• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ২১ জিলকদ ১৪৪১

পুলিশের পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ

চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , রোববার, ০৫ জানুয়ারী ২০২০

পুলিশের পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ ও অস্তিরতা বিরাজ করছে। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি পদায়নের পরিবর্তে বিশেষ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পদোন্নতি ও পদায়ন হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠেছে, গত ১১ বছরে (২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল) প্রথা ভেঙ্গে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে পুলিশ বিভাগে। সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রনে ছিল পুলিশের সব ধরনের কার্যকম। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার পরিবর্তে তেলবাজ মনোভাবের কর্মকর্তারাই বেশি পদায়ন পেয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। পদোন্নতি- পদায়ন নিয়ে শৃঙ্খলা না থাকায় অনেক মেধাবি কর্মকর্তারা অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন। পদোন্নতি বঞ্চিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কয়েকজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একাটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এ সিন্ডিকেটের সদস্যদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরই ওই সিন্ডিকেট পুরোপুরি দলীয় মনোভাবের লোক বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিভিন্ন তৎপড়তা চালায়। সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে তারা পুলিশ বিভাগে নিয়ন্ত্রণ নেয়। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কার কিভাবে পদোন্নতি হবে, কে কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন তা আগ থেকে ঠিকঠাক করে রাখেন। এভাবে তারা গত ১১ বছরের দফায় দফায় পদোন্নতি পদায়ন নিয়েছেন। সূত্র জানায়, ৮২, ৮৪,৮৫,৮৬,৯১,৯৫,৯৭,৯৮,২০০৯, ২০০৪ এবং ২০০৫ সালের বিভিন্ন ব্যাচের মধ্য থেকে সিন্ডিকেট একটি তালিকা তৈরি করে। ১১ বছরে সেই তালিকা থেকে বেছে বেছে পছন্দের লোকদের পদোন্নতি ও পদায়ন দেয়া হয়েছে। অথচ নিয়ম হলে, ব্যাচ ধরে মেধা অনুযায়ী পদোন্নতি পাবে। যেসব পুলিশ দক্ষ এবং পেশাদার তারা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অগ্রধিকার ভিত্তিতে নিয়ম অনুযায়ী পদায়ন হবেন। কিন্তু গত ১১ বছরে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কোন নিয়মই অনুসরণ করা হয়নি। সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের সময়ে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে জুনিয়রকে ডিঙ্গিকে সিনিয়র, মেধার বাইরে পদোন্নতির সূচনা হয়। হাসান মাহুমদ খন্দকার বিদায় নেয়ার পর শহিদুল হক আইজিপির দায়িত্বে আসেন। সাবেক এ আইজিপির আমালে দলীয় নীতিতে জুনিয়ারকে ডিঙ্গিকে সিনিয়রের পদোন্নতি এবং পদায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও ১৫ ব্যাচের অনেকেই এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কিন্তু ইতোমধ্যে ১৭ ব্যাচের অনেকেই ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের একটি শাখায় ১৭ ব্যাচের এক কর্মকর্তা ডিআইজি হিসেবে আছেন। তার আন্ডারে এসপি হিসেবে কাজ করছেন ১৫ ব্যাচের এক কর্মকর্তা। কয়েক দফা পদোন্নতি হলেও ১৫ ব্যাচের ওই কর্মকর্তাকে নানা অজুহাতে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। অনেকে পদোন্নতি না দেয়ার পিছনে রাজনৈতিক কালিমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। কাউকে কাউকে জামায়াত বা বিএনপি ঘরোনার লোক বলে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির সময়ে যারা বিসিএস দিয়ে চাকরি নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে অনেকই এ দলীয় তকমা ব্যবহার করে পদোন্নতি দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুপার নিউমারারিতে ২৫ ব্যাচের সিংহভাগকে এসপি হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অথচ বর্তমান আইজিপির ব্যাচের একজন কর্মকর্তা এডিশানাল এসপি হওয়ার পর আর তার পদোন্নতি হয়নি। কি কারণে তার পদোন্নতি হয়নি সেটি স্পষ্ট নয়। ওই কর্মকর্তা বর্তমানে সিআইডিতে আছেন। লজ্জায় তিনি অফিসেও আসতে পারেন না। কারণ তার কয়েক ব্যাচ জুনিয়ররা সিআইডিতে এসপি, এডিশনাল ডিআইজি ডিআইজি এবং একজন অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে আছেন। স্পেশাল ব্রাঞ্চ, নৌপুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পুলিশ সদর দফতরসহ অনেক ইউনিটে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের সময় মতো পদোন্নতি হয়নি। ১৫ ব্যাচে অধেকের বেশি রয়েছেন যারা এসপি হওয়ার পর আর পদোন্নতি হয়নি। আবার যারা অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছেন তাদের অনেকের আগেই ১৭ ব্যাচ থেকে ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি হয়েছে। ১৭ ব্যাচে অনেকেই আছেন যারা অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি না পেলে ১৮ ব্যাচ থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দফতরে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেদের ক্ষমতার চরম অব্যবহার করেছেন। পদোন্নতি পদায়নের সময় ওইসব কর্মকর্তাদের রুমে তালিকা তৈরি হতো কে বা কার পদোন্নতি হবে কে কোথায় পদায়ন পাবেন। এর ফলে পুরো পুলিশ বিভাগের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছিল। বর্তমান আইজিপি দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি নীয়ম মেনে পদোন্নতি বা পদায়নের চেষ্টা করলেও সিন্ডিকেটের বাধার কারণে তা ঠিকভাবে পারেননি।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে ডিআইজি হিসেবে কয়েকজন কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি। তাদের ডিঙ্গিয়ে জুনিয়র ব্যাচ ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এর ফলে তাদের আর ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি না হওয়ার ঘটনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ার ফরে উচ্চ শিক্ষার অজুহাতে ছুটি নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। সম্প্রতি ডিআইজি মোশারফ হোসেন ভূঞা অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি পদোন্নতি পাওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার পদোন্নতী না হওয়ায় তিনি অনেক হতাশায় থাকতেন। শেষ পর্যন্ত হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তা পঙ্কজ ভট্টচার্য। তার অনেক সহকর্মী অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেলেও তার পদোন্নতি হয়নি। এ নিয়ে তিনি সব সময় হতাশায় থাকতেন।

পদোন্নতি বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সরাসরি কথা না বললেও অনেকের ভাষ্য, পুলিশ বিভাগে পদোন্নতি এবং পদায়ন সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্ত না হলে কেউ কাউকে মানবে না। মেধাবি এবং নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তারা এ বাহিনীর উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা না থাকলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায়ও কোন শৃঙ্খলা থাকবে না।