• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

বইমেলায় মানবতার সেবা

সংবাদ :
  • সাংস্কৃতিক বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

image

‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ কবি কামিনী রায়ের মানবতার এ ডাক যেন প্রাণের একুশে গ্রন্থমেলাতে বাস্তব রূপ পেয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মেলায় এ ডাকে শামিল হয়েছে আর্ত মানবতার সেবায় নিজেদের সঁপে দেয়া কিছু মহৎ হৃদয়ের মানুষ। কেউ চলতে অক্ষম মানুষদের হুইল চেয়ারে করে ঘুরে দেখাচ্ছেন পুরো মেলা, আবার কেউ স্বেচ্ছায় মানুষকে রক্ত দিতে উৎসাহিত করছেন অন্যদের। যে রক্ত দিয়ে বাঁচানো হবে দেশের অসহায় গরিব মানুষের জীবন। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার কাজ করছে অন্ধদের আলোর পথ দেখাতে বা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য। মানবতার সংগ্রামে নিয়োজিত এসব মানুষের নেই কোন পারিশ্রমিক। বরং নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে অন্যের জীবন বাঁচাতে পারাই যেন একমাত্র তৃপ্তি।

টিএসসির মোড় দিয়ে মেলায় ঢুকতেই প্রতিদিনই চোখে পড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পড়ুয়া কিছু ছাত্রছাত্রীকে। যারা হুইল চেয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোন প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ বা হাঁটতে অক্ষম ব্যক্তি মেলায় আসলেই তাদের দিকে ছুটে যান এসব তরুণ-তরুণী। পুরো মেলা ঘুরে দেখান কোন ধরনের আর্থিক বা অন্য কোন ধরনের সহায়তা বা বিনিময় ছাড়াই। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধুমাত্র মানুষের সেবা করার মানসিকতা থেকে তারা স্বেচ্ছায় এ কাজে এসেছেন। আর এ কাজে তাদের সহায়তা করছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং সিএসএফ নামের একটি সংগঠন। সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন সারা বছরই এ কাজ করে থাকে। তবে বইমেলা উপলক্ষে এ কাজে বাংলা একাডেমির সহায়তা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এবার বইমেলা উপলক্ষে ১৫টি হুইল চেয়ার কাজ করছে। প্রতিদিনই প্রায় দশ থেকে পনেরো জন হুইল চেয়ার সেবা নিয়ে মেলায় ঘুরছেন।

এবারের মেলায় হুইল চেয়ার সেবা প্রদানের কাজে প্রধান সমন্বয়কের কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা যারা কাজ করছি তারা সবাই স্বেচ্ছায় এসেছি। অসহায় মানুষের জন্য কাজ করতে ভালো লাগা থেকেই আসা। আমরা মনে করি চলতে অক্ষম মানুষদেরও অধিকার আছে সর্বত্র যাওয়ার। আর এ কাজে আমরা যারা সুস্থ তাদের একটু সহায়তা তাদের জীবনটাকেও সুন্দর করে তুলতে পারে।’

বইমেলার টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দিয়ে মেলায় প্রবেশের একটি গেট রয়েছে। এ গেট দিয়ে প্রবেশ করেই চোখে পড়ে স্বেচ্ছায় রক্ত দাতাদের কিছু কার্যক্রম। এখানে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রক্তদানের কর্মসূচি। এছাড়া মেলা থেকে বের হওয়ার গেটে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ ব্লড ব্যাংকের একটি কর্মসূচি। এসব ব্লাড ব্যাংকের সবগুলো মিলে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়েছে।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক শেখ মো. ফয়সাল তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, ‘এটি একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ। যারা রক্ত দেন তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় মানবতার সেবায় দিয়ে থাকেন। তবে আমাদের দেশের অনেক লোকের মধ্যে রক্ত দেয়ার বিষয়ে যথাযথ সচেতনতা নেই। এ জন্য আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি।’

রক্ত দানের পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ পরীক্ষাও করছে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের স্টলে সব চেয়ে বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেছে। এখানকার দায়িত্বরত একজন ডাক্তার নাদিয়া শারমিন বলেন, ‘এটা একটি স্বেচ্ছা কার্যক্রম। আমাদের এখানে যারা আসে আমরা তাদের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার পাশাপাশি রক্ত দানের উপকারিতা সম্পর্কেও স্বচেতন করি।’

