• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

বাঙালি সংস্কৃতির অভিযাত্রায় সন্‌জীদা খাতুন

সংবাদ :
  • আবুল হাসনাত

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯

image

ষাটের দশকে স্বরূপচেতনা ও বাঙালিত্বের সাধনা যখন নবীন মাত্রা অর্জন করেছিল এদেশে, সে-সময়ে তার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে আমার।

আইয়ুববিরোধী প্রমত্ত এক ছাত্র-আন্দোলন তখন চলছে। ওই আন্দোলন এই অঞ্চলের বাঙালির চেতনা, বোধ ও বুদ্ধির জগৎকে করে তুলছিল সংস্কৃতিলগ্ন, ঐতিহ্যাশ্রয়ী, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মপ্রত্যয়ী ও নানা জিজ্ঞাসায় আলোড়িত। নবীন এক আবেগ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাবাদর্শের বিপরীতে এক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে তখন। বিশেষত ঢাকার ছাত্রসমাজ ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যে ছাত্র-আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তা বহুমুখী তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছে সেকালের সমাজজীবনে। সৃষ্টি করেছে

গণআন্দোলনের এক নতুন ধারা। এই গণআন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল শিল্প ও সাহিত্যের অঙ্গনেও। আমরা যারা দূর-বিস্তৃত এ আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ করেছি, কিছুটা চাঞ্চল্যে, কিছুটা সত্যানুসন্ধানের চেতনায় তাদের কাছে এ আন্দোলন প্রাথমিকভাবে ছিল হৃত গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠারই সংগ্রাম; একনায়কের নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনকে হটিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করা এই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনেই বলীয়ান হয়ে দেশকে উজ্জীবিত করেছে ভিন্নতর চেতনায়। যে চেতনা স্বরূপবোধ ও বাঙালিত্বের সাধনাকে তীক্ষè থেকে তীক্ষèতর করে তুলেছিল। এই সংস্কৃতি সাধনা ও চর্চায় সনজীদা খাতুনের অবদান বৃহৎ। আজ তার ৮৭তম জন্মদিন। এই জন্মদিন উদ্যাপন প্রসঙ্গে তার বহুমুখী কর্মধারা এবং আমাদের অনেকের জীবনপ্রবাহে ছাত্র ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সেই দিনগুলো যে বার্তা ও মর্মবাণী বহন করে এনেছিল তা খুব মনে পড়ছে।

এই আন্দোলনে বৃহৎ ভূমিকা রেখেছিল বামপন্থি ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন। মনে পড়ে, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের এক মন্ত্রী মনজুর কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরে এলে এক সাহসী ছাত্র তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছিলেন। গণতন্ত্রহীনতা এবং পূর্ব বাংলাকে শোষণ ও বঞ্চনা করে ইসলামাবাদকে স্বর্গ তৈরি করা হচ্ছে- এ ধরনের প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান- এই দুই অঞ্চলের মধ্যে দুস্তর বৈষম্য কেন- এ ধরনের প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়েছিল সেদিন পুরাতন কলাভবনে। সমবেত ছাত্ররা আইয়ুববিরোধী ধ্বনিও দিয়েছিল। সামরিক শাসনকালে এ ছিল বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের পক্ষে ভিন্ন ধরনের এক প্রতিবাদ। এই সময় থেকে ছাত্র-আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনও এই আন্দোলন ঘিরে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে; যদিও ধরপাকড় অব্যাহত ধারায় ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়ে জেল ভরে যায়। তখন রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে গড়ে উঠল ছায়ানট। যে ছায়ানট শুধু রবীন্দ্রসংগীতের চর্চার অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত হয়নি; বাঙালি সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশ ও উন্নয়নকে লক্ষ্যে রেখে সংস্কৃতিচর্চায় এক মাত্রা যোগ করেছিল। নবীন মধ্যবিত্ত ও উঠতি যুবকরা এই সময়ে ছায়ানটের কর্মপ্রয়াসে সঞ্জীবিত হয়েছিল প্রবলভাবে। মঞ্চ পরিকল্পনা, নিমন্ত্রণপত্র, শিল্পীদের পোশাক ও সংগীত পরিবেশনায় নতুন এক বিন্যাস নিয়ে এলো ছায়ানট। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রযত্নে প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ছাত্রসমাজ এই আলোকিত সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত বোধ করেছে। বামপন্থি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও সহযোগী সংস্কৃতি সংসদ সামরিক শাসনের মধ্যেও সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহ চালিয়েছিল। কতভাবেই না সনজীদা খাতুন তখন সহায়তা করেছেন এই প্রয়াসে। ষাটের দশকে বামপন্থি আন্দোলনে আস্থাশীল ছাত্রসমাজের বৃহৎ একটি অংশ যখন বাঙালিত্বের সাধনা ও জীবনচর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, সন্জীদা খাতুনের আজিমপুরের ফ্ল্যাটটি সেই সময়ে হয়ে উঠেছিল নবীনদের আরেক জাগরণের কেন্দ্র; অন্যদিকে আরেক আশ্রয়। এই বাড়িকে ঘিরেই বন্যাত্রাণের অনুষ্ঠানের মহলা, নিত্যনব কর্মসূচি নিয়ে ভাববিনিময়ের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোচনা চলত এবং দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীদের মিলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই ফ্ল্যাট। কায়রো বিমান দুর্ঘটনায় নিহত তৎকালের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ আহমদুর রহমানের সঙ্গে এই ফ্ল্যাটেই বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল।

