• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

এক গ্রামেই হাজার প্রবাসী

পাল্টে দিয়েছে অসচ্ছল দামোদরপুরবাসীর জীবন

সংবাদ :
  • সাবজাল হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

একসময় গ্রামটির অধিকাংশ মানুষই ছিল অসচ্ছল। সে সময়ে বেশিরভাগ পরিবারের সদস্যদের দিন কেটেছে অনাহারে অর্ধাহারে। অল্প সংখ্যক ছাড়া বেশিরভাগ পরিবার বসবাস করতেন মাটি কিংবা বেড়ার তৈরি ঝুঁপড়িঘরে। এখন আর সেই অবস্থা নেই। একসময়ের জ্বরাজীর্ণ গ্রামটির সবকিছুতেই আজ শহুরে ছাপ। এমন আলোচিত গ্রামটির নাম দামোদরপুর। এটি ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের একটি গ্রাম। এখন গ্রামটিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে সাড়ি সাড়ি পাকা ইমারত। আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে গ্রামের সবপরিবারে। এ সবকিছুই পাল্টে দিয়েছে গ্রামটির চিত্র। আর এটা সম্ভব বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয়ে। কারণ গ্রামটির প্রায় ১ হাজার মানুষ প্রবাসে থাকেন। একটি গ্রাম থেকে এত সংখ্যক প্রবাসী থাকা একটি বিরল ঘটনা। তারা বিশ্ব শ্রমবাজারে শ্রম বিক্রি করে একদিকে নিজেদের ভাগ্যের উন্নতি ঘটিয়েছেন অন্যদিকে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।

সরেজমিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সর্বশেষ প্রান্তের দামোদরপুর গ্রামটিতে গেলে দেখা যায়, রঙ-বেরঙের বসতবাড়ি। বাড়িগুলো রঙ ও নকশায় শহরের বাড়িগুলোকে হার মানিয়েছে। গ্রামের সব দিকেই উন্নত গ্রামীণ যাত্রার যেন একেবারে শিখরে অবস্থান।

গ্রামবাসীরা জানান, আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক দিয়ে তাদের গ্রামটির অবস্থান এ উপজেলার মধ্যে বড়। প্রবাসীদের সংখ্যার দিক দিয়েও গ্রামটির অবস্থান এ উপজেলার মধ্যে শীর্ষে এবং সারাদেশের মধ্যে অন্যতম। গ্রামের লোকসংখ্যা অনেক বেশি হলেও অনেক মানুষ বিদেশে থাকার কারণে তারা ভোটারও হতে পারেননি। আবার বিদেশ থেকে ফিরে অনেকে আশপাশের গ্রাম ও শহরে গিয়ে সব আলিশান বাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে বসবাস করছেন। গ্রামবাসীদের দাবি গ্রামের সব মানুষ গ্রামটিতে ফিরলে মোট লোকসংখ্যা হবে প্রায় ছয় হাজারের বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলা পরিসংখ্যান ও নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী দামোদরপুর গ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল তিন হাজার নয়শ’ ছিয়ানব্বই জন। এরমধ্যে পুরুষ এক হাজার নয়শ’ আটত্রিশ জন আর মহিলা দুই হাজার আটান্ন জন। একই বছরের ভোটার তালিকা অনুযায়ী এ গ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৯৪৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক হাজার চারশ’ একাশি জন। আর মহিলা ভোটার সংখ্যা এক হাজার ৪৬২ জন।

দামোদরপুরের প্রবীণ ব্যক্তি আক্কাচ আলীর দাবি, তিনিই এ উপজেলা থেকে প্রথম ১৯৮০ সালে শ্রম বিক্রি করতে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে ২ বছর থাকার পর বেতন কম হওয়ায় ফিরে এসে ৬ মাস পরে ১৯৮২ সালের মাঝামাঝিতে সৌদি আরব যান। সেই থেকেই শুরু। পরে গ্রামের মসলেম উদ্দীন, ইসমাইল হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজনকে তিনি নিয়ে যান। তারা এসে আবার স্বজনসহ গ্রামবাসীদের বিদেশে কাজের জন্য নেয়া শুরু করেন। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে প্রবাসীদের সংখ্যা। গ্রামের অনেকেই কর্মক্ষম যুবকদের প্রবাসে পাঠাতে কাজ করেছেন। তবে এ কাজে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন দামোদরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম।

