• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১

বরিশালে ২৭৪টি ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে পাঠদান

সংবাদ :
  • জেলা বার্তা পরিবেশক, বরিশাল

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল ২০১৯

উত্তাল মেঘনাবেষ্টিত উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জে মেঘনা শাখা-প্রশাখা উপজেলার ইউনিয়নগুলোকে একটির সঙ্গে অন্যটির বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নদীর তীরে। নদী ভাঙনে স্থাপনা বিলীন হলে স্থানান্তরিত জায়গায় নতুন করে অস্থায়ী ভবন নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হয়। যার বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এরকমই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মেহেন্দিগঞ্জের মধ্য চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ঝুঁকির কথা বলতে গিয়ে বলেন, প্রধান শিক্ষক মেহবুল হককে বলেছি এ ভবনে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে। কিন্তু তিনি এখনও সেখানেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, মধ্য চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ২১৭ জন। একটি আধাপাকা অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান করানো হচ্ছে শিশুদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেহেন্দিগঞ্জের এ প্রতিষ্ঠানটির মতোই গোটা জেলায় ২৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে। যার বেশিরভাগ পাকা ভবনের পলেস্তর খসে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় হলে টিনশেড স্কুল ভবনের চাল উড়ে যায়। আবার ভাঙনকবলিত নদীর তীরে বিদ্যালয় ভবন। অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনায় এসব বিদ্যালয়েরও ঘটতে পারে বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোটবগী পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ট্র্যাজেডি। তবে জেলায় কতগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তার সঠিক তথ্য নেই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দফতরে।

গতকাল তথ্য জানতে গেলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দফতরে এ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা এক কর্মচারী জানান, তাদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কোন তথ্য নেই। মন্ত্রণালয় থেকেও একই তথ্য জানতে চেয়ে একটি চিঠি তারা পেয়েছেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোতে জেলা অফিস থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মেহেন্দিগঞ্জের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, তার উপজেলার ৫৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। যার বেশিরভাগ নদীভাঙন কবলিত। ঝড় হলেই জাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনের চালা উড়ে যায়। গৌরনদী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ফয়সাল খান জানান, কাশেমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূর্ব হোসনাবাদ নবারুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এক মাস আগে সেখানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই উপজেলাতে ৪০টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান শিক্ষা কর্মকর্তা। মেঘনা তীরের আরেক উপজেলা হিজলা। এখানকার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, তার উপজেলাতে ১২টি প্রতিষ্ঠানের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। উত্তর নরসিংহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাউলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলছে। উজিরপুরের বানকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্রুত সংস্কার না হলে পাঠদান বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। এ কর্মকর্তার মতে, উপজেলার ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। মুলাদীর ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অতিঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফ খান। বরিশাল সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম তালুকদারের জানান, এ উপজেলায় ৪৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন আছে বাবুগঞ্জে ৯টি, বানারীপাড়ায় ৫টি, আগৈলঝাড়ায় ২৩টি ও বাকেরগঞ্জে ৫০টি। সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আ. লতিফ মজুমদার বলেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলো উপজেলা প্রকৌশলীর সহায়তায় চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) সাবের হোসেন চৌধুরী মঙ্গলবার বরিশাল সফরে এসে একই নির্দেশনা দিয়েছেন। জেলা কর্মকর্তা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান বন্ধ করে দেয়া হবে। নদীভাঙন কবলিত বিদ্যালয় ভবনের ক্ষেত্রে বিশেষ নোট দেয়া হবে যাতে এ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

বদরগঞ্জ ও জামালপুরে ঝুঁকিপূর্ণ দুটি বিদ্যালয়ে চলছে পাঠদান

অন্যদিকে বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ওসমানপুর ও জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল। এছাড়া ছাদের পলেস্তরা অবিরত খসে পড়ায় আতঙ্কে রয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা অফিস বলছে- দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ওইসব ভবনের সংস্কার না হওয়ায় শিক্ষা অফিসের ওই কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছেন না শিক্ষকরা।

জানা যায়, ওসমানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৬৮সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বিদ্যালয়ে পৃথক দুটি ভবন রয়েছে। চারকক্ষ বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মিত হয় ১৯৬৮ সালে এবং দু’কক্ষ বিশিষ্ট আরেকটি ভবন নির্মিত হয় ২০০৬সালে। বর্তমানে সেখানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০০জন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পুরনো ভবনটির সংস্কার না হওয়ায় ভবনে ধরেছে ফাটল এবং কক্ষগুলোর ছাদের অধিকাংশ জায়গায় পলেস্তরা খসে রড বের হয়েছে। আর সেই ভবনেই চলছে পাঠদান ও দাফতরিক কাজকর্ম। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মিতু বানু ও জিনিয়া আক্তার জানায়- ক্লাস করার সময় ছাদ খসে পড়ে বলে আমরা সবসময় ভয়ে থাকি। বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক নাসিরুজ্জামান বলেন, ক্লাসে গিয়ে পাঠদান করাতো দূরের কথা, ভয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থভকি কখন কি হয়। আবার অফিসে বসেও ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ভারতী রানী বলেন, কয়েকদিন আগে শিশু শ্রেণির ক্লাসে ছাদের পলেস্তেরা খসে পড়ায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় দু’ শিশুশিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে দুু’ শিফটে পাঠদান করা হয়। চারটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয় ২০০৬সালে নির্মিত ভবনে। আর পুরোনো ভবনে শিশু শ্রেণি ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। এই পুরনো ভবনেই শিক্ষকরাও ঝুঁকি নিয়ে দাপ্তরিক কাজ করেন।

একই দৃশ্য দেখা গেছে জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৩৪সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৪সালে চার কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবন ও ২০০৬সালে দু’কক্ষ বিশিষ্ট আরেকটি ভবন নির্মিত হয়। বর্তমানে সেখানে ১৮৩জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু ১৯৯৪সালে নির্মিত ভবনটির চারদিকে দেখা দিয়েছে ফাটল। এছাড়া কক্ষের ছাদ থেকে অবিরত পলেস্তেরা খসে পড়ছে। একারণে ছাদের কোথাও কোথাও আবার রডও বের হয়েছে। তবুও সেসব কক্ষে ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করছেন শিক্ষকরা। আর শিশু শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি নিয়ে পাঠ গ্রহণ করছে। একই অবস্থা হয়েছে আরেকটি কক্ষে। যেখানে শিক্ষকরা ঝুঁকি নিয়ে দাপ্তরিক কাজ সারছেন। বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক লায়লা আরজুমান বলেন, প্রতিনিয়ত ছাদ থেকে পলেস্তেরা খসে পড়ছে। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সময় প্রার্থণা করি বদরগঞ্জে যেন বরগুনা ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, যেকোনো মুহুর্তে ভবনটি ধ্বসে পড়তে পারে। একারণে একাধিকবার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।

এবিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শায়লা জিয়াছমিন সাঈদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মাত্র ক’দিন আগে আমি বদরগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেছি। তাই ওই দু’ বিদ্যালয়ের কি কি সমস্যা আছে তা’ আমার জানা নেই। তবে কথা দিচ্ছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে খোঁজ নিয়ে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।