সন্জীদা খাতুন সংস্কৃতি সংসদের একটি নৃত্যনাট্য পরিবেশনায় উইংসের ফাঁকে বসে মুখে রুমাল দিয়ে কিছুটা চাপাস্বরে রবীন্দ্রনাথের একটি গান গেয়েছিলেন। তিনি তখন সরকারি চাকরি করেন। কোন গোয়েন্দা এবং সরকারি কোন ব্যক্তি যাতে বুঝতে না পারে সন্জীদা খাতুন গান গাইছেন, সেজন্য তিনি মুখে রুমাল দিয়ে তার কণ্ঠ-লাবণ্যকে একটু চাপা দিয়ে ভিন্নরূপ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে এই যে নবীনদের সাংস্কৃতিক উদ্যোগে তিনি বিপদ জেনেও সহায়তা করেছিলেন এ মুক্তিযুদ্ধ সময়কাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আজিমপুরের তার ফ্ল্যাটেই মহড়া হয়েছে গানের। গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়িয়ে দু-একজন ছাত্রনেতা দিনের পর দিন থেকেছেন তার সেই অপরিসর ফ্ল্যাটে। কত নবীন ছাত্রছাত্রীকে তিনি গান শিখিয়েছেন তার কোন হিসাব নেই। আজিমপুরের ফ্ল্যাটটি হয়ে উঠেছিল নবীন সংস্কৃতিকর্মীদের এক নির্ভরতার কেন্দ্র। সেইসঙ্গে অনেককে দীক্ষিত করেছেন রুচি নির্মাণে। জীবনদৃষ্টি গড়ে তুলবার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়ে নবীন বোধ সঞ্চার করেছেন তিনি অব্যাহত ধারায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শিক ধারার বিরুদ্ধে এ ছিল বৃহত্তর এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নানা দোলাচলে যখন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর মানসভুবন দ্বিধান্বিত ছিল, ছায়ানট এবং সন্জীদা খাতুনদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের বহুধারার সাংস্কৃতিক যুদ্ধ রাজনৈতিক সংগ্রামকেও বলীয়ান করেছিল। বাঙালির সংস্কৃতির সাধনা ও চর্চা নবীন অভিমুখ খুঁজে পেয়েছিল। নবীনরা দীপিত হয়েছে তার এই বহুমুখী কর্মে।

ছায়ানট জন্মলগ্ন থেকে সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, সন্জীদা খাতুন হয়ে ওঠেন এই অভিযাত্রায় অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। কেবল সংগীত নয়, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের বহুমাত্রিক সাধনায় সমৃদ্ধ হয়েছে তার জীবনচর্যা। এই জীবনচর্যা ও তার সংস্কৃতিবোধে বহু নবীন নিজেদের জীবনকেও করে তুলেছে সমৃদ্ধ।

সন্জীদা খাতুনের সৃষ্টিশীলতা, অঙ্গীকারকে উপলব্ধি করতে হলে তার ব্যক্তিস্বরূপের বহুমুখী কর্মধারা জানা খুবই জরুরি। আত্মভোলা বিজ্ঞানসাধক সংখ্যাতাত্ত্বিক, উদারমনা, মুক্তচিন্তক পিতা ড. কাজী মোতাহার হোসেনের স্নেহছায়া ও মায়ের কড়া শাসন ও শৃঙ্খলায় তার ব্যক্তিস্বরূপ বিকশিত হয়েছে।

