• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

শেষ মুহূর্তে বইমেলায় মানুষের ঢল

সংবাদ :
  • আবদুল্লাহ আল জোবায়ের

| ঢাকা , শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর। সড়ক দ্বীপের মাঝ বরাবর চলছে মেট্রোরেলের কাজ। ফুটপাত থেকে শুরু করে রাস্তায় যেটুকু জায়গা রয়েছে, সবখানে মানুষ আর মানুষ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় জনসমুদ্র। সবার গন্তব্য একই; অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলায় প্রবেশে দীর্ঘ লাইন। বইমেলার ভেতরেও গিজগিজ করছে মানুষ আর মানুষ। মেলার শেষ শুক্রবার ছিল গতকাল। তাই সকাল থেকেই মেলায় ভিড় ছিল। মেলা শুরু হয়েছিল বেলা ১১টায়। দুপুর একটা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। এই সময়টাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু চত্বরে হালুম, ইকরি আর শিকুদের দেখতে শিশু কিশোরদের উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। দুপুর একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত মেলায় লোক সমাগম কিছুটা কম ছিল। জুমার নামাজ ও মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলেন বইয়ের ক্রেতারা। দুপুর গড়াতে শুরু করতে না করতেই ঢল নামে মেলায়। বিকেল নাগাদ মেলা টইটম্বুর। শুক্রবারে মেলায় বিক্রিও হয়েছে আশানুরূপ। ক্রেতাদের সামলে বিক্রয় কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই যেনো। দেখতে দেখতে একদম শেষের দিকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রথম দিন থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও মেলায় বেচা-বিক্রি ছিল না তেমন। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে বই বিক্রি।

গতকাল গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, মেলায় আসা বেশির ভাগ দর্শনার্থীদের হাতে নতুন কেনা বইয়ের ব্যাগ। কারও দু’হাতে আবার কারও পরিবারের সবার হাতে বইয়ের ব্যাগ। মেলা ঘুরে ঘুরে পছন্দের লেখকের বই কিনছেন তারা। আগে থেকেই পছন্দ করে রাখা বইয়ের পাশাপাশি মেলায় দেখে পছন্দ করে বই কিনছেন অনেকে।

বিকেলে বইমেলা এসেছিলেন রাজধানীর সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী সেলিম আহমেদ। তিনি বলেন, শেষ সময়ে এসে পাঠকরা বেশি বেশি বই কিনছে, কারণ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বেশি ছাড় দিচ্ছে। আমি প্রায় ৩০টি বই কিনেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দু’হাতে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরছি লেন তাহমিদ। আলাপকালে তিনি বলেন, কেবলমাত্র বই কেনার জন্য সিরাজগঞ্জ থেকে রাতের ট্রেনে ঢাকায় এসেছি। সারাবছর পড়ার জন্য বইগুলো মেলা থেকে সংগ্রহ করব। উদীচীর সদস্য তানহা বলেন, বইমেলার শেষ শুক্রবার ছিল গতকাল। মেলায় যারা এতদিন ব্যস্ততার জন্য আসতে পারেননি তাদের অনেকেই গতকাল এসেছেন। কিনে নিয়েছেন পছন্দের বই। ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে মেলায় এসেছেন। তাদেরই একজন ইশতিয়াক আলম। তিনি বলেন, স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে নিয়ে মেলায় এসেছি। ওদের জন্য বই কিনব। ছুটির দিনটা মেলায় কাটিয়ে দিতে চাই।

তবে বই মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেক দর্শনার্থী। অসম্পাদিত বইয়ের পাশাপাশি মানহীন গল্প এবং রচনার বই ছেয়ে গেছে বই মেলা। ফলে ভালো বইগুলো জনপ্রিয়তা পায় না বলে অভিযোগ অনেকের। ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আইরিন সুলতানা বলেন, মেলায় মানসম্পন্ন বইয়ের বড় অভাব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রচারণার ফলে এ সব বই বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও অসম্পাদিত এবং অতি উৎসাহী নামমাত্র কিছু শৌখিন প্রকাশকরা বই প্রকাশ করছেন।

তবে শেষ সময়ের বেচাকেনায় সন্তুষ্ট প্রকাশকরা। তারা বলছেন, অন্যবারের তুলনায় এবারের বই অনেক মানসম্পন্ন। মুক্তিযুদ্ধের স্টলের কর্মী শুভ বলেন, সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। এর ছোঁয়া লেগেছে মেলায়ও। বই মেলায় এবার মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বইয়ের চাহিদা বেশি। মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের পাশাপাশি এবারের মেলায় শিশু সাহিত্য, রম্য গল্প, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণের বই বেশি বিক্রি হয়েছে। যদিও বাংলা একাডেমির দেয়া তথ্য মতে এবারের মেলায় সবচেয়ে বেশি প্রকাশ হয়েছে কবিতার বই। এর পরপরই আছে গল্প এবং উপন্যাসের বই।

