• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেটে গেল ৫৬ বছর

পানির হাহাকার : চাহিদা পূরণে ব্যর্থ চট্টগ্রাম ওয়াসা

সংবাদ :
  • নিরুপম দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম ব্যুরো

| ঢাকা , বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯

প্রতিষ্ঠার ৫৬ বছরেও নগরবাসীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। দীর্ঘ বছর ধরে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় পানির প্রাপ্যতা ও গুণগতমান নিয়ে নগরবাসী শঙ্কায় দিন পার করে আসছে। গত বছর হালিশহরে পানির লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজের লাইন যুক্ত হয়ে পানিদূষণের কারণে ওই এলাকায় ডায়রিয়া ও জন্ডিস মহামারী আকারে রূপ নিলেও ওয়াসার খামখেয়ালিপনায় কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় এখনও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। ফলে এ বছরও পানিবাহিত রোগে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানির জন্য হাহাকার নগরজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। অন্যদিকে অদক্ষ প্রশাসন, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মীয়করণ ও গ্রাহক স্বার্থকে উপেক্ষা করার কারণে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও নগরবাসীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর বর্তমান সরকারের আমলেই ১৩ হাজার কোটি টাকার সর্বোচ্চ উন্নয়ন বরাদ্দ পায় এ প্রতিষ্ঠানটি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ব্যবস্থাপনা পরিচালক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ১০ বছরেও প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে পারেননি। শুধু বছরের পর বছর চট্টগ্রামবাসীকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নগরবাসী এভাবে পানির জন্য স্বপ্ন দেখতে দেখতে ৫৬টি বছর কাটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই নগরবাসীর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত, ওয়াসাকে গ্রাহকবান্ধব, সত্যিকারের সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো চট্টগ্রাম ওয়াসায় সামগ্রিক পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছেন দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা। একই সঙ্গে গ্রীষ্ম ও সমাগত পবিত্র রমজানে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় পানির প্রাপ্যতা ও গুণগতমান নিয়ে নগরজীবন শঙ্কায় রয়েছেন বলে জানান তারা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন বিষয়ে এক বিবৃতিতে ক্যাব নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যখনই পানির সংকট দেখা দেয়, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বার বার বিভিন্ন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে থাকে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর তাদের ওই প্রতিশ্রুতির ফল নগরবাসী পায় না। পানির অপচয় রোধ, সরবরাহ লাইনে ত্রুটি, লিকেজ, পানি চুরি বন্ধ, বিলিং ব্যবস্থার ত্রুটি দূর না করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বার বার নতুন নতুন প্রকল্পের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ফলে ওয়াসা তলাবিহীন জুড়ির মতো যা-ই ঢালা হচ্ছে, সবই খালে গিয়ে পড়ছে। অধিকন্তু প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পানি ও পয়ঃপ্রণালি উন্নয়নে বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দিলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার অদক্ষ, অদূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বেচ্ছাচারী ও আত্মীয়করণের কারণে নগরবাসী সুফল পায়নি। পুরো নগরে পানির জন্য হাহাকার, নগরজুড়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, পানির লিকেজ ও বিপুল পানি প্রতিদিন নালা- নর্দমায় পড়ে গিয়ে অপচয় হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন জায়গায় পানির জন্য হাহাকার, ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি, হালিশহর এলাকায় পানির লাইনে সুয়্যারেজের লাইন যুক্ত হয়ে পানিদূষণে গত বছর জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে রূপ নিলেও ওয়াসা কার্যত ব্যবস্থা নেয়নি।

চট্টগ্রাম ওয়াসা দাবি করছে, পানির উৎপাদন দৈনিক ৩৫-৪০ কোটি লিটার। এর কোন বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। কারণ রাঙ্গুনিয়ায় শেখ হাসিনা পানি শোধানাগার, মদুনাঘাট পানি শোধনাগার ও পাম্প হাউসে ডিজিটাল মিটার নেই। ফলে কত লিটার পানি উৎপাদন হচ্ছে, এর প্রকৃত সত্যতা যাচাই করার জন্য ওয়াসার ডেটাবেস নেই। আর নগরীর পানির চাহিদা ২০ কোটি লিটার হলে আরও ১৫-২০ কোটি লিটার হয় অপচয় হচ্ছে, না হলে চুরি হচ্ছে। তাই পানি উৎপাদন ও বিতরণে ডিজিটাল মিটার না থাকায় পানির প্রকৃত উৎপাদন খরচ নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে।

