• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমজান ১৪৩৯

‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮’

ফাল্গুনের রঙের বর্ণিল আভায় ভিন্নতা পাবে আজ বইমেলা

সংবাদ :
  • হাসনাত শাহীন

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

একুশের স্মৃতিবিজড়িত বাঙালির প্রাণের আবেগ জড়ানো ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ প্রতিবারই বিপুল মানুষের সাংস্কৃতিক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার-চেতনাকে উত্তরোত্তর শাণিত ও সম্মৃদ্ধ করে আসছে। মেলাটি এখন রাজধানী ঢাকা থেকে অন্য শহরে এবং শহর থেকে গ্রামে-গঞ্জে, গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে, এমনকি দেশের বাইরের বাঙালিদের মধ্যেও যেমন বাঙালির চেতনাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনি একটি সংস্কৃতিক ধারাও তৈরি হচ্ছে। অমর একুশের পথ ধরে ৭ মার্চ ও ৭ মার্চের পথ ধরে যেমন মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা এসেছে। ঠিক তেমনই মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে সর্বচ্চো শাস্তির দাবিতে ‘গণজাগরণ’ জেগে ওঠা শাহবাগ এলাকাটি একটি সাংস্কৃতিক এবং বাঙালিদের প্রাণের সঙ্গে মিশে থাকা স্থান। আমাদের প্রাণের স্পন্দন বইমেলা (অমর একুশে গ্রন্থমেলা) এই এলাকাটাকে আরও বেশি সমৃদ্ধি করেছে। বইমেলা উপলক্ষে এই একমাস তো অনেকেই প্রাণের টানে ছুটে আসে। তাছাড়া এই অঞ্চলে সারাবছরই লেগে থাকে কোন না কোন অনুষ্ঠান। এসব নানা কারণেই এই এলাকাটি অনেকটা অঘোষিত সাংস্কৃতিক বলয়ে পরিণত হয়ে গেছে। এই অঘোষিত সাংস্কৃতিক বলয়ে এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে-অমর একুশে গ্রন্থমেলা গতকাল ছিল এই মেলার ১২তম দিন। আজ এই বইমেলার ১৩তম দিন। এবারের এই ১৩তম দিনে শুরু হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ছয়ঋতুর শেষ ঋতু ঋতুর রাজা ‘বসন্ত’। অর্থাৎ ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত; সব বাঙালি আর তরুণ-তরুণীদের প্রাণের ১ ফাল্গুন।

‘বসন্ত’-ভালোবাসা প্রকাশের অন্যন্য এক ঋতু। ক’দিন ধরেই বাতাসে ভাসছিল তার আগমনী বার্তা। বৃক্ষের ধূসর বর্ণহীন পাতা ঝরে পড়ছে। গাছের শাখা ঢেকে যাচ্ছে কচি নতুন পাতায়। আজ শিমুল-পলাশের মাস-শুরু হলো বসন্তের প্রথমদিন। এ মাস যেন সবকিছু নতুন করে, নতুন উদ্যোমে শুরু করার মাস। তার ছোঁয়া শুধু প্রকৃতিতেই নয়; মানুষের পোশাক-আশাকেও দৃশ্যমান। বিগত কয়েক দিন ধরেই মেলায় বাসন্তী রঙের পোশাক আর মাথায় ফুলের টোপর পরে আসছেন তরুণীরা, পুরুষদের বসনেও ছিল ফাগুণের ছোঁয়া। আর, এসব নানা কারণে আজ মেলাপ্রাঙ্গণ বাসন্তী সাজে সেজে উঠবে এটা যেন বলে দিচ্ছেÑগত কয়েকদিনের ধরে বইমেলাকে ঘিরে থাকা বাসন্তী সাজে তরুণ-তরুণীদের চপল উপস্থিতি আরও বাড়বে ; বাড়বে, দখিণা বাতাস গায়ে মেখে প্রকাশনায়-প্রকাশনায় বই কেনার আনন্দ-ধুম।

প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্বেষা’র স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন বলেন, সত্যি কথা বলতে, বইমেলা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব। দিন যতই যায় ততই আমাদের এই প্রাণের উৎসব ‘গ্রন্থমেলা’ জমে ওঠে। বিগত কয়েকদিন ধরেই সেই পরিবেশই বইমেলায় বিরাজ করছে। কিন্তু, কাল (আজ) পহেলা ফাগুন ও ভালোবাসা দিবস (আগামীকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি)-এ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বইমেলায় আসবেন এটাইতো স্বাভাবিক। আমরা আশা করছি এই দুটি দিনের মতো এবারের এ গ্রন্থমেলার প্রতিদিনই বইপ্রেমী মানুষের পদচারণায় মুখর হবে।

