• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

শরীয়তপুর জেলা আঞ্চলিক অফিস

ঘুষ ও দালাল ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া যায় না

ছদ্মবেশে দুদকের অনুসন্ধান

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

ঘুষ এবং দালালের সহযোগিতা ছাড়া পাসপোর্ট অধিদফতরের শরিয়তপুর জেলা আঞ্চলিক অফিসে সময়মতো পাসপোর্ট পাওয়া যায় না এমন অভিযোগ পেয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। ছদ্মবেশে পাসপোর্ট প্রত্যাশী হিসেবে দুদক টিমের সদস্যরা পাসপোট করতে গেলে সেখানে শরিয়তপুর আঞ্চলিক অফিসের দুই কর্মচারী তাদের কাছে ঘুষ দাবি করে। ছদ্মবেশে এভাবে অভিযান চালিয়ে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বের করে দুদক। ফরিদপুর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৌরভ দাসের নেতৃত্বে এনফোর্সমেন্ট টিম এ অভিযান চালান।

দুদক সূত্র জানায়, গতকাল ছদ্মবেশে পাসপোর্টের শরিয়তপুর জেলা আঞ্চলিক অফিসে দুদকের একটি টিম অভিযান চালায়। পাসপোর্ট করতে যথারীতি দালালের মুৃখোমুখি হয় তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে হলে কী করতে হবে এমন প্রস্তাব দিলে দালাল চক্র এবং অফিসের কর্মচারীরা দুদক টিমের সদস্যদের পাসপোর্ট প্রত্যাশী ভেবে প্যাকেজের বিভিন্ন মূল্য হাকান দালালরা। দালালরা সরাসরি প্যাকেজ মূল্য ১১ থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা দিতে হবে জানিয়ে বলেন কম হলে অত্র অফিসে পাসপোর্ট করা যাবে না। ফরিদপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসের রেকর্ড কিপার সুমন রায় এবং ডেলিভারি শেকসনের কর্মচারী প্রণব কুমার দাস সরাসরি ওই টাকা দাবি করেন।

দুদক সূত্র জানায়, পাসপোর্ট প্রাপ্তির আবেদনপত্র গ্রহণে ঘুষ দাবির অভিযোগে অভিযানকালে দুদক টিম ছদ্মবেশে সেবা গ্রহীতা সেজে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয় এবং দেখতে পায় অফিসে দালালদের উপস্থিতি রয়েছে। দুদক টিম বিভিন্ন সেবা প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে দালালদের সঙ্গে অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি যোগসাজশ রয়েছে এবং ঘুষ প্রদান না করলে ইচ্ছাকৃতভাবে পাসপোর্ট প্রদানে দেরি করা হচ্ছে। এ সময় কয়েকজন দালাল ছদ্মবেশে থাকা দুদক টিমকে জানায় দ্রুত পাসপোর্ট প্রদানের প্যাকেজ মূল্য হচ্ছে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দুদক টিম আরও জানতে পারে, এই ঘুষ চক্রে পাসপোর্ট অফিসের রেকর্ড কিপার সুমন রায় এবং ডেলিভারি সেকশনে কর্মরত প্রণব কুমার দাস জড়িত আছে। পরে সেবা গ্রহীতা সেজে তাদের কাছে উপস্থিত হলে ওই দুই কর্মচারী দুদক টিমের কাছে ঘুষ দাবি করে। পরবর্তীতে দফতর প্রধান উপসহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে এ ব্যাপারে টিম কথা বললে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত বদলি এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করার বিষয়টি দুদক টিমকে অবহিত করেন। এছাড়া এনফোর্সমেন্ট টিম ইব্রাহিম, আশরাফ এবং সবুজ নামে তিনজন দালালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।