বিবৃতিতে নেতারা বলেন, গ্রীষ্মকাল শুরুর প্রাক্কালে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে পানির জন্য হাহাকার হলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যস্ত ওয়াসার ঠিকাদারদের অর্থায়নে আয়োজিত কোটি টাকার ওয়াসা নাইট আয়োজনে। নগরবাসীর অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এ ধরনের আচরণ চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় বলে মত প্রকাশ করা হয়। এটি গ্রাহক স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড। ওয়াসা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ঠিকাদারদের অর্থায়নে এ ধরনের আয়োজন শুধু অনৈতিক নয়, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা বোর্ডের ক্ষমতাও বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। কারণ যাবতীয় নীতি ও পরিকল্পনা ওয়াসার বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার কথা। যদি অনুমোদনের প্রয়োজন না পড়ে, তাহলে বর্তমান বোর্ড অকার্যকর এবং তারা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম নন। আর ওয়াসার তহবিলের কাছ থেকে যদি অর্থ ব্যয় না হয়ে থাকে তাহলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়াসা, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি, হাসপাতালসহ সর্বত্রই ঠিকাদাররাই অঘোষিতভাবে প্রশাসন পরিচালনা করে থাকেন। ঠিকাদারদের অর্থায়নে যে রকম কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে থাকে, ঠিক একইভাবে যাবতীয় নীতি ও পরিকল্পনা তাদের ইচ্ছা অনুসারে হয়ে আসছে। এ কারণে জনস্বার্থ বার বার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এসব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের কর্মকান্ডের কারণে দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুদূর পরাহত।

নেতারা বলেন, ক্যাব পানির অপচয় রোধ, সেবা সার্ভিসের অব্যবস্থাপনা রোধে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, গ্রাহকসেবার মান ও অনিয়ম রোধে ত্রিপক্ষীয় গণশুসানির আয়োজন করা, গ্রাহক হয়রানি রোধে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য ডিজিটাল হেল্পলাইন চালু ও হেল্প ডেস্ক আধুনিকায়ন, দাম বাড়ানোসহ সেবার মান উন্নয়নে নীতিমালা প্রণয়নে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানালেও মন্ত্রণালয় ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে গ্রাহকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা বলে নগরীর বিলাসবহুল পাঁচতারাকা হোটেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আত্মীয়স্বজন ও দু’একজন অনুগত গ্রাহকদের নিয়ে গ্রাহক সভার আয়োজন করে প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তা গ্রাহক সভার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে তামাশার শামিল। দুদকের নির্দেশে সপ্তাহে একদিন গণশুনানির আয়োজনের কথা বলা হলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তারা বলেন, বর্তমান সরকারের সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক একাধারে ১০ বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে বয়স, কর্মক্ষমতার কারণে ওয়াসাকে কিছুই দিতে পারেননি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৯৬৮ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে পূর্ণ মেয়দ শেষ করে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসরে যান। সত্তর-ঊর্ধ্ব বয়সে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে তার পক্ষে কতটুকু কর্মশক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব? ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে তিনটি দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। তা এখনো চলমান এবং তাকে দুর্নীতির কারণে কারাবাস করতে হয়েছিল। ফলে কয়েক আত্মীয়স্বজনকে সুযোগ-সুবিধা প্রদান, আত্মীয়করণ ও বোর্ডকে উপেক্ষা করে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব হয়নি। তার একগুঁয়েমির কারণে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (প্রকৌশল) এখনো নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, চট্টগ্রাম নগরজুড়ে পানির জন্য হাহাকার। কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করছে না। পানি সংকটের কারণে সর্বত্রই টিউবওয়েল স্থাপন যে রকম প্রকট আকারে বেড়েছে, তেমনি ড্রিংকিং ওয়াটার ফ্যাক্টরির সংখ্যাও বেড়েছে ব্যাপক হারে। তারপরও নগরবাসীর জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়নি। সিটি করপোরেশন এলাকার একটি বড় অংশে এখনো পানির জন্য হাহাকার চলছে। অন্যদিকে ওয়াসা দাবি করছে, তাদের উৎপাদন ৩৫-৪০ কোটি লিটার। নগরীতে পানির চাহিদা ২০ কোটি লিটার। পানির লিকেজের কারণে প্রচুর পানি রাস্তা ও নালায় অপচয় হলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানির লিকেজ নেই বলে দাবি করছে। নতুনভাবে সংযুক্ত পাইপগুলো বুয়েট কর্তৃক মান পরীক্ষা ছাড়াই যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে পানির প্রেসার ঠিকমতো নিতে না পারায় প্রতিনিয়তই লাইনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে এবং গ্রাহকরা পানি পাচ্ছেন না।

বিবৃতিদাতারা হলেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগর সভাপতি জেসসিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম ও ক্যাব চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি আলহাজ আবদুল মান্নান।