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের স্বত্বাধিকারী আদিত্য অন্তর বলেন, পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস-এ দুই দিনে বিক্রি যে খুব একটা তা কিন্ত না। তবে এই যে মানুষ আসছে বইয়ের টানে। ঘুরেফিরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় যদি একটি বইও কেনেন, তাহলেই চোখবুজে মেলাকে সফল বলে দাবি করা যাবে।

এদিকে, রাজধানীর আজ সকাল শুরু হবে চারুকলার বকুলতলায় বসন্ত উৎসবের মধ্য দির্য়ে। সকাল থেকেই সেখানে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি মিলিত হবে নানা বয়সী মানুষ। রঙের আলপনায় ভরে যাবে শাহবাগ থেকে চারুকলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর। সেখান থেকেই সকলে প্রিয়জনের হাত ধরে মেলায় ছুটে আসবেন। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন কত হাজার বই! যে কারণে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় আজ, পহেলা ফাল্গুনে সকল বয়সী বইপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের জন্য গ্রন্থমেলার প্রবেশদ্বার খুলবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা পর্যন্ত। যেমনটি হবে আগামীকাল ভালোবাসা দিবসের দিনেও। এ দুইদিনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন প্রকাশকরা। তারা বলছেন, বসন্তের প্রথম দিন আর ভালোবাসার দিনÑদু’দিনেই প্রচুর পাঠক আসেন মেলায়। বসন্তের বাসন্তী রং আর নতুন বইয়ের বর্ণিলআভায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ; সেটির সঙ্গে বিক্রিও মন্দ হয় না। সব মিলিয়ে ফাগুণের ছোঁয়া লাগার প্রত্যাশায় গতকাল নিজেদের স্টলের ঝাঁপি বন্ধ করেছেন প্রকাশকরা।

প্রকাশকরা জানিয়েছেন, আজ যেমন দর্শনার্থী আসবেন তেমনি আসবেন বইপাগল মানুষও। মেলাকেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি শেষে সবাই নিজের জন্য নিয়ে নেবেন প্রিয় লেখকের পছন্দের বইটি। এ ছাড়া আগামীকাল বুধবার হচ্ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই শুধু নিজের জন্যই নয়, অনেকেই প্রিয় লেখকের বইটি কিনে দেবেন একান্ত প্রিয়জন, প্রিয় বন্ধু কিংবা পরিবারের কোন সদস্যের হাতে।

অপরদিকে, প্রকাশকদের মতোই আশা করছে গ্রন্থমেলায় আয়োজক, মেলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তারা বলছে-কাল (আজ) মেলা প্রাঙ্গণের পাশাপাশি এর আশেপাশে ব্যাপক ভিড় হবে। এ জন্যে মেলার স্বার্থে এবং মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কাল (আজ) আমাদের সবরকম প্রস্তুতিও আছে। উল্লেখ্য এবারের টানা বেশ কয়েক বছরের মতো মেলার নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে রয়েছে পুলিশ, র?্যাব, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের টিম।

মেলার মঞ্চের গতকালের আয়োজন : গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাষ্ট্র’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রাশেদা কে চৌধুরী, আতিউর রহমান এবং এএম মাসুদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মনজুর আহমেদ।

প্রবন্ধে আবুল মোমেন বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তবতায় নানা নেতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি প্রাণবন্ত সজীব বিকশমান তারুণ্যের ঝিলিক আমরা এ সমাজেও দেখতে পাই। তা যতই ক্ষীণ ও দুর্লভ হোক তবুও বলব সব সম্ভাবনার অবসান হয়নি, কেবল বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও শিক্ষার বন্ধ্যাত্ম প্রকট হয়ে উঠছে। শিক্ষার সঙ্গে মানবিক সংস্কৃতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। স্কুল-কলেজগুলো ডিগ্রি-সনদপত্র বিতরণ-বিপণনের কেন্দ্রে রূপান্তরিত। অভিভাবকরা অর্থোপার্জন, সস্তা বিনোদন, ধর্মসংস্কারের ক্ষুদ্র গ-িতে বাঁধা জীবনের ফাঁদে আটকে গেছেন। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রয়োজন নতুন মানবিক শিক্ষা আন্দোলন।

আলোচকরা বলেন, শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাষ্ট্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সাক্ষরতার সংযোগ না ঘটলে শিক্ষিত মানুষ শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে তাদের বিকাশ ঘটবে না। আর সমাজে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

সভাপতির বক্তব্যে মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তবে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও করণীয় আছে।

আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুছ-এর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন : ‘বহ্নিশিখা’ এবং ড. শায়লা নাসরিনের পরিচালনায় সরকারি বদরুন্নেসা কলেজের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।