এদিকে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের মাদারের চর গ্রামে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের টাঙ্গাইলের সহকারী পরিচালক আতিকুল আলমের নেতৃত্বে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সরেজমিনে দুদক টিম দেখতে পায় যে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র জনগণকে বরাদ্দের নিমিত্ত ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯০টি ঘর নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। নির্মিত ৯০টি ঘরের মধ্যে ৬০টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যার মাঝে মাত্র ১৩টি ঘরে দরিদ্র লোকজন বসবাস করছে। অন্য ঘরে ধান-গমসহ অন্য মালামাল রাখা হয়েছে। ঘর নির্মাণে অত্যন্ত নিম্নমাণের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের এছাড়া প্রতিটি ঘরের সঙ্গে এটাচ বাথরুম এবং রান্নাঘর থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি নির্মাণ করা হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়। এই অনিয়ম এবং দুর্নীতি উল্লেখপূর্বক টিম কমিশনের কাছে অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে প্রতিবেদন পেশ করবে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস প্রদানে ঘুষ দাবি এবং দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগে সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ এবং উপ-সহকারী পরিচালক মোছা. ফাহমিদা আকতার এর সমন্বয়ে গঠিত গতকাল বিআরটিএ ইকুরিয়াতে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে দুদক টিম দেখতে পায়, লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের সময় যতক্ষণ সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকেন সুশৃংখলভাবে পরীক্ষা হয় কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেখান থেকে সরে গেলেই পরীক্ষায় অত্যন্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি শুরু হয়। এছাড়া ফিল্ড টেস্টের ক্ষেত্রে জিগজাগ মডেলের টেস্ট নেয়ার কথা থাকলেও অত্যন্ত সহজভাবে সেই টেস্ট নেয়ার চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এ সময় দুদক টিম কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটকে নিজে উপস্থিত থেকে সুচারুরূপে লিখিত এবং ফিল্ড টেস্ট গ্রহণের অনুরোধ করে। এছাড়া একজন সহকারী পরিচালক ছুটিতে থাকায় ও তার প্রতিকল্প কর্মকর্তা না থাকায় দাফতরিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে মর্মে দেখা যায়। বিষয়টি কার্যালয়ের উপ-পরিচালককে অবহিত করলে তিনি অবিলম্বে সব কর্মকর্তার প্রতিকল্প কর্মকর্তা মনোনয়ন করবেন বলে দুদক টিমকে আশ্বস্ত করেন। দুদক টিম কার্যালয়ের সিটিজেন চার্টারটি দৃশ্যমান স্থানে স্থাপন করার জন্যও কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করে।

সিলেটের তেমুখী এলাকায় শাহজালাল তৃতীয় সেতুর স্প্যানের এক্সপানশন জয়েন্ট মেরামতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিলেট কর্তৃক লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার অভিযোগে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং দেখা যায় যে সেতুতে ভারী যানবাহন চলাচল করার কারণে এক্সপানশন জয়েন্ট এর আশেপাশের অংশ ভেঙে যাওয়ায় যান চলাচল বিঘি্নত হচ্ছে বিধায় তা মেরামত করার জন্য স্টিলের পাত ব্যবহার না করে বাঁশের সঙ্গে বিটুমিনের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, উল্লিখিত কাজে কোন টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি এবং কোন বিল উত্তোলন করা হয়নি। দুদক টিম সেতু মেরামত সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনাপূর্বক কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় চলমান হতদরিদ্রদের ৪০ দিন প্রকল্পের রাস্তায় বালু ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের কাজ না করেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক জেলা কার্যালয় রাজশাহী হতে একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানকালে দুদক টিম দেখতে পায়, ওই প্রকল্পে মোট ৭০ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও মাত্র ১০-১৫ জন শ্রমিকের মাধ্যমে দায়সারাভাবে বালু এদিক- সেদিক ছিটিয়ে রেখে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। দুদক টিম অবিলম্বে প্রকল্পের স্পেসিফিকেশন মোতাবেক কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট হাজিরাখাতা এবং অন্য নথিপত্র সংগ্রহ করে। নথিপত্র পর্যালোচনা পূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করবে টিম। দুদক এনর্ফোসমেন্ট ইউনিটে আগত বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণর্পূবক প্রতিবেদনের মাধ্যমে কমিশনকে অবহিত করার নিমিত্ত চেয়ারম্যান-রাজউক, মহাপরিচালক-বিটিভি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার-বেলাবো-নরসিংদী, সাপাহার-নওগাঁ, পীরগঞ্জ-রংপুর, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ, কালীগঞ্জ-সাতক্ষীরা, কামারখন্দ-সিরাজগঞ্জ এবং রুপসা-খুলনা বরাবর পত্র প্রেরণ করেছে দুদক এনর্ফোসমেন্ট ইউনিট।