• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৫, ১২ শাওয়াল ১৪৪০

শুভ নববর্ষ

সব ধর্ষক-হত্যাকারীর বিচার চাই

| ঢাকা , রোববার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯

আজ শুভ নববর্ষ। বাঙালি জাতির নববর্ষের এ দিনটিকে আমরা অর্জন করেছি প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের আয়োজন দীর্ঘকাল ধরে, আমাদের গ্রামজীবনে সাধারণ মানুষজন পালন করে আসছে হালখাতা হিসেবে। চৈত্র সংক্রান্তির পর পুরনো বছরের দেনা-পাওনা চুকিয়ে, জমিদারের খাজনা শোধ দিয়ে কিছুটা নির্ভাবনায় গ্রামের মানুষ বৈশাখী মেলায় অংশ নিয়েছেন। সেকালে বিশেষ করে শহুরে মানুষ বাংলা নববর্ষ খুব আড়ম্বর করে পালন করত না। কিছুটা আর্থ-সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে নববর্ষ শুরু হয়েছিল ফসলি সন হিসেবে মোগল আমলে খাজনা আদায়ের একটি নতুন সন প্রবর্তন করার মধ্য দিয়ে। সম্রাট আকবর হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলার ফসলি সন প্রবর্তন করেন। হিজরি সনের চান্দ্র মাস নির্ভর না করে তিনি সৌর বছর হিসাবে ওই ফসলি সন প্রবর্তন করেছিলেন।

বাংলা নববর্ষ এক সময় বাংলার কৃষিনির্ভর গ্রামজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল। তারপর নতুন করে আমাদের জাতীয় সত্তার ওপর চাপিয়ে দেয়া দ্বিজাতিতত্ত্বের নির্মোক ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ক্রমান্বয়ে খসে পড়ার সময় থেকে ধীরে ধীরে নগরজীবনেও নববর্ষ পালন শুরু হয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে। পাকিস্তান আমলে ১৯৫১ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় লেখক মজলিশ নামে একটি সংগঠন নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছিল পত্রিকা অফিসে। সরলানন্দ সেনের ‘ঢাকার চিঠি’ নামক গ্রন্থে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। অতঃপর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ঢেউ উঠল তার কিছু পরে ষাটের দশকে আমাদের নগর সংস্কৃতিতেও নববর্ষের সরব আয়োজন শুরু হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব রূপে প্রতিষ্ঠিত হলো। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশের সর্বত্র মহাসমারোহে নববর্ষ পালন করে আসছে। পহেলা বৈশাখ জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ পালন উপলক্ষে সময় সময় নানা ধরনের বিতর্ক তোলা হয়েছে। পাকিস্তান আমলে বলা হতো, বাংলা নববর্ষ হিন্দুদের উৎসব, মুসলমানদের জন্য নাজায়েজ। আবার সেসব কথা বলা শুরু হয়েছে ইসলামের সোল এজেন্সির দাবিদার প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী মহল থেকে। অবশ্য অবস্থার পরিবর্তনে ধর্ম ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে নিরস্ত হলেও আবার যে তারা সংগঠিত হচ্ছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

এ ধরনের অন্ধ ও অশুভ শক্তিই ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে পহেলা বৈশাখে বোমা মেরে ১০ জনকে হত্যা করেছে। তারপর ১৯ বছর চলে গেল। তদন্ত ও বিচার হিমাগারে। আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার রমনার বটমূলে বোমা হামলাসহ সব গ্রেনেড ও বোমা হামলার ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে শাস্তি বিধানের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। বাংলাদেশে নববর্ষ আবাহনের এ লগ্নে আবারও ভরসা রাখছি মানুষের ওপর, মানবতা ও শুভবুদ্ধির ওপর।

আমাদের সামাজিক অঙ্গনে পারস্পরিক বিদ্বেষ, শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে নতুনভাবে সব দল ও মতের কর্মীরা উঠে আসুক আজকে নববর্ষের দিনটিতে জাতির প্রতি তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ভালোবাসাকে সম্বল করে। অতীতের হানাহানি, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে তারা দাঁড়াক। তারা মনুষ্যত্বের পক্ষে তাদের মেধা, মনন ও শক্তি নিয়ে উঠে আসুক। যারা নির্যাতিত, বিপর্যস্ত তাদের পাশে দাঁড়াক সবাই মিলে। নতুবা দেশে বর্তমানে চালসহ সব পণ্যের অগ্নিমূল্যের কারণে যেরূপ অবস্থার উদ্ভব হয়েছে, তাতে মনে হতে পারে নববর্ষ আসছে হিংস্র-বিভীষিকার রূপ ধরে। একে ভয় করলেই তা অকল্যাণের হয়ে দাঁড়াবে। সাহসের সঙ্গে যদি এ ভয়ের মুখোমুখি হওয়া যায়, তখন তা পথকুকুরের মতো নিজেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। কাজেই ‘আছে যারা বোবার মতো তারাও কথা কবেই কবে’Ñ এ অভয় মন্ত্র হোক নববর্ষের সংকল্পবাণী। পহেলা বৈশাখ শুধু একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবই নয়, বাঙালির জীবনসুধাও বটে। এ দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিও পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের এ দিনে বাঙালি তাই তার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শক্তিশালী হয়।

সম্প্রতি ধর্মের লেবাসধারী কিছু সংখ্যক ইমাম এবং মাদ্রাসার শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। এদের কারও কারও পেছনে ন্যক্কারজনকভাবে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুলিশ। এবারকার নববর্ষ কলংকিত হয়েছে যৌন নিপীড়নের শিকার মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনায়। এ হত্যার দায় আমাদের সবার, সমাজের, রাষ্ট্রের। এবার পহেলা বৈশাখে আমাদের দাবি, নুসরাত হত্যাসহ সব ধর্ষক এবং হত্যাকারী, নারী নির্যাতনকারীর বিচার করতে হবে।

জঙ্গি এবং ধর্মীয় মৌলবাদীরা দেশে নতুন করে যে সন্ত্রাসের অবতারণা করার জন্য সংগঠিত হচ্ছে, সামাজিক মিডিয়াতে এ তথাকথিত ধর্ম গুরুরা ওয়াজ করে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা এবং নারী নির্যাতনের পক্ষে উসকানি দিচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করাই নববর্ষের পণ হওয়া উচিত। মত ও পথের ভিন্নতা সেখানে বাধা নয়। সংকীর্ণ ক্ষুদ্র স্বার্থ ও আত্ম স্বার্থ এক্ষেত্রে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কথাটা মনে রাখার মতো। সন্ত্রাসবিরোধী মূল্যবোধকে হাতিয়ার করে তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

এবারের নববর্ষের উৎসবে ১৯ বছর আগে যারা এদিনে অপশক্তির বোমা বিস্ফোরণে প্রাণ আহূতি দিয়েছেন তাদের প্রাণের মূল্যে গড়ে তোলা ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে কবির ভাষায় বলতে চাই : ‘নববর্ষে করিলাম পণ, লব স্বদেশের দীক্ষা’। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।