলে নিয়ে যান না। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া মানুষের স্বজনেরা বলছেন, তাদের সামনে থেকেই পুলিশ বা র‌্যাব পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মধ্য থেকে ভাগ্যগুণে যারা ফিরে এসেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন- চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া, অজ্ঞাত স্থানে দিনের পর দিন রাখা, ক্ষেত্রবিশেষে চাঁদা দাবি করা, মুখ খুললে মেরে ফেলার হুমকি ইত্যাদি। ভাগ্যগুণে যারা ফিরে আসেন, এসব নিয়ে তারা আর মুখ খোলেন না। কোন সভ্য দেশে অব্যাহতভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না।

সরকারের দাবি অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি গুমের সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তাহলে কে বা কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তা খুঁজে বের করা হচ্ছে না কেন? একের পর এক গুমের ঘটনা ঘটলেও রাষ্ট্র বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না। যে-ই ঘটনা ঘটাক, এটা তো বাস্তব, মানুষ গুম হচ্ছে, কারও কারও মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে তুলে নেয়ার পর লাশ পাওয়ার খবর পেয়েছেন স্বজনেরা। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি এবং প্রকৃত সত্য কী, সে সম্পর্কে নাগরিকেরা খুব বেশি কিছু জানে না। কেউ জানতে পারছে না, কারা এসব ঘটিয়েছে। এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বিরাট চ্যালেঞ্জ। যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে, তারা রাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে যে তারা এ ধরনের অপরাধগুলো করে যাবে।

যদি ধরে নেয়া হয় যে, এসব ঘটনা সরকারি সংস্থাবহির্ভূত মানুষজন করছে, রাষ্ট্রীয় কোন বাহিনী করছে না, তাহলেও তারা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে যে এই অপরাধগুলো তারা করেই যাবে এবং কেউ এর কোন সুরাহা করতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী এ চ্যালেঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। গুরুত্ব দিয়ে দেখলে তারা এর একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারত।

মানুষ মারা গেলে বা নিহত হলে অন্তত লাশটি পাওয়া যায়। কিন্তু গুম হওয়া মানুষের কোন চিহ্নই থাকে না। স্বাধীন বাংলাদেশে এ রকম গুম হওয়ার ঘটনা শুধু সরকারের অক্ষমতাই প্রকাশ করে না, সমাজকেও আতঙ্কগ্রস্ত করে। সরকার বক্তব্য দিয়ে বিদেশি সংস্থার রিপোর্ট হয়ত প্রত্যাখ্যান করতে পারে, কিন্তু স্বজনহারা মানুষগুলোর অভিযোগ কীভাবে অস্বীকার করবে? আমরা চাই, নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। গুম হওয়া মানুষগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করা হোক। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিশ্চিতভাবে বন্ধ করে সমাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।