• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মানুষ জীববৈচিত্র্য সামুদ্রিক অভয়ারণ্যের জন্য হুমকি

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশের এক যৌথ প্রতিবেদন বলছে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ২৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৭ হাজার ৯৪৪ মেগাওয়াট (মে.ও.) বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম ১৭টি প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মানুষ, জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক অভয়ারণ্য, পাহাড়ি বনাঞ্চল, ভূ-প্রকৃতি, সমুদ্রসৈকত এবং বিস্তৃত কৃষিজমির জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যটন নগরী কক্সাজারের মূল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে উৎপাদনের ক্ষমতা সম্পন্ন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১০ বছরে যদি সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় তবে ৪০ বছরের স্থায়ীত্বকালে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র যে দূষণ তৈরি করবে তাতে এই অঞ্চলের বাসিন্দা ও প্রাণীকূল চরম বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে এবং বন ও সমুদ্রের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য অপূরণীয় স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পগুচ্ছ স্থাপনের পরিকল্পনাঃ ঝুঁকিতে বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তথ্যানুসন্ধানী একটি দল পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল, ২০১৮ সালের ১৪ অগাস্ট এবং ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজার, সোনাদিয়া, মহেশখালী, মাতারবাড়ি, পেকুয়া এবং বাঁশখালী অঞ্চল পরিদর্শন করে। তথ্যানুসন্ধানের অংশ হিসেবে দলের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের নেতা;দের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। তারা বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রস্থল, বৃহৎ আকারের শিল্প ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। অনুসন্ধানী দল প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্র, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্য, সরকারি প্রতিবেদন যার মধ্যে রয়েছে অতিসম্প্রতি সংশোধিত পিএসএমপি ২০১৬, একটি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি বিশ্লেষণ করেছে।

বাপার সভাপতি বিশিষ্ট মানবাধীকার কর্মী সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে এবং নির্বাহী সহ-সভাপতি ডা. মো. আবদুল মতিনের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ব্রতীর প্রধান নির্বাহী ও বাপার যুগ্ম সম্পাদক শারমীন মুরশিদ, বাপার যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ন কবির সমুন, অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার, বাপার কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য যথাক্রমে ড. মাহবুব হোসেন, এমএস সিদ্দিকী, ইবনুল সাঈদ রানা, বাপা কক্সাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী, মহেশখালী শাখার সদস্য সচিব আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল বলেন, বন, পাহাড় সমুদ্র সর্বোপরি পরিবেশের মতো স্পর্শকাতর জায়গাগুলোকে বিনষ্টের দিকেই সরকার এগুতে চাচ্ছে। উন্নয়নের নামে এ স্পর্শকাতর যায়গাগুলোকেই কেন বার বার বেছে নেয়া হচ্ছে? আমরা কখনও উন্নয়নের বিমুখ নই, কিন্তু সে উন্নয়ন হতে হবে সুপরিকল্পিত এবং পরিবেশ প্রকৃতির ক্ষতি না করে বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে। আমরা এ দেশটাকে বিশে^র সবচেয়ে বেশি দূষণের দেশ হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা কক্সবাজার এবং মহেশখালীকে বাঁচাতে চাই।

ডা. আবদুল মতিন বলেন, আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্য নির্ভর বক্তব্য প্রদান করি। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বিশ্বের এমন সব দেশের অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে কয়লা ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি বাপা এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে উপস্থাপন করেছে। তা সত্ত্বেও দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে দেশের পরিবেশকে ধ্বংস করছে যা বর্তমান সভ্যতায় মেনে নেয়া যায় না। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে কথাগুলো বলছি দেয়ালের সঙ্গে, আর সেই দেয়ালটি হচ্ছে সরকার। সরকার তার অবস্থানে অনড় আর দেশবাসী তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে। চীন, জাপান এবং ভারত তাদের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকারকে পরিবেশ বিধ্বংসী এ প্রকল্পগুলো এদেশে করতে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। সরকার এবং ইনভেস্টরদের মধ্যে একটা বিরাট সিন্ডিকেট চক্র তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থে এ প্রকল্পগুলো করছে। আমরা এ ধরনের উন্নয়ন চাই না যেটা একটা দোজখে পরিণত হবে।

শারমীন মুরশিদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিভিন্ন চুক্তির সঙ্গে জড়িত, প্যারিস চুক্তি, এসডিজিসহ অনেক চুক্তিতে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যদি এভাবে চলতে থাকে তা হলে এসব চুক্তি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে? সরকার এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশবাদীদের এর ফলাফল কি হবে তা নিয়ে সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত ছিল। বাপা কক্সাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারের স্থানীয় লোকেদের রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার জমি অধিগ্রহণের ফলে যাদের জমি পড়েছে সে প্রকল্পে তাদের অধিগ্রহণের টাকা নিতে দিনের পর দিন ধর্না দিতে হচ্ছে, তাও আবার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পার্সেন্টেজ ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। দিনমজুর কৃষক ও মৎস্যজীবীদের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ।

বাপা মহেশখালী শাখার সদস্য সচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেন, যে উন্নয়নে সুফলের চেয়ে কুফল বেশি সে উন্নয়ন আমরা চাই না। আমরা স্থানীয় জনগণ বুঝতেছি সেখানে কি উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে যারা শিল্পপতি তাদের, কিন্তু সেখানকার দিনমজুরদের কোন উন্নতি নাই। তারা আজ সেখানে বাস্তুহারা, কর্মহারা হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। সেখানে যে প্রকল্পের কাজ হচ্ছে সেখানে তারা আমাদের স্থানীয় শ্রমিকদের কাজপর্যন্ত দেয়নি। ফলে সেখানকার শ্রমজীবীরা অনাহারে ও অর্ধাহারে কালাতিপাত করছে। তিনি আরও বলেন, যাদের জমি সেই প্রকল্পের আন্ডারে পড়েছে তাদেরকে অধিগ্রহণের টাকা নিতে গেলে কাগজপত্রের আকার-একারের ভুল ধরে টাকা দিতে চায় না অথচ পরে তারা ৩০-৪০% পর্যন্ত টাকা দাবি করে সেই পরিমাণ টাকা দিলে পরেই আগের কাগজেই টাকা দিয়ে দেয়।

গভেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কক্সাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সিংহভাগ বিদেশি অর্থায়নে বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সাজারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনায় ইতোপূর্বে প্রকাশ করা হয়নি এমন তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়।