শিশুপ্রহরে শিশুদের মেলা

বইমেলার শেষ শুক্রবারে গতকাল শিশুদের কলকাকলিতে মুখর ছিল শিশুপ্রহর। মেলার শেষ সময়ে নিজের পছন্দমত বই কেনে ছোট্ট সোনামণিরা। অভিভাবকরা মনে করছেন, মাসজুড়ে এ বইমেলার রেশ শিশুদের বইপ্রেমী করে তুলবে। আর শিশুদের মনন অনুযায়ী বই যোগান দিতে পেরে খুশি বই বিক্রেতারাও। গতকাল গ্রন্থমেলার শিশু চত্বর ঘুরে দেখা যায়, বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশুরা নিজের পছন্দের বই দেখছে ও কিনছে। শেষ সময়ে ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে এসেছেন বইমেলায়। শিশু চত্বরে বই কেনার পাশাপাশি আগত সোনামোণিরা উপভোগ করছে সিসিমপুরের আয়োজনে বিশেষ পরিবেশনা। শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাবা-মায়েদেরও বেশ আনন্দ ও উদ্দীপনা নিয়ে সিসিমপুরের আয়োজন উপভোগ করতে দেখা গেছে।

বই কিনতে বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছে ছোট্ট জারিয়া। কচি চোখে নিজের পছন্দের বই খুঁজতে ব্যস্ত পাঁচ বছরের শিশুটি। মেলা শেষ হয়ে গেল বলে শিশুমনে ছিল কিছুটা আক্ষেপও। ময়মনসিংহ থেকে কিশোর আশিক উল্লাহ বিজয়কে নিয়ে মেলায় এসেছে তার বাবা এনায়েত উল্লাহ। এই ব্যাংক কর্মকর্তা নিজেও প্রথমবার এসেছেন বইমেলায়। কথা হলে তিনি বলেন, বইমেলার পরিসর অনেক বড়। গণমাধ্যমে যা দেখি, তার থেকেও বড়। ছেলের শখ বইমেলা আসা। তাই সেই শখ পূরণ করতেই তাকে নিয়ে আসা, সঙ্গে নিজেও চলে এলাম। আশিক উল্লাহ বিজয় বলেন, বইমেলা খুবই বড়। অনেক অনেক বই এখানে। আমি গণিত এবং বিজ্ঞানের কিছু বই কিনেছি এবং সারাদিন মেলা ঘুরে আজ আরও অনেক বই কিনব।

ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আসাওফ ঠাকুরকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকা থেকে বইমেলায় এসেছেন তার বাবা ফরহাদ ঠাকুর। সন্তানের জন্য তিনি কিনেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা বেশকিছু বই। কথা হলে আসাওফ বলেন, এ বছরের মেলায় এবারই প্রথম আসলাম। মেলা ঘুরে অনেক বই দেখে ভালো লাগছে। সারাদিন মেলায় ঘোরার এবং আরও অনেক বই কেনার ইচ্ছে আছে। আসাওফের বাবা ফরহাদ ঠাকুর বলেন, অনেক মানুষ আসছে মেলায়। এই ভিড়ের মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে স্টলগুলো ঘুরতে একটু কষ্টই হচ্ছে। তবে অন্য অনেক শিশুদের উপস্থিতিতে আমার সন্তানও আনন্দ পাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। আনন্দ করতে করতেই যদি বাচ্চারা কিছু শিখতে পারে, এর থেকে ভালো আর কিছুই হতে পারে না।

এদিকে ছুটির দিনের সকাল থেকেই শিশুচত্বরে বইয়ের বিকিকিনি ভালো বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রকাশক। এ প্রসঙ্গে পঙ্খিরাজ প্রকাশনীর প্রকাশক দেওয়ান আজীজ বলেন, সকাল থেকেই শিশুদের উপস্থিতির পাশাপাশি বইয়ের বিক্রিও বেশ ভালো। মেলা এখন শেষ সময়ে থাকায় যারাই মেলা আসছেন, তারা সবাই প্রায় বই কিনছেন। আর ছোটদের বইগুলোর মধ্যে গল্পের বইয়ের প্রতিই শিশুদের ঝোঁক বেশি।

ছুটির দিন উপলক্ষে গতকাল মেলা চলে বেলা ১১টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করে এবারের বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে এবার ২ ফেব্রুয়ারি বিকালে মেলা শুরু হয়, উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লিপ ইয়ার উপলক্ষে এবার ফেব্রুয়ারি মাস ২৯ দিনের। তাই আজ ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত নয়টায় পর্দা নামছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর।