• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭, ৫ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

পবিত্র হজ পালন

বিশ্বশান্তি ও মহামারী থেকে মুক্তির দোয়া

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০

image

মুসলিম উম্মাহর শান্তি-সমৃদ্ধি ও নিজেদের গুনাহ মাফ এবং করোনা মহামারী থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে পালিত হলো মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম সমাবেশ ও ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ পবিত্র হজ। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’ মাতা লাকা ওয়ালমুলক; লা শারিকা লাক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল আরাফার প্রান্তর। লাখো হাজীর কণ্ঠে পুনঃ পুনঃ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ‘আমি হাজীর, আমি হাজীর দয়াময়’। এ সময় সবার চোখ থেকে পানি ঝরছিল।

গতকাল ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে সারা দিন অবস্থান, খুতবা শ্রবণ, জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায়, আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় হজের মূল পর্ব। দুপুরে আরাফাতের ময়দানসংলগ্ন মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা শুরু হয়। জাবালে রহমতের পাদদেশে ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেন নতুন খতিব শায়খ ড. আব্দুল্লাহ ইবনে সুলাইমান আল-মানিয়া। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই, ৯ জিলহজ) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে সালাম দিয়ে হজের খুতবা শুরু করেন তিনি। খুতবার শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করেন। আরাফাতের ময়দানে হাজীদের উদ্দেশে দেয়া খুতবায় তিনি প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারী করোনা থেকে মুক্তি, গোনাহ মাফ, আল্লাহর রহমত কামনাসহ সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রতি নানা নির্দেশনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেন।

খুতবায় মানুষের অধিকার, বিশেষ করে নারীর অধিকার ও উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন শায়খ মানিয়া। সেই সঙ্গে ওয়াদাপালন, মা-বাবার সেবা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, মানবসেবা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন হওয়ার কথা বলেন। শায়খ মানিয়া খুতবায় কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হওয়ার আহ্বান জানান। ইবাদত-বন্দেগির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেন। আরাফাতের ময়দানে করণীয়সহ হজের পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। নামাজ, পবিত্রতা অর্জন, রোগীর সেবা, মহামারি উপদ্রুত এলাকায় প্রবেশ না করা এবং ওইসব এলাকা থেকে অন্যত্র না যাওয়ার কথা বলেন। লিখিত খুতবায় তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে সৌদি সরকারের গৃহীত হজের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, খুব দ্রুত বৈশ্বিক এই মহামারী কেটে যাবে। আবার আগের মতো হজ ও উমরা যাত্রীদের আগমনে মুখরিত হবে পবিত্র এই ভূমি। ৩০ মিনিটব্যাপী খুতবার শেষাংশে সৌদি সরকারের জন্য দোয়া করেন, সেই সঙ্গে বিশ্বে শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করেন শায়খ মানিয়া। রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করেন। করোনাকে মহামারী উল্লেখ করে, এর থেকে বিশ্ববাসীর হেফাজতের জন্য দোয়া করেন। সর্বাবস্থায় আল্লাহর দরবারে যাবতীয় সমস্যান জন্য বেশি বেশি দোয়া করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

করোনা মহামারির কারণে যারা আগে হজ করেননি, এমন এক হাজার ব্যক্তি এবার হজের সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ মুসল্লিকে ১৬০টি দেশ থেকে বাছাই করে নেয়া হয়েছে। তারা সবাই সৌদি আরব প্রবাসী। বাকি এক-তৃতীয়াংশ মুসল্লি সৌদির নিরাপত্তাকর্মী ও চিকিৎসক। হজে অংশ নেয়া সবার বয়সই ২০ থেকে ৫০-এর মধ্যে। এবার কোন হাজীকে কাবা শরিফ স্পর্শ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। পাঁচ ফুট দুরে থেকে তাওয়াফ, নামাজে অংশগ্রহণ, সাঈসহ হজের সব কার্যক্রম পালন করা হচ্ছে।

গতকাল আরাফাতের ময়দানে খুতবার পর একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। হাজীরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফায় গিয়ে একসঙ্গে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। রাতে সেখানে অবস্থান করেন খোলা মাঠে। শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করেন সেখান থেকে। এবার জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা পাথর সরবরাহ করা হয় হাজীদের। আজ (১০ জিলহজ) ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসবেন হাজীরা। মিনায় এসে বড় জামারাকে কঙ্কর নিক্ষেপ, কোরবানি ও মাথা মু-ন বা চুল ছেঁটে স্বাভাবিক পোশাকে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন। তাওয়াফ, সাই শেষে মিনায় ফিরে গিয়ে ১২ জিলহজ অবস্থান ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। জামারাতে পাথর নিক্ষেপ ও পশু কোরবানির পর পুরুষরা মাথা মু-ন করে ইহরাম ত্যাগ করবেন। এরপর পবিত্র কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফ করে হজের পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন হাজীরা।

আরাফাতের ময়দানে কার্যক্রমকেই হজের মূল অনুষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়। ইসলামী রীতি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নবম দিনটি আরাফাত ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হল হজ। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি পিতা আদম ও আদি মাতা হাওয়া পৃথিবীতে পুনর্মিলনের পর এই আরাফাতের ময়দানে এসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। ১৪ শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে এখানেই ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) দিয়েছিলেন তাঁর বিদায় হজের ভাষণ। এ ময়দানেই ইসলামের পরিপূর্ণতার ঘোষণা দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল। এই আরাফাতে উপস্থিত না হলে হজের আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণাঙ্গ হয় না।