• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮ ৪ রমজান ১৪৪২

১৫-৩০ বছরের তরুণরাই উগ্রবাদে বেশি জড়িয়েছে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০

সবাই রেসপনসিবল জার্নালিজম করতে বলেন, কিন্তু গুড ডেমোক্রেসির কথা বলেন না। গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না। আর গণমাধ্যমের প্রচার, প্রকাশনায় বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকারের চাওয়া পূরণ হবে না। বরং প্রচার-প্রকাশ করতে দিলে স্টাবলিশার বা সরকার যা চায় তা পূরণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। গতকাল সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘উগ্রবাদ রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের দায়িত্বরত সিনিয়র সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা এই দাবি করেন।

সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিসা) আয়োজিত আলোচনা সভায় জিটিভি ও সারাবাংলা ডটনেটের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, কোথাও জঙ্গি আটক বা গ্রেফতার হলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জেহাদি বইসহ যোদ্ধা আটক হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে জঙ্গিবাদকে এক ধরনের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন হতে হবে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের বাইরের লোক মনে করে- বাংলাদেশের রাস্তায় বের হলে জঙ্গিরা চাপাতি দিয়ে কোপানো শুরু করে। বাস্তব অবস্থাটা গণমাধ্যমকেই প্রচার করতে হবে। যারা অভিযান চালাবে তাদের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। মিডিয়া হাউজের সোশ্যাল রেসপন্স রয়েছে। এটা বাড়াতেই সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) এর এক প্রতিবেদন উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্সে জঙ্গিবাদের ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ছিল ২১তম দেশ। ওই সময় পাকিস্তান ও ভারত ১০ এর মধ্যে ছিল। ২০১৮ সালে এসে যে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, সেখানেও বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়ায় ২৫-এ। অর্থাৎ আরও চার ধাপ এগিয়ে যায়। ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে এসে বাংলাদেশ আর ছয় ধাপ এগিয়ে ৩১তম হয়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশই পিছিয়ে আছে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশে উগ্রবাদের ঝুঁকি কমছে। এতে আছে মিডিয়ার ভূমিকা, প্রশাসনের দক্ষতাসহ বেশকিছু উপকরণ।

মনিরুল ইসলাম বলেন, কাজ করতে গিয়ে দেখেছি ১৫-৩০ বছর বয়সী তরুণরাই উগ্রবাদে বেশি জড়িয়েছে। এ কারণে আমরা পাড়া-মহল্লায় সব জায়গায় পোস্টার ও বিলবোর্ড লাগিয়েছি। পরিবার, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। উগ্রবাদে জড়ানোর বিষয়টি প্রথম তাদের কাছেই ধরা পড়ে। ধর্মীয় বক্তারা ওয়াজ মাহফিলে নারী ও অন্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেন। সেটি যেন করতে না পারেন সেজন্য আমরা কাজ করছি। কিন্তু বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদ দমনে সুনির্দিষ্ট জাতীয় কোন স্ট্র্যাটেজি নাই। এটা করতে সময় লাগে। তবে আমরা কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম (সিভিই) করতে যাচ্ছি।

একাত্তর টিভির কর্ণধার মোজাম্মেল বাবু বলেন, বাংলাদেশে ২০টির বেশি টেলিভিশনের দরকার নাই। কিন্তু সরকার লাইসেন্স দিয়েছে ৪০টি। এতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মূলধারার মিডিয়ায় ছাঁটাই চলছে। আবার সরকারের কাজ মিডিয়ার টুঁটি চেপে ধরা নয়, কিন্তু সত্য প্রচারেরও টুঁটি চেপে ধরা হয়। একটি নিউজ অন এয়ার করা হলে স্টাবলিশার (সরকার) থেকে বলা হচ্ছে, থামান। লাইনে লাইনে সংশোধন করতে হচ্ছে। আমাদের ওপর আস্থা নেই স্টাবলিশারের। কিন্তু আপনি কিছু না দেখালে গুজব আরও বেশি ছড়াবে।

মতিঝিলে হেফাজতের তা-বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রথমে লাইভ বন্ধ করতে বলা হলো, আমরা মিনিটে মিনিটে দেখালাম। যারা বন্ধ করতে বলেছিল, পরে তারাই আবার ফুটেজ চেয়েছিল। গুজব বন্ধ করতে হলেও সত্যটাই প্রকাশ করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় কেউ কি বলতে পারব কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়নি? একটা ঘটনা ঘটলেই হলো। আমাদের নিউজ বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। কেন্দ্রে বিএনপি বা সরকারি দলের প্রতিপক্ষের এজেন্ট নেই, এটা লাইভ দেখাতে নিষেধ করা হলো, দেখানো যাবে না। কিন্তু আমরা যদি ওই এজেন্টকে খুঁজে বের করে দেখাই যে, সে বাসা থেকে বের হয়নি, কেন্দ্রে আসবে কীভাবে? এতে কি স্টাবলিশার (সরকার) লাভবান হতো না? আজ আইপি-টিভি নিয়ন্ত্রণে নাই। অথচ আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে।

মাছরাঙ্গা টিভির হেড অব নিউজ রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, হলি আর্টিজানের সময় নিবরাজদের ৫ জনের হাসির ছবি অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। সেটা ছাপা ঠিক হয়নি। একজন ওয়াজে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী সুনাম ও নারী নেতৃত্ব বিরোধী কথা বলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেন। এটা নিয়ে আপনাদের কাজ করতে হবে। এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা বাড়াতে হবে। পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ২০১৫ সালের প্যারিস হামলার পর এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ কাউকে এমনকি এমপি-মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিকেও ঢুকতে দেয়নি। আমাদেরও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।

এনটিভির বার্তাপ্রধান জহিরুল আলম বলেন, মিডিয়ার নিজেদের পক্ষ থেকে বেশি কিছু করার থাকে না। কারণ আমরা নানা সংকটে থাকি। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে একটি সহিংস ঘটনার কথা মনে আছে। যেটা মূল ধারার মিডিয়ায় না আসলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে। ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের স্থায়ী বোঝাপড়া থাকবে। জঙ্গিবাদ গবেষণা রাষ্ট্রীয় গবেষণার চেয়ে অগ্রসরমান, সেভাবেই তারা সামনে এগিয়ে যায়। বিভিন্ন মাদ্রাসা, মসজিদ, স্কুলে এখনও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন ধর্মপ্রচার বন্ধ না হয়। গণমাধ্যমের চেয়েও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।