• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ০১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ জিলকদ ১৪৪১

প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব

হাওর অঞ্চলে কৃষকদের আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা : ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো ফসল

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, (অষ্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ)

| ঢাকা , রোববার, ০৭ এপ্রিল ২০১৯

একফসলি বোরো উৎপাদনে হাওরাঞ্চলের সবুজ মাঠগুলো ধান পেকে যখন সোনালী হেেয় কাটার অপেক্ষায় রয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবে আবার ক্ষতি হতে শুরু করেছে। কৃষকরা বুক ভরা আশা নিয়ে ধান কেটে গোলায় উঠাবার ক’দিন বাকি প্রকৃতির এই বিরূপ প্রভাব হাওরের জনমনে আতঙ্ক উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় এই অঞ্চলের ৭০ থেকে ৯০ ভাগ ফসল বিনষ্ট করে। বিপন্ন কৃষকদের বঁাঁচানো এবং পরবর্তী ফসল উৎপাদনের জন্য সরকারিভাবেও সার, বীজ, চাল, নগদ টাকা ইত্যাদি কৃষি ভর্তুকিতে সহায়তা করে। কিন্তু গত মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবারের দফায় দফায় শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও দমকা হাওয়া ইত্যাদি প্রকৃতির বিরূপ পরিবেশে কষ্টার্জিত ফসলহানির খবর পেয়ে কৃষকদের মাঝে শুরু হচ্ছে হাহাকার। ফলে হাওরের কৃষকরা আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় কাঁচা-পাকা ধান কাটছে। ইতোমধ্যে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ও পার্শ¦বর্তী হাওর উপজেলায় দফায় দফায় শিলাবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ে হাওরে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি বিনষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও ক্রমাগত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি আসতে শুরু করায় নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও বি-বাড়ীয়া জেলার সংযোগস্থল এই হাওরাঞ্চলের আবাদি জমির ৭০ ভাগ জমিতেই একমাত্র ফসল বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। মোট জনসংখ্যার ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ মানুষ এ বোরো উৎপাদনের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আবাদি জমির ৮০ ভাগের মালিক ১৪ শতাংশ মানুষ হওয়ায় এখানে বর্গাচাষি ছোট ও মাঝারি কৃষক, প্রান্তিক চাষি, মজুর মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মধ্য কার্তিক হতে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলের জমিগুলোতে বোরো চারা রোপণ করা হয় এবং চৈত্র হতে বৈশাখ মাস কোন কোন সময় জৈষ্ঠ মাসে ফসল কেটে কৃষকরা গোলায় উঠায়। উৎপাদনের ২০ শতাংশ স্থানীয় খাদ্য চাহিদা পূরণ করে ৮০ ভাগ ধান জাতীয় খাদ্য ভান্ডারে যোগান হয়ে থাকে। এই অঞ্চলের অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নিকলী, বাজিতপুর, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ, লাখাই, বানিয়াচং, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সরাইল ইত্যাদি উপজেলায় ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় ৭০ থেকে ৯০ ভাগ বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছিল। বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী ভরাট ইত্যাদি কারণে ক’বছর পরপরই অকাল বন্যায় কৃষকদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়। সারাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেলেও এই হাওরাঞ্চলে শ্রেণী বৈষম্য বেড়েই চলছে। শ্রমজীবী লোকজনও কৃষি মজুরিতে এবং বৈশাখে ধান কাটার মৌসুমে ছয় সাত মাসের খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে এবারেও বিভিন্ন হাওরে প্রচুর জমি রোপণ করতে না পারায় অনাবাদি রয়ে গেছে। বাঁচার তাগিদে কৃষকরা হাওরগুলোতে বোরোর আবাদ করে। ফসলের জমিগুলোতে অত্যন্ত সুন্দর ও বাম্পার ফলন হয়েছে। সবুজের সমারোহ থেকে প্রতিটি হাওরে ধান পাকতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার দফায় দফায় শিলাবৃষ্টি, ঝড়, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতের কারণে ইতোমধ্যেই বিনষ্ট হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে অষ্টগ্রামের বড় হাওরের ছাইত্তা, আইল্লা টেক, শেখেরহাটির হাওর, পুকুরপাড়ের হাওর, শরীফপুরের হাওর, লুগুইরা, মুগুইরা, নয়াবন্দসহ বেশ কয়েকটি হাওরে ঘুরে দেখার সময় কৃষকরা জানান, প্রথমত চিটা পরে ব্লাস্ট-এর আক্রমণে আগেই অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, এখন শিলাবৃষ্টিতে যা ছিল তাও শেষ। দেখা গেছে, শিলাবৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও জমিতে হাঁটু পানি জমে যাওয়ার কারণে কাঁচা-পাকা ধান কাটছে কৃষকরা। কোথাও জমিতে ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও কাস্তুল, ভাতশালা, বাংগালপাড়ার নোয়াগাঁওয়ের কৃষক রুবেল মিয়া জানান, ৪ একর বোরো জমি চাষ করেছিল, এর মধ্যে ৩ একরই শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। কলমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যন রাধাকৃষ্ণ দাস জানান, ঢালাকান্দি হাওর ও শরীফপুরের হাওরসহ কলমা ইউনিয়নের প্রায় ২৫-৩০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে। ভাঠির নগরের কৃষক অসিত বরন দাস বলেন, ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে ৪ একর জমি চাষ করেছিলাম কিন্তু শিলাবৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন এই জমিতে ৫ হাজার টাকাও পাওয়া যাবে না। পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও লর্ড কিং কাউছারুল আলম বলেন হাওরে শিলাবৃষ্টিতে তার কাঁচা-পাকাসহ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ ফসল বিনষ্ট হয়ে গেছে। পরাশর পাড়ার চাষি জামাল মিয়া জানান, ৭ একর জমিতে বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করেছিল, কিন্ত দু’দিনের দফায় দফায় শিলাবৃষ্টিতে বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। এ বছর ঘরে ধান আসবে কিনাÑ তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন হাওরের একাধিক কৃষক। তবে কৃষকদের দাবি ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার হেক্টর হলেও কিশোরগঞ্জ কৃষি অধিদফতরে ক্ষতি পরিমাণ খুবই অল্প দেখানো হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। এসব বিষয়ে কিশোরগঞ্জের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে সংবাদ প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। তারপর একাধিকবার মোবাইলের কল দিলেও ফোনটি রিসিভ করেননি।