• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৯, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০

দিনলিপি : ২০১১

তানভীর মোকাম্মেল

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৯

ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১১

মাঘ ১৯, ১৪১৭

“লালনের উপর সুফীবাদের প্রভাব” লেখাটা নিয়ে আজো কিছু কাজ করলাম। লেখাটা এখন পুরোদস্তুর একটা একাডেমিক লেখা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে।

ফিলিপ চিয়াই ই-মেইলে জানালেন যে আমার সাতটি ছবি ওঁরা ইন্টারনেটে বিক্রী করতে চান। আমার মত জানতে চাইলেন। চিয়াই আগে সিঙ্গাপুর চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক ছিলেন। আমি শফীর কাছে চিঠি লিখে বিষয়টা সম্পর্কে শফীর মত জানতে চেয়েছি। ও এসব জিনিষ বোঝে ভাল।

রাতে এটিএন নিউজ টেলিভিশন চ্যানেল প্রায় বাইশ মিনিট ধরে আমার একটা সাক্ষাৎকার দেখালÑ আমার বাসায়, ফিল্ম ইনস্টিটিউটে, গাড়ীতে ও নৌকায় নেয়া বেশ বড় সাক্ষাৎকারই বলব। আমার ছবি ও জীবন নিয়ে অনেক কথাই বলা হোল। এতটা সময় ধরে টেলিভিশনের পর্দায় নিজেকে দেখতে একটু বিব্রতই হচ্ছিলাম। পরিবেশনাটা মন্দ ছিল না। তবে পর্দায় সারাক্ষণ আমাকে না দেখিয়ে আমার ছবিগুলির দৃশ্যাবলী দেখালেই হয়তো বেশী ভাল হোত।

মিশরে গণআন্দোলন ক্রমশ:ই তীব্র হচ্ছে। কায়রোতে প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের এক জমায়েত ঘটেছে।

ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১১

মাঘ ২০, ১৪১৭

দিনটা নৌকায় কাটল। শীতের এই মিষ্টি রোদে নৌকায় বা গ্রামের পথে ঘুরতে ভাল লাগে। আজ যে গ্রামটায় গেলাম তার নাম চরচামারদহ। ধলেশ্বরীর পারের এই গ্রামগুলি এখন শস্যভান্ডার। মাঠের পর মাঠ ভরা শীতের নানারকম শাকসুবজী। কৃষকদের কাছ থেকে কিছু ফুলকপি ও বেগুন কেনা হোল। আর পরে নদীতে হাটের পথের এক নৌকা থেকে কেনা হোল টমেটো ও ধনেপাতা।

রাত্রে সুজান আমাকে ও বিরগিটেকে “সন্তুর” রেস্তোরাঁয় ডিনার খাওয়াল। দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁ। আমি খেলাম নারকেলের দোসা।

মিশরে বিক্ষোভকারী ও মোবারক-সমর্থকদের মধ্যে রাস্তায় রাস্তায় সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। মোবারক-সমর্থক মানে কিছু পেশাদার গুন্ডা-দাঙ্গাবাজ। ওই স্বৈরাচারীরা যেসব গুন্ডাপান্ডা পুষে থাকে আর কী ! ঘটনা কোন্ দিকে যাবে তা’ অনেকটাই নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর ভূমিকার উপর‌্য। মিশরের সেনাবাহিনী মোবারকের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যহার করলেই মোবারকের সরকার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়বে।

ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১১

মাঘ ২১, ১৪১৭

বিটিভি থেকে স্বপন ফোন করেছিল। বলল যে যুদ্ধপরাধীদের ব্যাপারে বিটিভি থেকে ওরা আমার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চায়। জানিয়েছি সম্ভব। সমস্ত জাতিই চায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক্। মানবতাবাদের বিরুদ্ধে এত বড় অপরাধ করে ওই সব খুনে-ধর্ষক লোকগুলো পার পেয়ে যাবে এটা মোটেই ঠিক হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই মঙ্গল।

“লালনের উপর সুফীবাদের প্রভাব” লেখাটা যত বড় হবে ভেবেছিলাম তার চেয়ে বড় হয়ে পড়ছে ! তবে লালনের ব্যাপারে পরিশ্রম করতে আমি ক্লান্তিহীন।

ইমতিয়াজ ই-মেইলে জানাল যে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত বর্ষ উপলক্ষে ঢাকায় যে আন্তর্জাতিক সেমিনারটা হচ্ছে সেখানে আমি একটা পেপার পড়লে ওরা খুশী হবে। আমার বিষয় হচ্ছে “বিশ্বায়নের এই যুগে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা”। এই বিষয়ে একটা পেপার লিখতেই হবে দেখছি।

মিশর এখনও অস্থিতিশীল। এই সুন্দর দেশটা না আবার কোনো গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি পড়ে যায়। সবটাই নির্ভর করছে মিশরের সেনাবাহিনীর উপর।

ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১১

মাঘ ২২, ১৪১৭

ফিলিপ চিয়াহ আমাদের সাতটি ছবি ইন্টারনেটে পরিবেশন করার যে প্রস্তাব দিয়েছিল সে ব্যাপারে শফীর মত জানতে চেয়েছিলাম। ওকে তেমন উৎসাহী বলে মনে হোল না। ও আমার তিনটে প্রামাণ্যচিত্রের সহ-প্রযোজক। ওই ছবিগুলো বাদ দিয়ে তাই আমার আর চারটি ছবি পরিবেশনার জন্যে ফিলিপ চিয়াহকে আজ ওঁদের চুক্তিপত্র পাঠাতে বললাম। আশা করি দু’একদিনের মধ্যেই পাঠাবে।

“লালনের উপর সুফীবাদের প্রভাব” লেখাটা চূড়ান্ত করছি। প্রেসে দেবার আগে আরো দু’তিনদিন লাগবে বলে মনে হচ্ছে।

বিকেলে ধানমন্ডীর লেকের পারে অনেকক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম। পরে গেলাম অ্যালিয়ঁন্স ফ্রাঁসেজে। ওখানে কফি খেয়ে বাসায় ফিরে কিছু লেখাপড়া করা গেল।

মিশরে গোলযোগ চরমে। জনতা শহরের কেন্দ্রস্থল দখল করে রয়েছে। কিন্তু মোবারকের ক্ষমতা ছাড়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। সময় ফুরিয়ে আসছে ! দু’একদিনের মধ্যেই হয় মোবারককে ক্ষমতা ছাড়তে হবে অথবা মিশরে চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

আগামী দু’দিন নৌকায় যেয়ে থাকব ঠিক করেছি।

ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১১

মাঘ ২৩, ১৪১৭

দিনটা কাটল ধলেশ্বরীর বুকে। নৌকায় বসে “লালনের উপর সুফীবাদের প্রভাব” লেখাটার প্রুফ দেখলাম, নদীতে সাঁতার কাটলাম এবং নদীর চরে নেমে কৃষাণ-কৃষাণীদের কাছ থেকে মটরশুটি ও লাউ কিনলাম। চরগুলোতে এখন রবিশস্য তোলার কাজ চলছে। এবার ফলন বেশ ভাল। পুরুষ ক্ষেতমজুরদের মজুরী মন্দ নয়। দৈনিক দুই শ’ টাকা। প্রচুর নারী-মজুরও ক্ষেতে কাজ করছে। তবে ওদের মজুরী বেশ কম। মটরশুটি তোলার জন্যে ওরা পায় পাঁচ কেজি তুলতে পারলে পাঁচ টাকা। মেয়ে শ্রমিকেরা জানাল, যাদের মধ্যে অল্পবয়সী অনেক কিশোরীও রয়েছে, যে দিনে ওরা একশ’ টাকার বেশী আয় করতে পারে না। কবে যে এদেশে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের বেতনের বৈষম্য দূর হবে।

বিক্রমপুরের আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের বিপক্ষে স্থানীয় জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরটি আড়িয়াল বিলে নির্মাণ করা হবে না। পদ্মার চরে অথবা পদ্মা নদীর ওপারে করা হবে। কুচিয়ামোড়ার হাজী আমার সঙ্গে নৌকায় দেখা করতে এসেছিল। বলল, বিমানবন্দরটি ওখানে না হওয়াতে স্থানীয় লোকদের খুব ক্ষতি হয়ে গেল। জমির দাম বেড়ে সোনার দাম হোত ! বলল, অস্থানীয়রা বাইরে থেকে এসে এই আন্দোলন করেছে।