• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০

দিনলিপি : ২০১০

তানভীর মোকাম্মেল

| ঢাকা , সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১০

ভাদ্র ২১, ১৪১৭

হৃদয়পুরের রেল লাইনের পার ধরে সকালে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। দুধারে বস্তি আর বস্তি। সবই পূর্ববঙ্গের মানুষ। দেশভাগের এত বছর পরেও, এবং ভারতের এত উন্নয়নের পরেও, এসব বস্তিবাসীর জীবন রয়ে গেছে আগের মতোই অনিশ্চিত ও নির্মম, প্রায় মানবতের। এদের মধ্যে আমাদের খুলনা-যশোর অঞ্চলের অনেক মানুষ রয়েছে। রেললাইনের ধারে এক চায়ের দোকানে আমি আর সুশীলবাবু বসেছিলাম। দোকানটা চালায় এক সময়ে খুলনাবাসী স্বপন লস্কর ও ওঁর স্ত্রী ডলি লস্কর। স্বপন লস্করের বাড়ী খুলনা শহরে আর ডলি লস্করের বাড়ী নড়াইলে মধুমতীর পারে। এঁদের সঙ্গে আলাপ করে নতুন কিছু বিষয় জানতে পারলাম। দেশভাগের উপরে প্রামাণ্যচিত্রটার এরা সম্ভাব্য চরিত্র হতে পারে।

বিকেলে কলকাতায় ফিরে শ্যামবাজারের গিরীশ মঞ্চে ব্রাত্য বসুর দলের “রুদ্ধসঙ্গীত” নাটকটা দেখতে গেলাম। নাটকটা দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়ে। হাতে কিছুটা সময় ছিল। তাই হেঁটে কাছেই গিরীশ ঘোষের বাড়ীটাও দেখে এলাম। পরে গেলাম গঙ্গার পারে। বাগাবাজারের ঘাটটায় অনেকক্ষণ বসেছিলাম। তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। গঙ্গার পারে ব্রাহ্মণরা কোনো পূজা করছিল। মনে হোল যেন দু’তিনশ বছরের আগের সেই কলকাতাতে ফিরে গেছি !

শান্তনু নাটকটা দেখতে এসেছিল। পরে ও আমাকে কালীঘাটের এক রেস্তোরাঁয় ডিনার খাওয়াল। আগামীকাল চন্দননগর যাব।

সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১০

ভাদ্র ২২, ১৪১৭

গতকাল বারাসতে উমাপদর বাড়ীতে গিয়েছিলাম। অনেক গল্পের মধ্যে ও জানাল যে ও যখন প্রথম খুলনা থেকে বারাসতে চলে আসে তখন ওর খুব খারাপ লাগত। ও তখন প্রতিদিন বারাসত রেল ব্রীজটার উপরে দাঁড়িয়ে ট্রেন দেখত আর ভাবত ওরকম একটা ট্রেনে চাপলে হয়তো খুলনায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। কিন্তু মনে মনে এটাও জানত ওর আর কোনোদিনই খুলনায় ফিরে যাওয়া হবে না ! দুপুরে উমাপদর বাড়ীতেই খেলাম। ওর স্ত্রী তৃপ্তি বৌদি যত্ম করে খাওয়ালেন। উমাপদর মেয়ে উদিতা ইংরেজী সাহিত্যে ভর্তি হয়েছে। জেনে খুশী লাগল।

আজ সকালে পার্ক স্ট্রীটের ছোট এয়ারলাইন্সের অফিসে যেয়ে আমার ফেরার টিকিটটা সুনিশ্চিত করলাম। পঁচিশ তারিখ দেশে ফিরব।

বিকেলে চন্দননগরে এলাম। সুরজিতের সঙ্গে। “ফকিরনামা” বইটির লেখক সুরজিতের সঙ্গে আমার গত বছর থেকে পরিচয়। চন্দননগরের পুরশ্রী এলাকায় সুরজিৎদের সুন্দর একটা দোতলা বাড়ীতে উঠেছি। আগামী দু’দিন এখানেই থাকব। সুরজিৎ আগামীকাল আমাকে চন্দননগর শহরটা ঘুরে দেখাবে।

সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১০

ভাদ্র ২৩, ১৪১৭

সুরজিৎ সকালে আমাকে গঙ্গার ধারে বেড়াতে নিয়ে গেল। নদীর পারে চন্দননগরের স্ট্রান্ড রোডটা সত্যিই চমৎকার। ওখানে গঙ্গার পারে রবীন্দ্রনাথদের সেই বাড়ীটা দেখলাম যেটার বাগানে বসে রবীন্দ্রনাথ একাধিক কবিতা লিখেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পাশেই একটা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়া হয়েছে। সেটাতে রফিক-জব্বার-সালামদের নাম দেখে ভাল লাগল। এছাড়া দেখলাম ফরাসীদের গড়া কিছু পুরনো স্থাপনা। চন্দননগর শহরটা বেশ ভাল লাগল। আসলে শহরের গা ঘেঁষে গঙ্গার মত ওরকম একটা নদী থাকলে যে কোনো শহরই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে বাধ্য।

সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ ছিল সুরজিৎতের বন্ধু আলোকচিত্রশিল্পী শৈবাল দাসের বাসায়। কুন্ডুঘাট এলাকায় শৈবালদের বাড়ীটিও ভারী সুন্দর। ওঁরা চন্দননগরের পুরনো বনেদী বড়লোক। বাড়ীটায় সেটার ছাপ রয়েছে।

কাল ভোরে গণদেবতা এক্সপ্রেসে চেপে শান্তিনিকেতনে যাব। কার্তিক বাউল টেলিফোনে জানাল ও আমার জন্যে গুসকরা স্টেশনে অপেক্ষায় থাকবে। আমাকে নিয়ে যাবে ওর আখড়ায়। পরে সন্ধ্যায় যাব শান্তিনিকেতনে। “শান্তিনিকেতন হোটেল”-য়ে ঘর ঠিক করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১০

ভাদ্র ২৪, ১৪১৭

ভোরবেলা চন্দননগর থেকে ব্যান্ডেলে এসে “গণদেবতা এক্সপ্রেস”-য়ে চেপে গুসকরা এসে পৌঁছলাম সকাল সাড়ে ন’টার দিকে। কার্তিক স্টেশনে ছিল। ও আলুটিয়ায় ওর বাড়ীতে নিয়ে গেল। দুপুরে ওখানেই খেলাম। কার্তিক ওর আখড়ার নতুন ঘরের জন্যে জায়গা দেখাল। ভালই হবে। ওর আখড়াটায় বেশ ফুলগাছ আছে। জবা জুলই তো রয়েছে চার রকম। এর মধ্যে একটা প্রজাতি হচ্ছে সাদা জবা। সাদা রংয়ের জবা ফুল আমি আগে কখনও দেখিনি। কার্তিক জানাল ওর বাগানে দু’টো বাস্তুসাপও আছে। আমার অবশ্য চোখে পড়ল না ! কার্তিকের বউ অন্ন অনেক কিছু রান্না করেছিল। আমিষ-নিরামিষ দু’রকমই। অন্নদের আদি দেশ ফরিদপুরে। আর কার্তিকদের আদি দেশ বরিশাল জেলায়।

পরে কার্তিকের সঙ্গে এলাম অজয় নদীর পারে। শরৎ আসছে। অজয় নদীর পারে কাশফুলের মেলা। খুব সুন্দর লাগছিল দেখতে। কার্তিক জানাল অজয় নদীতে চোরাবালি আছে। মাঝে মাঝে নাকি দূর্ঘটনা ঘটে !

রাতে বোলপুরে এসে “শান্তিনিকেতন হোটেল”-য়ে উঠেছি।