• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

দালালদের সহযোগিতায়

বিদেশে পাড়ি দিতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে

ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে

সংবাদ :
  • শহিদুল ইসলাম (উখিয়া), জসিম সিদ্দিকী কক্সবাজার

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে ত্রিশটি। এখানে আশ্রয় নিয়েছে এগার লাখের অধিক রোহিঙ্গা। মায়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আসা রোহিঙ্গারা ধনী হওয়ার আশায় পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। প্রতিদিন ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। স্থানীয় দালাল চক্রের সহযোগিতায় মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের একাধিক পয়েন্টে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির চেকপোস্ট রয়েছে। এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গা আটকের খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়রা বলেছেন, যেখানে চেকপোস্ট পার হতে হলে জাতীয় পরিচয় দেখাতে হয়। নানান ধরনের ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। তারা আরও বলেন, এত রোহিঙ্গা কিভাবে চেকপোস্ট অতিক্রম করতে পারে। উখিয়ার ফলিয়াপাড়া সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভোরে রোহিঙ্গারা কাজের সন্ধানে বের হন। এছাড়া কতিপয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের টাকার বিনিময়ে অবাধে যেতে পারে। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার দাবি এখানকার সচেতন মহলের। অল্প টাকায় বিদেশে যাওয়ার আশায় ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসছে। উখিয়া পুলিশের হাতে আটককৃত একাধিক রোহিঙ্গা বলেন, হাতে কোন কাজ নেই। অল্প টাকায় বিদেশে যাওয়ার আশায় ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা ওজি উল্লাহ বলেন, তারা বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকতেন। প্রচন্ড গরমে ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে পলিথিনের ছাউনিতে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কোথাও ভাড়া বাসা নিয়ে আপাতত থাকার জন্য কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছি।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাবেকুন নাহার বলেন, শহরে কাজ দেবেন বলে আমাকে নিয়ে গিয়ে ছিল। এরপর কোথায় নিয়ে গিয়েছিল আমি জানি না। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৭১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। আটককৃত রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের আটক করতে পারলে ও দালালরা সব সময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ঢাকার খিলক্ষেত থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২৩ রোহিঙ্গাকে আটক করেন। ঢাকার খিলক্ষেত থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাজধানীতে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে তারা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল। উখিয়ার সীমান্তবর্তী পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা এখন প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন। চলাচলে কোন বাধা নেই। রোহিঙ্গারা এখন কক্সবাজার জেলা জুড়ে অবাধ বিচরণ। যা উদ্বেগজনক।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজার শহরে দরিয়ানগর, কক্সবাজার টেকনাফ মহাসড়কের মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্ট এবং টেকনাফ বাহারছড়া এলাকা থেকে পৃথক অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু উদ্ধার করেছে পুলিশ বিজিবি। ১৪ মে দুপুর, বিকেল এবং রাতে অভিযান চালিয়ে এসব রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করা হয়। বিজিবি ও পুলিশ জানিয়েছে, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এসব রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে যাচ্ছিল। এক শ্রেণীর দালাল সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য এসব রোহিঙ্গাকে ক্যাম্প থেকে কৌশলে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশে কক্সবাজার শহরতলীর শুকনাছড়ি ও দরিয়ানগর সমুদ্র ঘাটে রাতের আঁধারে জড়ো করা ২৮ নারী-পুরুষ ও শিশুকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় শুকনাছড়ি ও দরিয়ানগর এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। উদ্ধারকৃত মালয়েশিয়াগামীদের মধ্যে ১৩ জন নারী, ৯ জন পুরুষ ও ৬টি শিশু রয়েছে। এ সময় পাচারকাজে জড়িত একটি নৌকাও জব্দ করা হয়।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়, মালয়েশিয়ায় মানব পাচারকারী একটি চক্র মঙ্গলবার রাতের আঁধারে দরিয়ানগর ও শুকনাছড়ি ঘাটে জড়ো করে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু। বিষয়টি টের পেয়ে এলাকার শতাধিক মানুষ রাত সাড়ে ৯টার দিকে জড়ো হয়ে সমুদ্র সৈকত ও সৈকতে মানব পাচারকারীদের একটি বাড়ি ঘেরাও করে মোট ২৮ জনকে আটকে রাখে। পরে পুলিশে খবর দেয়া হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ২৮ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। আটক মালয়েশিয়াগামীদের মধ্যে ১৩ জন নারী, ৯ জন পুরুষ ও ৬টি শিশু।

স্থানীয় যুবনেতা ইমাম হোসেন ও পারভেজ জানান, মালয়েশিয়ায় আদম পাচারকারী একটি চক্রের সদস্যরা দরিয়ানগর ও শুকনাছড়ি ঘাটকে আবার মানব পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার শুরু করার খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতে এলাকাবাসী জড়ো হয়ে একটি বাড়িতে ২৪ জন ও সমুদ্র সৈকত থেকে বাকি চারজনকে আটকে রাখে। এ সময় রাতের আঁধারে আরও কিছু মালয়েশিয়াগামীসহ মানবপাচারকারী দালাল সটকে পড়ে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি ফরিদউদ্দিন খন্দকার জানান, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত সবাই রোহিঙ্গা বলে স্বীকার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সময় পাচারকাজে জড়িত একটি নৌকাও জব্দ করা হয় বলে জানান তিনি।