মেলা থেকে বের হওয়ার পথে পুলিশের ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে জানা যায় শুধুমাত্র এখানেই এ পর্যন্ত ছয়শ’ এর বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত প্রদান করেছেন। পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের ইনচার্জ এসআই এ কে এম সিদ্দিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। অনেকেই এখন স্বেচ্ছায় রক্ত দিচ্ছেন। আগে এতটা সচেতন ছিলো না। ভবিষ্যতে এ সচেতনতা আরও বাড়বে। বলে আশা করা যায়। আমাদের ব্লাডের পুরোটাই সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়।’

মেলার বাংলা একাডেমি থেকে বের হতেই চোখে পড়ে অন্ধদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠান স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার একটি স্টল। এখানে অন্ধদের জন্যও যে বই আছে এবং তারাও যে সাধারণ মানুষের মতো পড়তে পারে সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছেন কিছু মানুষ। এদেরই একজন সাজেদা সুলতানা মিম। তিনি তার পাশে বসা একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তৃষ্ণাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এমন অনেকেই আমাদের সমাজে আছে। যারা উপযুক্ত সহায়তা পেলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে উঠে আসার যোগ্যতা রাখে। আমাদের সবারই উচিত তাদের সহায়তায় কাজ করা।’

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বাধীন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনে একটি স্টল রয়েছে। যারা মূলত কোন বই বিক্রি করে না। বরং মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছে তারা। নিসচা এর দফতর সম্পাদক ফিরোজ আলম মিলন বলেন, ‘আমরা বই বিক্রি করতে আসিনি। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা। মেলায় যেহেতু মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। সেহেতু আমরা এখানে এসেছি সাধারণ মানুষের নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা এবং এ লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে।’

লেখক বলছি কর্নার : প্রথমবারের মতো এ বছর ভালো মানের ৫ জন লেখককে ২০ মিনিট করে নিজের বই নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেক পাড়ে ‘লেখক বলছি’ কর্নারের এ আয়োজনে গতকাল নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন হোসেন উদ্দীন হোসেন, হাবিব আনিসুর রহমান, ড. তাশরিক-ই-হাবিব, মশিউল আলম এবং শিহাব শাহরিয়ার।

মোড়ক উন্মোচন : গত বছরের মতো এবারও মেলায় রয়েছে মোড়ক উন্মোচন কর্নার। প্রতিদিনই অনেক বই আসলেও মোড়ক উন্মোচন করান গুঁটি কয়েক লেখক। তবে যারা এ কর্নারে এসে মোড়ক উন্মোচন করাচ্ছেন তাদের বক্তব্য শুনে অনেক পাঠক আগ্রহী হচ্ছেন সে সব বই কিনতে। আর এ কারণে মোড়ক উন্মোচনের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। গতকাল ৯টিসহ এখন পর্যন্ত মোট ১৬০টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

মূল মঞ্চের আয়োজন : গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অনুপম হায়াৎ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আমানুল হক, লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং শিবলী মহম্মদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কামাল লোহানী।

কামাল লোহানী বলেন, বুলবুল চৌধুরী নৃত্যের পাশাপাশি প্রাচী নামের উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্যে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। তার নৃত্য কেবল প্রায়োগিক শিল্পকলা নয়, একইসঙ্গে সমস্ত অসুন্দর এবং কলুষতার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদের নাম।

এছাড়াও কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন গোলাম কিবরিয়া পিনু এবং চঞ্চল আশরাফ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন গোলাম সারোয়ার এবং মু. আহসান উল্লাহ ইমাম খান তমাল। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী চন্দনা মজুমদার, শফিমন্ডল, সেলিম চৌধুরী, পাগলা বাবুল, রুশিয়া খানম এবং কোহিনুর আকতার গোলাপী।

আজকের আয়োজন : অমর একুশে গ্রন্থমেলার আজ ১২তম দিন। মেলা শুরু হবে বেলা ৩টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে কবি-অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন হাসান হাফিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শফিউল আলম, রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং মোহাম্মদ আবদুল হাই। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।