এই সেই মোতাহার হোসেন, যিনি শিখা গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন এবং যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সমাজে জ্ঞানচর্চার প্রসার ও যুক্তিবাদিতার মধ্য দিয়ে বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তিদান। কৈশোরকালেই সন্জীদা খাতুনের সাহিত্যে অনুরাগ জন্মে এবং পিতার এই যুক্তিবাদিতা তাকে প্রবলভাবে স্পন্দিত করে এবং সংগীত ও সাহিত্যরুচি গড়ে ওঠে। তার বহুমুখী কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সাহিত্যের সৃজন-সাধনারও এক যোগ আছে। কিশোর বয়সে মুকুল ফৌজের সদস্য হয়ে দেশপ্রেমের দীক্ষা নিয়েছেন তিনি, শিল্পী কামরুল হাসানের প্রযতেœ মুকুল ফৌজে আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু ছাত্র হিসেবে গবেষণা শুরু করেছেন পঞ্চাশের দশকেই; অধ্যয়ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতনে। অধ্যয়নকালে রবীন্দ্রনন্দন-বিশ্বে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্র-সংস্কৃতিতে অবগাহন তার জীবন ও ব্যক্তিস্বরূপকে করে তুলেছিল গভীর ও গহন। কৈশোরকালের পারিবারিক পরিবেশ ও দীক্ষাগ্রহণ নানা অভিজ্ঞতা ও জীবনদৃষ্টির পালাবদলে আরো গভীর হয়ে উঠল তার জীবন ও মননে। পরবর্তীকালে যখন সাহিত্যসাধনায় ব্রতী হলেন, বিষয়ের গভীরতা কখনো তার রচনাশৈলীকে দুরূহ ও দুর্বোধ্য করেনি। সেজন্য তার গদ্য সহজ-স্বচ্ছন্দ। রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় বিষয় হলেও বহু রচনায় ছড়িয়ে আছে একুশ, মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতির সংকট প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও রবীন্দ্রসাহিত্যের নিবিড় পাঠ তাকে করে তুলেছে অন্যতম শীর্ষ রবীন্দ্র গবেষকরূপে। কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণেও তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। সান্নিধ্যে এসেছেন বহু গুণী ও প-িতজনের। পরিগ্রহণ করেছেন সাহিত্য থেকে; জীবন ও মননে যুক্ত করেছেন সাহিত্যের নান্দনিক বোধ ও সৌন্দর্যচেতনা।

এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়ের একটি মন্তব্য খুবই প্রণিধানযোগ্য বলে মনে হয়।

তিনি বলেছেন, সন্জীদা খাতুনই দুই বাংলার সেই বিরলতম গায়িকা, ‘যিনি গান না গাইলেও শুধু মননচর্চার সুবাদেই মান্য হয়ে থাকতেন।’

সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রগাঢ় দ্যুতির প্রভায়, কখনো জিজ্ঞাসায় আমাদের ভাবনা, মনন ও বিদ্যাচর্চার ভুবনকে বাঙালির আত্মপরিচয়বোধ ও উপলব্ধির আলোকে সমৃদ্ধ করেছেন। স্বকাল ও বৈশ্বিক সংকটকে উপলব্ধি করে এক দায়বদ্ধ মানুষ হিসেবেই নিজেকে প্রস্তুত করছেন। সেজন্য ষাটের দশকে যখন আঁধার নেমে এসেছিল বাঙালি সমাজে, তখন তাকে কতভাবেই না সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ করতে হয়েছে। গান দিয়ে এক সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়েছেন। বহু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংগীতে উজ্জীবন এবং সাংস্কৃতিক জাগরণও যে অনেক সময় এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গী হয়ে ওঠে তার জীবনসাধনা যেন তারই প্রমাণ বহন করে। যেকোন জাতীয় দুর্যোগকালে এবং মানুষের মাঝে ত্রাণকর্মে সম্মুখ সারিতেই থেকেছেন সর্বদা। এই মানবিক গুণাবলি তাকে এক অনন্য মানুষ করে তুলেছে। ষাটের দশকে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত দুর্গত মানুষজনকে ত্রাণ দেয়ার জন্য পথে পথে সম্মিলিতভাবে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং এই বয়সেও শীতে কাতর মানুষজনকে সহায়তার জন্য সর্বদা তিনি প্রণোদিত করেন ছায়ানটের নবীন কর্মীদের। এই মানবিক গুণাবলির জন্য তাকে মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক।