ওই গ্রাম থেকে সবচেয়ে বেশি দিন প্রবাসে জীবন কাটানো সুলতান আহম্মেদ জানান, তিনি ১৯৮৬ সালে মালেয়েশিয়ায় যান। মাঝে মাঝে দেশে আসলেও তার ৩৪ বছরের প্রবাস জীবনের ইতি টেনেছেন মাস তিনেক আগে। তিনি বলেন, প্রবাসে থেকে অর্থ পাঠিয়ে নিজের ভাই ভাতিজাসহ গ্রামের অনেককে নিয়ে গেছেন। সুলতান আহম্মেদের ভাষ্য, তাদের যৌথ পরিবারে মোট কর্মক্ষম পুরুষের সংখ্যা ছিল মোট ১১ জন। তাদের মধ্যে এক সময়ে মোট ১০ জন ছিল প্রবাসে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথম দিকে আপনজনদের ছেড়ে থাকতে খুব খারাপ লাগত। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে বাড়ির সবার কথা খুব মনে পড়ত। এখনকার দিনের মতো যোগাযোগের মাধ্যম তেমন একটা ছিল না। ফলে সে সময়ে প্রবাস জীবন ছিল বেশ কঠিন। কিন্তু গ্রামের মানুষ বিদেশমুখী হওয়ায় প্রবাসে থেকেই ধীরে ধীরে আপনজন ও গ্রামবাসীদের অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অবস্থাটা এমন, যতদিন গড়িয়েছে তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশে থেকে গ্রামবাসীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে অহরহ। তখন আর মনেই হয়নি প্রবাস জীবনের কষ্ট। এছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে যে কোন সময়ে পরিবারের সদস্যসহ দেশের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাস জীবনের আগের দিনের মতো কষ্ট এখন আর অনুভূত হয় না।

ওই গ্রামের বাসিন্দা কোলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. নুরুল ইসলাম জানান, তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন দেখেছেন কৃষিনির্ভর এ গ্রামটির অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অনেক দুর্বল। সে সময়ে গ্রামে অভাব লেগে থাকত। কিন্তু এখন তাদের গ্রামের প্রায় ১ হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। এখন গ্রামের সব মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। গ্রামের মোট ভূখণ্ডের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক বেশি। তবে দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকে অর্থ রোজগার করে ফিরে এসে অনেক মানুষ পার্শ্ববর্তী শহর ও গ্রামে জমি কিনে আলিশান বাড়ি করেছেন। তিনি বলেন, যারা ২০ বছর আগে গ্রামটি দেখেছেন তারা এখন গ্রামের মধ্যে ঢুকে বড় বড় বাড়ি দেখে অবাক হন।

ওই গ্রামের আরেক সমাজসেবক হারুন অর রশিদ মোল্লার মতে, তাদের গ্রামের প্রবাসীরা শুধু নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন শুধু তাই নয়। বৈদেশিক রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন তাদের গ্রামের প্রবাসীরা। তার ভাষ্য, এক গ্রাম থেকে এতো সংখ্যক মানুষ প্রবাসে থাকার বিষয়টি সারাদেশের মধ্যে আরও গ্রাম থাকতে পারে তবে একেবারে দৈন্যতা থেকে সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।

ওই গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য জাফর ইকবাল জানান, গ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার দুইশ’ ত্রিশ। তাদের মধ্যে প্রায় বারোশ’ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে প্রবাসে। জরিপ করে দেখা গেছে, গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকেই দুই একজন করে মানুষ প্রবাসে আছেন। কোন কোন বাড়িতে প্রবাসীদের সংখ্যা আরও বেশি। তিনি আরও বলেন, লেখাপড়া বাদে যেসব কর্মক্ষম যুবক আছেন তারাও চেষ্টায় আছেন প্রবাসে যাওয়ার জন্য।

কোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন মোল্ল্যা জানান, তার ইউনিয়নের মধ্যে দামোদরপুর সবচেয়ে বড় গ্রাম। এক গ্রাম নিয়েই একটি ওয়ার্ড।

ঝিনাইদহ জেলা কর্মসংস্থান ও শ্রম অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সৌমিতা রানী মজুমদার জানান, জেলার মধ্যে কোন গ্রামের মানুষ শ্রমশক্তি রপ্তানিতে এগিয়ে এমন হিসাব তার কাছে নেই। তবে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামের বাড়ি বাড়ি থেকে অনেক কর্মক্ষম মানুষ প্রবাসে আছেন। তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় একদিকে তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন। তিনি আরও বলেন, প্রবাসে শ্রম বিক্রির মাধ্যমে একদিনের অভাবী গ্রামটি আজ উন্নত গ্রামে পরিণত হয়েছে। ফলে গ্রামটি নিসন্দেহে সারাদেশের মধ্যে ব্যতিক্রমী।