ষাটের দশকের অন্তিম বছরে তার সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার, বাঙালিত্বের স্বরূপচেতনার আন্দোলনের জন্য কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খান তাকে শাস্তি দেবার জন্য বদলি করেছিল রংপুরে।

একাত্তরের সেই দিনগুলোতেও ধৈর্যময় দৃঢ়তায় জেগে ওঠার কথা বলেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সংগীতশিল্পীদের একত্র করে দল বেঁধে গান গেয়ে ওঠেন তিনি- মুক্তির গান, মানবতার গান, স্বাধীনতার গান। যে গান, যে সুরতরঙ্গ শরণার্থী শিবির, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আর রণাঙ্গনে এক মুক্তির ও আশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

তিনি দেশের শীর্ষ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী এবং সংগীতশিক্ষক, অগণিত ছাত্র-ছাত্রী রবীন্দ্রনাথের গানের বাণী ও সুর নিয়ে এখনো তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। রবীন্দ্র স্বরলিপি অনুসরণ ও অনুধাবন এবং মূলানুগ শিক্ষায় তিনি তাদের অনুপ্রেরণা দেন। কখনো হারমোনিয়ম নিয়ে সঠিক সুরটি বারবার গেয়েও শোনান। এই ধৈর্যময় শিক্ষকগুণ খুবই বিরল।

রবীন্দ্রনাথের গান ও গানের মর্মকে দেশে প্রসারিত করবার যে ব্রত তিনি পঞ্চাশের দশকে গ্রহণ করেছিলেন, আজো তা অব্যাহত রয়েছে। তারই প্রণোদনা ও কর্মে সঞ্জীবিত হয়ে সমগ্র দেশে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ যে সংস্কৃতিচেতনা ও রবীন্দ্রচর্চাকে প্রসারিত করছে, তার মূল্যও অসীম। বর্তমানে এই সংগঠনটি সমগ্র বিরূপতাকে অগ্রাহ্য করে দেশব্যাপী সংস্কৃতিচেতনাকে, ভাবনাকে ও চর্চাকে খরপ্রবাহিনী করে তুলছে। সম্প্রতি নীলফামারীতে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সপ্তত্রিংশ অধিবেশনে সমগ্র দেশের প্রতিনিধির দেশের সংস্কৃতিচর্চাকে আরো প্রত্যয়ী ও অঙ্গীকারবদ্ধ করার এবং একটি মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার যে কথা বলেছেন এবং একটি উদার অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের যে-কথা উচ্চারিত হয়েছে সম্মেলনে, তাতে তিনিই প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। তিনি এই বয়সেও, এখনো বাংলা উচ্চারণ বিষয়ে দীক্ষা দিয়ে থাকেন অগণিত শিক্ষার্থীকে এবং সাম্প্রদায়িক ও ভেদবুদ্ধি যে কতভাবে মানবিক বোধ বিকাশের অন্তরায় সৃষ্টি করছে এ তার মতো করে দৃঢ়কণ্ঠে আর কাউকে উচ্চারণ করতে দেখা যায় না। বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তরুণদের বিদ্যা, বোধ ও বুদ্ধিকে করে চলেছেন প্রসারিত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় যে নৈরাজ্য চলছে তাকে শেকড়সন্ধানী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক করার জন্য তার অদম্য প্রয়াস এখন অব্যাহত আছে। সেজন্যই নালন্দা ইস্কুলের বিদ্যাচর্চায় মানবিক হওয়ার ও শেকড়সন্ধানী হওয়ার ব্রতই মুখ্য হয়ে ওঠে। বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর জীবনদৃষ্টি গড়ে দিচ্ছেন মানবিক শিক্ষার আলো তাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে, এখনো কোনো অপরাহ্ণ কিংবা সন্ধ্যায় তিনি কত না অনায়াস দক্ষতায় গান শেখান ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে অগ্রসর কণ্ঠশিল্পীদের।

আমরা যারা যুক্ত হয়েছি তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মে, আমরা যারা নিত্য তার স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে প্রত্যক্ষ করি ছায়ানটে এবং প্রতিনিয়ত এক দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করতে শুনি ছায়ানট তার যথার্থ আদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকবে, তার সকল কৃতী কৃতিত্ব ও প্রাণদায়ী অভিজ্ঞতাকে মনে করি তার সমগ্র জীবনসংগ্রাম ও জীবনবোধের এক প্রত্যয়।